বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১০:২০

বিএনপির ঘরের আগুন নিভছে না

বিএনপির ঘরের আগুন নিভছে না

মান্নান মারুফ ও সাজেদা সুইটি: দুঃসময় যেন পিছু ছাড়ছে না বিএনপি’র। নিভছে না ঘরের আগুনও। বরং কেন্দ্রীয় নেতাদের বহুমুখী কোন্দলের ছোঁয়া লাগছে মাঠে, এমন কি তৃণমূলেও। সিনিয়র নেতারা পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টি স্বীকার না করলেও তাদের বক্তব্যে দ্বন্দ্ব বেশ স্পষ্ট হয়েই ফুটছে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বাংলানিউজকে বলেন, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল, বড় পরিবার। একটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যেমন টুকটাক সমস্যা হতে পারে, তেমনি দলেও হতে পারে। কিন্তু তাতে দলটিকে দুর্বল ভাবার সুযোগ নেই। স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া বাংলানিউজকে জানান, প্রতিটি গণতন্ত্রমনা দলের নেতাকর্মীদের নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। মতের অমিল থাকতেই পারে। তার মানে সেটা কোন্দল নয়। নানা মত বিচারে দলের জন্য তৈরি হওয়া সিদ্ধান্তই দলের শক্তি বাড়ায়।

দলের দফতরের দায়িত্বে থাকা যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলানিউজকে জানান, টুকটাক সমস্যা দলের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে কোনো প্রভাব ফেলবে না। দলের সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচির প্রতি সবার আন্তরিকতা ও অংশগ্রহণ ঠিক থাকবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, দলের চরম মন্দ সময়েও স্বভাব বদলান নি নেতারা। নিজেদের দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিয়ে এখনো তারা এতোটাই ব্যস্ত যে, দলের সামগ্রিক কল্যাণ নিয়ে ভাবার সময় তারা পাচ্ছেন না। তিনি জানান, নিজেদের অবস্থান ও স্বার্থ নিয়ে নেতারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

ক্ষুব্ধ এই নেতা বলেন, দল যেখানে নানামুখী প্রতিকূলতায় পর্যুদস্ত, খালেদা জিয়া (দলটির চেয়ারপারসন) নানাভাবে চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি উন্নয়নে, সেখানে ‘কানামাছি’ খেলছেন নেতারা। তিনি বলেন, খালেদার সামনে অনেকেই গদগদ ভাব দেখান, কিন্তু নিজেদের আখের গোছান অন্তরালে। সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা নিজেদের একগুঁয়েমি ও স্বার্থপরতায় যারপরনাই ব্যস্ত রয়েছেন। নেতৃত্বে বিভক্তির কারণেই সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি সফল করতে দলটি হিমশিম খায়।

দুই স্রোতে মহানগর  
ঢাকা মহানগরে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ভাইস-চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার মধ্যে দ্বন্দ্ব একেবারেই প্রকাশ্য। সংগঠনের ঝিমিয়ে পড়ার পেছনেও এই দ্বন্দ্বকেই দায়ী করেন দলটির নেতারা। ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে এই দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নেতৃত্বের বিরোধ বাড়তে থাকে, যা পরে চরম আকার ধারণ করে। ফলে নগর বিএনপি ভিন্ন দু’টি স্রোতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিদ্যমান সঙ্কটে দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি।

সিনিয়র নেতাদের মধ্যেও দুটি গ্রুপ এই দুই নেতার পক্ষে কাজ করেন। এদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নজরুল ইসলাম খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, আমান উল্লাহ আমান, আব্দুস সালামসহ বেশ ক’জন প্রভাবশালী নেতা সাদেক হোসেন খোকার পক্ষে রয়েছেন। এদিকে ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ বেশ ক’জন নেতা রয়েছেন মির্জা আব্বাসের পক্ষে।

আলাল-নিরবের স্নায়ুযুদ্ধে নিস্তেজ যুবদল  
সংগঠনটির সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নিরবের দ্বন্দ্বের বিষয়টি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’।  ওয়ান-ইলেভেনের পর (আলাল- নিরব)কমিটি গঠনের পর থেকেই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও বিভাগ, জেলা কমিটি গঠন নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের মাত্রা বাড়তে থাকে। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার তাদের অনুসারীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

২০১১ সালে নয়াপল্টনে যুবদলের একটি বৈঠকে দুই গ্রপের মধ্যে বাকবিতণ্ডার এক পযার্য়ে অস্ত্রের মহড়া দেওয়া হয়। এ খবর বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার কানে গেলে তিনি তাদের ডেকে তিরস্কার করেন। যুবদলের দু’টি গ্রুপের প্রতি কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যেও পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। দুই নেতার একজন যুবদলে নিজেকে বিকল্পহীন মনে করেন। অপরজন নিজেকে তারেক রহমানের ‘খাসলোক’ দাবি করে প্রভাব খাটান। আর এভাবেই শক্তি খু্ইয়ে নিস্তেজ হচ্ছে সংগঠনটি।

