শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৫

এআইয়ের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে ১০ লাখ নতুন চাকরি

এআইয়ের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে ১০ লাখ নতুন চাকরি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে—এমন আশঙ্কা বহুদিনের। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত এআই চাকরি কেড়ে নেওয়ার চেয়ে নতুন চাকরি তৈরিতেই বেশি ভূমিকা রাখছে।

দ্য ইকোনমিস্টের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে এআই এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ নতুন চাকরি তৈরি করেছে। বিপরীতে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে এআইয়ের কারণে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় দুই লাখ মানুষ। অর্থাৎ, এআইয়ের কারণে হারানো চাকরির তুলনায় নতুন চাকরির সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি।

গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের (বিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশটিতে ১ লাখ ৬২ হাজার নতুন চাকরি যোগ হয়েছে। বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ।

তরুণদের শ্রমবাজারেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ধাক্কার প্রমাণ নেই। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার এবং সামগ্রিক বেকারত্বের হারের ব্যবধান কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম কম পর্যায়ে রয়েছে।

এআইয়ের বিস্তারের সবচেয়ে বড় সুফল দেখা যাচ্ছে অবকাঠামো খাতে।

এআই চালাতে বিপুলসংখ্যক চিপ, সার্ভার, ডেটা সেন্টার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রয়োজন হচ্ছে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, ২০২২ সালের তুলনায় এআই পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোতে বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় হচ্ছে।

শুধু ডেটা সেন্টার নির্মাণেই বছরে ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে। এক বছর আগের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

ফলে প্রয়োজন হচ্ছে বিপুলসংখ্যক কর্মীর। ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে ইলেকট্রিশিয়ান লাগছে। সার্ভার অতিরিক্ত গরম হওয়া ঠেকাতে প্রয়োজন হচ্ছে এইচভিএসি বিশেষজ্ঞের। বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে প্রকৌশলী।

এ ছাড়া সার্ভার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান।

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেটা সেন্টার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত পাঁচটি প্রধান শিল্পে ২০২৩ সালের পর প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার অতিরিক্ত কর্মসংস্থান হয়েছে। অন্যান্য নির্মাণ ও উৎপাদন খাতের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি হিসাব করেও এই অতিরিক্ত কর্মসংস্থানকে ব্যাখ্যা করা যায় না।

চাকরির ওয়েবসাইট ইনডিডের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে ডেটা সেন্টার–সংক্রান্ত চাকরির বিজ্ঞপ্তি দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

লিংকডইনের হিসাবে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পাঁচ লাখ ডেটা সেন্টার–সংক্রান্ত চাকরি তৈরি হয়েছে।

ডেটা সেন্টার ঘিরে কর্মীর চাহিদা বাড়ায় এসব চাকরির বেতনও বাড়ছে।

ইনডিডের হিসাবে, ডেটা সেন্টারে স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজের বিজ্ঞাপনে দেওয়া বেতন একই ধরনের অন্য কাজের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্যেও বেতন বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। জুন পর্যন্ত এক বছরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উৎপাদন খাতে ঘণ্টাপ্রতি গড় আয় বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। বৈদ্যুতিক ঠিকাদারি খাতে বেড়েছে প্রায় আট শতাংশ।

অর্থাৎ, এআই অবকাঠামোর বিস্তার শুধু নতুন চাকরিই তৈরি করছে না, কিছু পেশায় কর্মীদের দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।

এআইয়ের কারণে শুধু নির্মাণ, বিদ্যুৎ বা যন্ত্রপাতি খাতেই চাকরি বাড়ছে না। তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের পেশাজীবী চাকরিও (হোয়াইট কলার জব)।

এআই মডেল তৈরির জন্য প্রয়োজন হচ্ছে প্রকৌশলী। ডেটা লেবেল করার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে ডেটা অ্যানোটেটর। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী এআই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে তৈরি হচ্ছে ‘ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়ড’ ইঞ্জিনিয়ারের মতো পদ।

অনেক প্রতিষ্ঠানে তৈরি হচ্ছে ‘হেড অব এআই’ পদও।

লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সময়ের তুলনায় হেড অব এআই, এআই ইঞ্জিনিয়ার এবং ডিরেক্টর অব এআই পদে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বার্নিং গ্লাস ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্যাড লেভাননের গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পেশাজীবী চাকরির প্রায় এক শতাংশ এখন ‘এআই চাকরি’। সংখ্যার হিসাবে এটি প্রায় ১০ লাখ পদ।

কম্পিউটার ও জীবনবিজ্ঞান–সম্পর্কিত পেশায় এআই–নির্ভর চাকরির অংশ চার থেকে পাঁচ শতাংশ।

লিংকডইনের আলাদা বিশ্লেষণেও ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার নতুন এআই–নির্দিষ্ট চাকরি তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে।

এআইয়ের আরেকটি প্রভাব হচ্ছে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।

একজন আইনজীবী এআই ব্যবহার করে দ্রুত চুক্তির খসড়া তৈরি করতে পারেন। একজন আর্থিক বিশ্লেষক কয়েক মিনিটে বিপুলসংখ্যক নথি বিশ্লেষণ করতে পারেন।

এর ফলে একটি কাজ করতে কম সময় লাগলেও সেবার খরচ কমতে পারে। আর খরচ কমলে সেই সেবার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তখন প্রতিষ্ঠানে সামগ্রিক কাজের পরিমাণও বাড়তে পারে।

এ কারণে এআইয়ের ঝুঁকিতে থাকা বলে বিবেচিত কিছু পেশাতেও কর্মসংস্থান বেড়েছে।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্যারালিগ্যালদের কর্মসংস্থান বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। একই সময়ে বাজার গবেষণা বিশ্লেষকদের চাকরি বেড়েছে প্রায় ছয় শতাংশ।

জাতীয়ভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

এআইয়ের প্রভাব পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। কিছু রুটিন কাজের পেশায় এরই মধ্যে কর্মসংস্থান কমছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কাস্টমার সার্ভিস কর্মীদের চাকরি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। সচিব ও প্রশাসনিক সহকারীদের চাকরি কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।

এই কাজগুলোর বড় অংশই নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক। ফলে এআই এজেন্টের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে এসব পেশা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বিএলএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অফিস ও প্রশাসনিক সহায়তা–সংক্রান্ত পেশায় প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার চাকরি কমতে পারে।

এআই মানুষের চাকরি শেষ করে দেবে কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের তথ্য বলছে, এআই চাকরি ধ্বংসের পাশাপাশি বড় পরিসরে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করছে।

কম্পিউটার যুগের আগে অস্তিত্ব ছিল না—এমন কম্পিউটার–সম্পর্কিত পেশায় এখন যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন।

গিগ অর্থনীতি, ই-কমার্স ও কনটেন্ট তৈরির মতো নতুন শিল্পেও কাজ করছেন আরও প্রায় ৮০ লাখ মানুষ।

ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের দল পরিচালনা করবেন। কেউ হয়তো এআই এজেন্টদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার কাজ করবেন।

আজকের চোখে এসব ধারণা অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু এক-দুই দশক আগেও ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ পেশাটির এমন বিস্তার কল্পনা করা কঠিন ছিল।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026