বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৮

নবপ্রেরণার উৎস নববর্ষ

নবপ্রেরণার উৎস নববর্ষ

সুকুমার সরকার: আজ নববর্ষ- ১৪২১ সন। পয়লা বৈশাখ এখন সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। আর কোনো উৎসব-পার্বণে এমনটি দেখা যায় না। এদিন থাকে না কোনো ভেদাভেদ। সব মানুষ মিলে মিশে আনন্দযাপনে একাকার হয়ে যায়। এখন নববর্ষ মানেই উৎসবের মাতামাতি। নববর্ষে সারা ঢাকা শহর উৎসবে মেতে ওঠে। হয়ে যায় উৎসবের নগরী। বাংলাদেশে এদিন থাকে সরকারি ছুটি। এতে করে উৎসবের মাত্রাটা আরো বেড়ে যায়।

ঢাকায় এদিনের মূল উৎসবটা হয় রমনা পার্ককে ঘিরে।ছায়ানটের উদ্যোগে ভোরে রমনা বটমূলে বৈশাখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ বরণ উৎসব শুরু হয় মহাসমারোহে। অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার উদ্যোগে বৈশাখী র‌্যালির আয়োজন করা হয়। শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ নর-নারী রঙ-বেরঙের মুখোশ পরে নানা সাজে সজ্জিত হয়ে র‌্যালিতে অংশ নেয়। রাতের বিদায় বেলা ও সকাল হওয়ার মুখে রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসি চত্বরসহ গোটা রমনা এলাকা  লাখো মানুষের পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে।সবাই মুখিয়ে থাকেন পান্তার সঙ্গে ইলিশ ভাজার আস্বাদ নিতে।

বৈশাখ উপলক্ষে ফ্যাশন হাউসগুলোতেও থাকে নানা আয়োজন। পত্রিকাগুলো বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। ইলেকট্রনিক মিডিয়াও বৈশাখের নানা আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিবছর এভাবে বৈশাখ আসে আমাদের প্রাণের উৎসব হয়ে। অর্থাৎ বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে বৈশাখি উৎসবটা  অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ বাংলা সনের উৎপত্তির সঙ্গে জড়িত এই দেশের সংস্কৃতি ও জীবনধারা। সেইসঙ্গে রয়েছে প্রকৃতির অবস্থার সঙ্গে ফসলের মৌসুম ও খাজনা আদায়।

এইসব দিক লক্ষ্য রেখেই সুবিধার জন্য বাংলা সন তারিখ তথা পঞ্জিকার প্রবর্তন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। আর আবহমান কাল ধরে বাংলা নববর্ষ ও সেইসঙ্গে উৎসবটাও বাঙালির চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মিশে গিয়েছে। নববর্ষ এমন একটা উৎসব- যাকে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীসহ সকলেই সর্বজনীনভাবে প্রাণের আনন্দে বরণ করে নেয়। বাংলা নববর্ষ সুর-সঙ্গীতের, মেলা ও মিলনের, আনন্দ ও উৎসবের, সাহস ও সঙ্কল্পের প্রেরণা জোগায়।

আর উৎসববমুখর লাখো মানুষের পদচারনায় রাজধানী ঢাকা শহরের অধিকাংশ রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা মেলে  সেখানেই বসে যায় মেলা। তাই পয়লা বৈশাখ উৎসবকে এখন শুধু তার নিজের সঙ্গে তুলনা করা চলে। রাজধানীর ধারে কাছের জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসেন  ঢাকায় উৎসবে যোগ দিতে। সর্বজনীনতায় অন্য কোনো উৎসব একে ছুঁতে পারবে না।

বিদায় বছরের দুঃখ-গ্লানি, অতীতের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়ার দিনও পয়লা বৈশাখ। দেশের মানুষ ছাড়াও বিশ্ববাসীর কল্যাণে সবাই এক কাতারে শামিল হয়ে এগিয়ে যাওয়ার অগ্নিশপথ নেয়ার দিনও এটি। যা কবির ভাষায়- মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। অর্থাৎ বৈশাখের চেতনার তাপদাহে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও উজ্জীবিত হতে হবে।এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে পুরো ঢাকা শহর জুড়ে একাধিক সংগঠন উৎসবের আয়োজন করে। বাদ থাকে না গ্রাম-বন্দরও। গ্রাম-গঞ্জেও নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। হতো লাঠিখেলা, হা-ডু-ডু, কবিগান, সারিগান। এখন অবশ্য এসবের দেখা মেলে কদাচিৎ। এখন সেই স্থানটি দখল করেছেিএ কালের নাচ আর গান।

