শেখ নাসির হোসেন: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ভ্রমণ খাতের ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ কোম্পানির মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত দুই প্রান্তিকে বড় অংকের মুনাফা কমার পর চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও কোম্পানিটির মুনাফা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে উল্লেখযোগ্যহারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত কোম্পানিটির অনিরীক্ষিত তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে মার্চ-২০১৪) আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিটির মুনাফা গত অর্থবছরের চেয়ে ১৪ কোটি টাকার বেশি কমেছে। এছাড়া কোম্পানিটির অর্ধবার্ষিকী (জুলাই থেকে ডিসেম্বর-২০১৩) আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোম্পানির মুনাফা গত অর্থবছরের চেয়ে ৪২ কোটি টাকার বেশি কমে।
অন্যদিকে প্রথম প্রান্তিকেও (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর-২০১৩) এ কোম্পানির মুনাফা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪ কোটি টাকার বেশি কমেছিল। শুধু অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়েই এ কোম্পানির মুনাফা কমে ২৮ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা বা ৮২ শতাংশ।
এদিকে কোম্পানির মুনাফা এমন ধারাবাহিকভাবে কমায় অনেকটা হতাশ হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের দাবি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের ভালো লভ্যাংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত করার জন্যই ইচ্ছাকৃতভাবে আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা কম দেখিয়েছে। তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে এ কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখিত ব্যয়সমূহ তদন্ত করারও দাবি জানিয়েছন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব আতাউল্লাহ নাঈম বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো যে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে তা কতটুকু স্বচ্ছ এটা বিচার করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আমাদের দেশে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট না থাকায় কোম্পানিগুলো আর্থিক প্রতিবেদনে ইচ্ছামতো ব্যয় দেখিয়ে মুনাফা কম দেখায়। ফলে বিনিয়োগকারীরা ভালো লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হন।
গত ৩১ মার্চ ২০১৪ পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে মার্চ-২০১৪) কোম্পানিটির প্রতিবেদনে কর পরবর্তী মুনাফা দেখানো হয়েছে মোট মাত্র ৫ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) দেখানো হয়েছে ০ দশমিক ০৯ টাকা।
অন্যদিকে গত অর্থবছররের একই সময়ে কোম্পানির কর পরবর্তী মুনাফা দেখানো হয়েছিল ১৯ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ০ দশমিক ৩৫ টাকা। সুতরাং তৃতীয় প্রান্তিকে এ কোম্পানি মুনাফা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ কোটি ২৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা বা ৭২ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া গত নয় মাসে (জুলাই-২০১৩ থেকে মার্চ-২০১৪) এ কোম্পানিটির প্রতিবেদনে কর পরবর্তী মুনাফা দেখানো হয় ৩২ কোটি ৮৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ০ দশমিক ৫৮ টাকা। গত অর্থবছর একই সময়ের মধ্যে কর পরবর্তী মুনাফা দেখিয়েছিল ৮৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং শেয়ার প্রতি মুনাফা (ইপিএস) দেখিয়েছিল ১ দশমিক ৫৭ টাকা। সুতরাং চলতি অর্থবছরের গত নয় মাসে (জুলাই-২০১৩ থেকে মার্চ-২০১৪) এ কোম্পানি মুনাফা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকা বা ৬৩ শতাংশ কমেছে।
কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১২ সালের শেষ ছয় মাসে কোম্পানিটি কোনো ধরনের বিলম্বিত কর সমন্বয় না করলেও ২০১৩ সালের একই সময়ে এসে প্রায় ১২ কোটি টাকা কর সমন্বয় করেছে। পরবর্তীতেও এ কোম্পানিটিকে এ খাতে বড় অংকের অর্থ সমন্বয় করতে হবে।
এছাড়া ২০১২ সালের এই সময়ে আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ ছিল চার কোটি টাকার কিছুটা বেশি। আর ২০১৩ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকায়। সুতরাং একই সময়ে কোম্পানির ব্যয় বেড়েছে ৬ কোটি টাকার কিছুটা বেশি।
অন্যদিকে ২০১২ সালের শেষ ছয় মাসে কোম্পানির প্রশাসনিক ব্যয় ছিল প্রায় ৪২ কোটি টাকা। আর ২০১৩ সালের একই সময়ে তা বেড়ে হয় প্রায় ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সুতরাং ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকা। মূলত ব্যয়ের খাতে ঋণের খরচ যোগ, নতুন উড়োজাহাজ ক্রয় এবং নতুন রুটে বিমান চলাচল শুরু করায় চলতি অর্থবছরে কোম্পানির ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় মুনাফা কমেছে বলে মনে করছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
ধারাবাহিক মুনাফা কমার কারণ উল্লেখ করে কোম্পানিটির শেয়ার বিভাগের ম্যানেজার ওলিউর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, ইউনাইটেড এয়ারের যে ল্যান্ডিং কস্ট (বিমান রাখার স্থান ভাড়া বাবদ খরচ) ছিল তা সমন্বয় করার কারণে কোম্পানির মুনাফা কম হয়েছে। তবে আগামীতে মুনাফা ভালো আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে ইউনাইটেড এয়ারের রাইট শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা বাজারে গুজব মাত্র। তবে একটি কোম্পানিকে এগিয়ে নিতে হলে অনেক সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা থাকে। আমাদেরও আছে। রাইট শেয়ার ছাড়ার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। আমরা রাইট শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে শর্ত পূরণ করে ঘোষণা দেব।