ইমরান আলী: তদন্তে কি হচ্ছে না হচ্ছে কেউ কিছু বলেন না, এমনকি পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কেউ আর খোঁজ নেয় না। তবে আমি বিশ্বাস করি, ইলিয়াস আলী ফিরে আসবেন। আমি সেই আশায় বুক বেঁধে আছি। কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট জেলা সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার দুই বছর পূর্তিতে তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা বাংলানিউজকে এ কথা বলেন।
গত বছরের ১৭ এপ্রিল বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর সারা দেশব্যাপী ঘটনটি আলোড়ন তোলে। গত দুই বছরেও রাজনৈতিক অঙ্গণেও ব্যাপক আলোচিত এ ঘটনার কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি-না তাও কেউ বলতে পারছেন না। বর্তমানে প্রতি মাসে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের মধ্যেই আটকে আছে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। প্রথম দিকে আদালত ৪৮ ঘণ্টা পর পর এ বিষয়ে অগ্রগতি জানাতে বনানী থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। প্রথমে ৭ কার্যদিবস, সর্বশেষ ৩০ কার্যদিবস পর পর এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। আদালতের নির্দেশে রাজধানীর বনানী থানা পুলিশ এ পর্যন্ত ৩৭ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় গত ২ এপ্রিল। তবে কোনো প্রতিবেদনেই দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া এখন পুলিশের রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর বিএনপি কয়েকটি কর্মসূচি পালন করলেও বর্তমানে কোনো কর্মসূচিতে এ ইস্যু আর স্থান পায় না। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী লুনা বলেন, নিখোঁজের এতোদিন পেরিয়ে গেলেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি। তিনি বেঁচে আছেন না মারা গেছেন কারও কাছে কোনো জবাব নেই। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলাম, তিনিও আশ্বাস দিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাসও কোনো কাজে আসেনি। তিনি বলেন, আমি এখন আশা নিয়েই বেঁচে আছি। আমি মনে করি, ইলিয়াস আলী ফিরবেন। তার ফেরার অপেক্ষায় আমার দিন কাটে। কথাগুলো বলতে বলতে চোখে পানি এসে যায় লুনার।
বনানী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আশরাফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, আমরা এখনও এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছি। আদালতের নির্দেশ অনুসারে আমরা আমাদের প্রতিবেদন দাখিল করে আসছি। তবে আদালতে কী বা কোনো অগ্রগতি বিষয়ে জানানো হয়েছে কিনা সে বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে ঘটনার পর পরই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করে ডিবি। তবে এ টিমও এখন পর্যন্ত কোনো সফলতা বের করতে পারেনি। মশিউর রহমানও বর্তমানে ডিবি থেকে বদলি হয়ে গেছেন। ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদুর রহমানও জানান, এখনও এ বিষয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানীর রাস্তা থেকে নিখোঁজ হন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী। এখন পর্যন্ত তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা বনানী থানায় একটি জিডি দায়ের করেন। এছাড়াও তার স্বামী ইলিয়াসের সন্ধানে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন।
ঘটনার পর পরই গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, অপহরণের আগের দিন বিকেলে ইলিয়াস আলী বিমানে সিলেট থেকে ঢাকায় আসেন। ওই দিন রাত ৯টা ৫ মিনিটে তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মীর নেওয়াজ আলী, মোনায়েম মুন্না ও আমজাদ হোসেনকে নিয়ে নিজ বাসা থেকে তার স্ত্রীর ব্যবহৃত প্রাইভেটকারে চড়ে রূপসী বাংলা হোটেলের উদ্দেশে রওনা হন। ওই দিন যুবদলের ৪ নেতা ও ছাত্রদলের ১ জন নেতাসহ মোট ৫ জন ২টি মোটরসাইকেলে ইলিয়াস আলীর বাসায় গিয়েছিলেন।
তাদের মধ্যে ৩ জন তার সঙ্গে একই গাড়িতে বের হন। অপর ২ জন জাহাঙ্গীর আলম ও শরীফ হোসেন নিজ নিজ মোটরসাইকেলে বের হয়ে যান। তারা হোটেল রূপসী বাংলায় যাননি। রূপসী বাংলা হোটেলে আগে থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মীর সরাফত আলী সফু, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুন নবী সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবু, কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল আলম নীরবসহ মহানগর উত্তর দক্ষিণ কমিটির ৮ থেকে ১০ জন নেতা একটি বৈঠক করেন। নিখোঁজের আগে ইলিয়াস আলী যখন হোটেল রূপসী বাংলা থেকে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে বের হন এ সময় তিনি মোবাইল ফোনে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলেন। তাকে তুলতে তার গাড়ি হোটেলের করিডোরে আসার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির পেছনে ২টি নোহা মাইক্রোবাসও এসে দাঁড়ায়। এরপর রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে তিনি নিখোঁজ হন। রাত দেড়টার পর ঘটনা জানাজানি হয়। পরে বনানী থানা পুলিশ পরিত্যক্ত অবস্থায় গাড়িটি উদ্ধার করে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জাতীয়তাবাদী যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে এম ইলিয়াস আলী অপহৃত হতে পারেন। এছাড়া ১৫ দিনের ব্যবধানে সিলেট জেলা ছাত্রদলের সহ সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমেদ দীনার, ছাত্রদলকর্মী জুনেদ আহমেদ নিখোঁজ/গুম হওয়ার ঘটনাও ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার কারণ হতে পারে। কিংবা কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীও ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করতে পারে।
ইলিয়াস আলী নিখোঁজের একদিন পর ১৮ এপ্রিল গোটা সিলেট বিভাগকে অচল করে দেন বিএনপি কর্মীরা। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিএনপির আহ্বানে ৫ দিন হরতাল পালন করা হয়। সিলেটের বিশ্বনাথে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির সংঘর্ষে যুবদল ও ছাত্রদলের তিন নেতা নিহত হন। তবে এক সময় রাজপথে ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য থাকলেও বর্তমানে এই ইস্যুটি নিয়ে বিএনপি নেতাদের তেমন একটা কথা বলতে দেখা যায় না।