তবে একথা ঠিক যে, গাঙ্গেয় বঙ্গের ফসলের সঙ্গে নতুন বছরের দিনটির যোগসূত্র রয়েছে। আর যোগ আছে মোগল সম্রাট আকবরের পুণ্যাহের সঙ্গে। মিশে আছে গ্রাম বাংলার লোকজ উৎসবের সঙ্গে। ১৭৯৩ সালে ইংরেজ শাসকরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা প্রবর্তন করে। ফলশ্রুতিতে কৃষি অর্থনীতি, গ্রামীণ জীবন এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আসে। জমিদাররা বাংলা সন অনুসারে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তখন থেকে কৃষকরা বাংলা সন হিসেবে গ্রামীণ ভূমি ব্যবস্থায় তাদের জীবনাচরণে, পূজাপার্বণে, উৎসব-অনুষ্ঠান, বিবাহ ইত্যাদি কর্মকৃত্য করতে শুরু করে।

এছাড়া খাজনার দাখিলাপত্র বাংলা সন অনুযায়ী করা হয় এবং বাংলা ভাষায় মুদ্রিত হয়। তাই বাংলা সন ফসলি সন হিসেবেও চিহ্নিত হয়। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি বিষয়ে আন্তর্জাতিক কারণে ইংরেজি ব্যবহৃত হলেও বৃহত্তর গ্রাম-বাংলার জনগোষ্ঠী এখনও ছয়ঋতুর বাংলা কালপঞ্জি মেনে চলেন। বাঙালীর গভীর মানসে বাংলা নববর্ষের স্থান অনেক উঁচুতে। বাঙালির মনপ্রাণ জুড়ে রয়েছে বাংলা নববর্ষ। এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতী, কামার-কুমারসহ নানা পেশার মানুষ যুগ যুগ ধরে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে আনন্দ-উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ব্যবসায়ীরা এখনও হিসাবের নতুন খাতা-হালখাতা খোলেন বৈশাখের প্রথম দিনে।

এ জন্য মিষ্টান্নেরও আয়োজন থাকে। নববর্ষ উপলক্ষে দেশে গ্রামেগঞ্জে নদীর পাড়ে, খোলা মাঠে কিংবা বটগাছের ছায়ায় মেলার আয়োজন করা হয়। দোকানিরা মুড়ি, মুড়কি, পুতুল, খেলনা, মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশিসহ বাঁশ- বেত-কাঠ-মাটির তৈরি বিভিন্ন পসরা নিয়ে বসেন। কৃষকেরা বীজ বোনেন, চারা রোপণ করেন, ফসল কাটেন বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ করে। পয়লা বৈশাখ আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও উৎসবের দিন। বৈসাবি বা বিজু উৎসবে পাহাড়ী জনগোষ্ঠী আনন্দে মেতে ওঠে এ দিনে।

এরই ধারাবাহিকতায় সাংস্কৃতিক ও স্বাধিকার সংগ্রামের পথ ধরে ভাষা অন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির আত্মপরিচয় অবারিত হয়েছে। এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে বাঙালি অগ্রসর হয়েছে। নিজ পরিচয়ে বাঙালি হিসেবে স্বাধীন আবাসভূমি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। এ থেকেই বাঙালির নববর্ষ একান্তভাবে বাঙালির হয়ে ওঠে।পয়লা বৈশাখ ডাক দেয় বাঙালিত্বের। ডাক দেয় আধুনিকতার। হৃদয়ের সব ভালবাসা দিয়েেউদযাপন  করে বাংলার মানুষ। এত সুন্দর করে, এত হৃদয় দিয়ে উৎসবের রঙে রঙিন হতে আর কি কোনো জাতি পারে? বাংলা নববর্ষ তাই আমাদের মননের প্রতীক, আমাদের স্বপ্নের মূর্ত ক্যানভাস।
১৪২০ চলে গেল। শুরু হল ১৪২১। নতুন দিন, নতুন সময়- সেইসঙ্গে হৃদয়ের নতুন বারতা।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026