কাউন্সিলে গিয়েও থমকে শ্রমিক দল  
কাউন্সিল করতে গিয়েও পারলো না শ্রমিক দল। এতে সিলেকশনের অভিযোগ তোলেন কর্মীরা। তাই স্থগিত হয়ে যায় কেন্দ্রীয় ও মহানগর কমিটি ঘোষণার কাজ। সংগঠনের সভাপতি নজরুল ইসলাম খানসহ কয়েকটি পদে নতুন নেতার নাম উচ্চারিত হচ্ছিল। তা নিয়েই এই গণ্ডগোল, নেতাদের মধ্যে পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব স্নায়ুযুদ্ধের কানাঘুষায় পরিণত রয়েছে।

প্রধানদের অবহেলায় কৃষকদল  
মান্নান ভুঁইয়ার আমলে এ সংগঠনটির সারাদেশেই কমিটি ছিল। বর্তমানে দু’একটি জেলায় কমিটি থাকলেও অনেক জেলার থানায় কমিটি বা কার্যক্রম নেই। সংগঠনের বর্তমান সভাপতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদু সংগঠনের কাজে সেভাবে সময় দেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এই দুই নেতা কৃষকদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও বলেন না সেভাবে। তাদের কাছেই তাদের সংগঠন অবহেলিত।

মহিলাদল  
এর আগে খালেদা জিয়ার বড় বোন খুরশীদ জাহান হক ও সেলিমা রহমান মহিলা দলের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তখন মহিলা দলের অবস্থা ছিলো অনেক ভালো। কিন্তু, এখন মহিলা দলের কার্যক্রম প্রশংসা কুড়াতে পারছে না। সংগঠনের নিজস্ব অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির উদ্যোগ সেভাবে নেই। বর্তমান সভাপতি নূরে আরা সাফা সংগঠন সক্রিয় রাখতে সক্ষম নন। শিরিন সুলতানার সঙ্গে তার সম্পর্কও তেমন ভালো নয়।

সাফাও কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেন নি। আর শিরীন অনেকের সঙ্গেই খারাপ ব্যবহার করেন ও অনেককে অবহেলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্নেহাস্পদ হওয়ায় শিরীন অনেকের সঙ্গেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন- ক্ষোভের সঙ্গে বলেন সংগঠনটির এক নেত্রী।

স্বেচ্ছাসেবক দলেও ভাটা  
স্বেচ্ছাসেবক দলে বড় ধরনের কোন দ্বন্দ্ব না থাকলেও সংগঠনটির কার্যক্রমে আগের চেয়ে একটু ভাটা পড়েছে। এর সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল মহানগর বিএনপিতে যাচ্ছেন বলে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তাতে এর কার্যক্রমে স্থবিরতা এসেছে। তার স্থলাভিষিক্ত কে হবেন- তা নিয়েও প্রতিযোগিতা রয়েছে বলে জানান এক সদস্য।

ছাত্র-অছাত্র দ্বন্দ্বে ছাত্রদল 
ছাত্রদলের অনেক নেতাই দীর্ঘদিন ধরে তেমন সক্রিয় নন। অছাত্র-বিবর্জিত ছাত্রদল গঠনের উদ্যোগে ছাত্রনেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও বেড়েছে বলে সূত্রের দাবি। যারা দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদল করছেন এবং আশা করছিলেন, এক সময় সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছুবেন, তারা এখন ক্ষুব্ধ। দল বদলানোর চিন্তাও করছেন কেউ কেউ। এর আগের কমিটিতে স্থান না পাওয়াদের ক্ষোভই এখনো মেটেনি। মির্জা ফখরুলসহ অনেকেই চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি এসব দ্বন্দ্ব নিরসনে।

প্রচার না পেয়ে হতাশায় জাসাস 
জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন মিডিয়ায় সেভাবে প্রচার না পেয়ে ক্রমশই হতাশ হচ্ছেন। যারা মিডিয়ায় অধিক পরিচিত তারা এবং যারা সংগঠনে ভালো পদে রয়েছেন, তাদের মাঝে টুকটাক সমস্যা লেগেই থাকে বলে জানান সংগঠনের এক নেতা।

অন্যান্য  
তাঁতী দল, ওলামা দল, মৎস্যজীবী দলের কর্মকাণ্ড সেভাবে চোখে না পড়লেও তাদের ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কম নেই। অনেক নেতাই দফতরে যান না। নিজেদের ব্যবসা ও অন্যান্য দিকে সময় দেন। একে অন্যের সমালোচনায় বিভোর রয়েছেন অনেক নেতা। নিজেদের এই দ্বন্দ্ব-কোন্দলে দুর্বল সংগঠনগুলো আরও দুর্বল হচ্ছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026