উজ্জ্বল মেহেদী, সিলেট |
রাতের আঁধারে মুর্তাগাছ (যা দিয়ে পাটি তৈরি করা হয়) কেটে রাখা হয়। সপ্তাহ খানেক পর কাটা মুর্তা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব কাজ ‘অজ্ঞাত-নামা দুর্বৃত্তরা’ করেছে বলে বন বিভাগ শনাক্ত করে। তার দিন কয়েক পরই শুরু হয় মুর্তাবিহীন জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রির কাজ।
সিলেটের সালুটিকর বন বিটের তত্ত্বাবধানে ৩৮৫ একর জমিতে মুর্তা বাগানে এবার শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই এভাবেই মাটি-বাণিজ্য শুরু হয়েছে। মাটি কেটে নেওয়া অংশের জমির মালিক দাবিদারেরা ধান রোপণ করছেন। আবার জমির মালিক দাবিদারদের কেউ কেউ মাছের খামার তৈরির জন্য পুকুরও খনন করছেন।
বন বিভাগ সিলেট রেঞ্জ সূত্র জানায়, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে সিলেট অঞ্চলে মুর্তাগাছ চাষের উপযোগিতা থাকায় বনায়ন কর্মসূচির আওতায় বন বিভাগ সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট উপজেলায় বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জায়গায় মুর্তা বাগান সৃজন করে। মুর্তাগাছ পরিপক্ব হলে ব্যবহূত হয় বেতশিল্পে। গোয়াইনঘাটের নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের আঙ্গারজোর এলাকার ধারীরপাড় মৌজার ৩৮৫ একরের মুর্তা বাগান দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে সালুটিকর বন বিট।

মুর্তাগাছমুর্তা বাগানের চারদিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলি জমি থাকায় স্থানীয় একটি ভূমি ব্যবসায়ী চক্র শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে দখল-তৎপরতা শুরু করে। প্রায় এক মাস আগে জমির পাশাপাশি অন্তত ৫০ একরের মুর্তা বেত পুড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ভূমির প্রকৃতি পরিবর্তন করে। পরে সেখানকার মাটি বিক্রি করে জমির মালিকানা দাবি করে দখলে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। এ তৎপরতায় অন্তত ২৫ একর জায়গা বন বিভাগের হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গত সোমবার সরেজমিনে দেখা গেছে, সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়কের সঙ্গে মাটি ফেলে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে ট্রাক চলাচলের জন্য। ওই রাস্তা দিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্বাংশে পাঁচটি গর্ত। দুটিতে পার্শ্ববর্তী ধানি জমি সমান্তরাল করে চলছে চাষবাস। অন্য তিনটি মাছ চাষের জন্য খনন করা হয়েছে নিয়োজিত শ্রমিকেরা জানালেন। ট্রাকপ্রতি মাটি ২০০ টাকা দরে বিক্রি হয় জানিয়ে এক শ্রমিক বলেন, বনে তো আমরার পেট ভরত না, ধানখেত করলেই পেট ভরব!
মুর্তা বাগান থেকে কেটে ফেলা মাটি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইটভাটায় বিক্রি হচ্ছে বলে সালুটিকর এলাকার বাসিন্দারা জানান। সালুটিকর বন বিটের যোগাসাজশে আড়ালে রয়েছে সংঘবদ্ধ ভূমি ব্যবসায়ী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, মুর্তা বেত পোড়ানোর পর ইটভাটায় মাটি বিক্রির কাজ প্রকাশ্যেই করেছেন সালুটিকরের মানিক মিয়া, আবদুল হক, আরজু আলী ও আজিজ মেম্বার। তাঁদের মাধ্যমে বাগানের অভ্যন্তরে আটগাঁও খালের ওপর মাটি ফেলে ট্রাক চলাচলের রাস্তা করা হয়েছে।
মুঠোফোনে মানিক মিয়া দাবি করেন, বন বিট কর্মকর্তাকে জানিয়েই তাঁরা এ কাজ করছেন। এভাবে কি বনের জমি দখলে নেওয়া যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে মানিক বলেন, ‘বন্দোবস্ত পাওয়া আমার কিছু জায়গা বাগানে ঢুকে পড়েছে। সেগুলো উদ্ধার করতে গিয়ে মাটি কাটা ও জমিতে রূপান্তর করা হয়েছে।’ বন্দোবস্ত কার কাছ থেকে পেলেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি বন বিভাগ জানে।
সালুটিকর বন বিটের কর্মকর্তা মঞ্জুরুল হাসান পাঠান স্বীকার করেন, স্থানীয় একটি চক্র বাগানের জমি দখলে এ তৎপরতা চালিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগ কী করছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজই (মঙ্গলবার) সেখানে গিয়ে আমি এদের মাটি কাটতে নিষেধ করে এসেছি। আমার কথা না শুনলে এদের তাড়িয়ে দেওয়ার শক্তি তো আমার নেই। মামলা করা যায়।
সিলেট রেঞ্জ কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদ উল্লাহ জানান, মুর্তা বাগানের জায়গা বন বিভাগের। এ জায়গায় কোনো ব্যক্তির দখল কিংবা দাবি থাকতে পারে না। এর পরও কেউ যদি এই দাবিতে দখল তৎপরতা চালায়, তাহলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
সৌজন্য: প্রথম আলো