বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:৪৬

বীরাঙ্গনাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তামাশা

বীরাঙ্গনাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তামাশা

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর আসলেই শোরগোল শুরু হয়, জাতির শ্রেষ্ঠ নারীদের নিয়ে; লাল-সবুজের পতাকা ওড়াতে যাদের নিজের সম্ভ্রম হারাতে হয়েছিল সেই বীরাঙ্গনাদের। ডিসেম্বর মাসেই বীরাঙ্গনাদের জীবনমান উন্নয়ন আর মর্যাদা বৃদ্ধির কথা নিয়ে ভাবতে বসেন দেশের জ্ঞানী-গুণীজনেরা। শুধু বেসরকারি সংস্থাই নয়, সবার ভালোবাসা আর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও বীরাঙ্গনাদের নিয়ে তামাশা করছে।

২০১২ সালের ১৭ নভেম্বর শনিবার সকাল ১১টায় সভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শুরু হয় দুপুর ১২টায়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সভায় যোগ দেন প্রায় ৩০ জন, যারা বিভিন্নভাবে নিজ নিজ জায়গা থেকে বীরাঙ্গনাদের সেবা প্রদানে ইচ্ছুক। ছিলেন চিকিৎসক, আইনজীবী, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা। সভায় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হকসহ আরো দুই ট্রাস্টি। ছিলেন চিকিৎসক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আব্দুর নূর তুষার, কম্বোডিয়ার নমপেনে সংঘাতকালে যৌনপীড়নের শিকার নারীদের আঞ্চলিক শুনানিতে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মনোয়ারা বেগম এবং উম্মে ওয়ারা মিশু।

এছাড়াও আইনজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তবে ছিল না কোনো বীরাঙ্গনার অংশগ্রহণ। নবীন-প্রবীণের অংশ নেওয়ার কথা বলা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র শরীফুল ইসলাম শিমুল ছাড়া আর কোনো শিক্ষার্থী সভায় ছিলেন না। সভায় পরিকল্পনা হয়, একটি ফাউন্ডেশন গঠনের। বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া, সমাজে সম্মান নিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনাও।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ফাউন্ডেশনের পরিচালকমণ্ডলী  (সর্বোচ্চ নয় সদস্য বিশিষ্ট) এবং উপদেষ্টা-পর্ষদ (সর্বোচ্চ ২১ সদস্য বিশিষ্ট) থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একজন নির্বাহী পরিচালক তত্ত্বাবধান ও বাস্তবায়নের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে জানানো হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের জন্য দক্ষ ও আগ্রহী ব্যক্তিদের নিয়ে চারটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চিকিৎসা-সহায়ক কমিটি, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও গবেষণা কমিটি, আর্থিক স্বাবলম্বী সহায়ক কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবী কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সভায় অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিমুল বাংলানিউজকে বলেন, ওই সভাতেই শুরু হয় ফাউন্ডেশনের স্বপ্ন, শেষ হয় সেই সন্ধ্যায় উপস্থিতদের একটি মেইল পাঠানোর মধ্য দিয়ে। এরপর আর কোনো সভায় মিলিত হননি পরিকল্পনাবিদেরা। আমাকেও আর ডাকেননি।

এদিকে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সূত্র জানায়, ওই সভার পর থেকে এ ফাউন্ডেশনের আর কোনো কাজ হয়নি। তবে অল্প কয়েকজন মিলে হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইলে কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। সে সব ছবি এবং কথা নিয়েই ব্রশিয়ার তৈরি করা হবে এবং সেগুলো দিয়েই ফান্ড গঠনের জন্য কাজ করা হবে। তবে ইতোমধ্যেই, মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করেছে ফাউন্ডেশনের জন্য কাজ করা কয়েক জন।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবহেলিত বীরাঙ্গনাদের তথ্য তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সে সব পরিকল্পনার অগ্রগতি শূন্য। ফাউন্ডেশনের অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল মনোয়ারা বেগমের কাছে। বুধবার সন্ধ্যায় তিনি ফোনে বলেন, তিনটি জেলায় আমরা কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। এর বেশি কিছু আমি জানি না। মফিদুল হককে ফোন দিলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।

মফিদুল হককে ফোন দিলে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা স্থির হলে ফাউন্ডেশন আবারও কাজ করবে। প্রথম সভার পরে আর সভা হয়নি উল্লেখ করে তিনি পরামর্শ দেন, মিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করার। কিন্তু উম্মে ওয়ারা মিশুকে ফোন দিয়ে পাওয়া যায়নি।

বীরাঙ্গনাদের নিয়ে তামাশা বা ইস্যুকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল নতুন কিছু নয়। ডিসেম্বরে বীরাঙ্গনাদের দেওয়া প্রতিশ্রতি ভুলে যান মন্ত্রী থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের সবাই। ২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সামাজিক সংগঠন নারীপক্ষ একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা হয় সাত বীরাঙ্গনাকে।

সন্ধ্যায় প্রদীপের আলোয় বীরাঙ্গনাদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা আর দেশের জন্য নিজেদের মান বিসর্জনের কথা শুনে অশ্রু ঝরিয়েছিলেন অনেকেই। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভুরি ভুরি। সে সন্ধ্যায় বাংলানিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একাত্তরের দুর্বিষহ স্মৃতিচারণ করেন সিরাজগঞ্জের বীরাঙ্গনা রাজু বালা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা সদস্যরা তার সম্ভ্রমহানি করে।

এরপর শ্বশুর বাড়ির লোকজন ও সমাজ তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু, মুক্তিযোদ্ধা স্বামী ঠিকই গ্রহণ করেন তাকে। যুদ্ধের পর স্বামী মারা গেছেন। কিন্তু, তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান থেকে পাওয়া ‘বীরাঙ্গনা’র গৌরব আজ আর নেই।

সূত্র: বাংলানিউজ২৪




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026