জাহাঙ্গীর সুমন: দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডরুম থেকে প্রতিটি বালাম বই পাঁচ দিনের জন্য বের করে দিতেন রেকর্ডরুমের পিয়ন আলী আহমেদ কেটু (৩৫) ও আব্দুস সোবাহান (৩২)। আর এ বালাম (জমির মূল মালিকের বিস্তারিত তথ্য) বইয়ে মূল মালিকের তথ্য ও পাতা পরিবর্তন করে প্রতারক চক্রের নাম লিখে তা আগের মতো রেকর্ডরুমে নিয়ে রাখতেন ওই দুই পিয়ন।
চার দিনের পুলিশি রিমান্ডে এমনই তথ্য দিয়েছে ঢাকা জেলা ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুমের পিয়ন আলী আহমেদ কেটু (৩৫) ও আব্দুস সোবাহান (৩২)।
দুই পিয়নসহ বালাম বই জালিয়াতি চক্রের মোট ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ তার কার্যালয়ে গ্রেফতারদের বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, আটক ৯ জনের মধ্যে পুরান ঢাকার হরেকৃষ্ণ নামে একজন জমির দলিল গ্রহিতাও রয়েছেন, যিনি কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে বালাম বইয়ের তথ্য পরিবর্তনের জন্য এ চক্রের সহযোগিতা নেন। এছাড়া আরও বেশ ক’জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে পেরেছে পুলিশ, যারা এ চক্রের মাধ্যমে বালাম বইয়ের তথ্য পরিবর্তন করে জোর করে জমি দখল ও আদালতে মামলা করে অন্যের জমি নিজের নামে করিয়ে নিয়ে মোটা অংকের টাকায় বিক্রি করতেন।
যেভাবে আটক হয় চক্রের সদস্যরা:
ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২০ জুন মিরপুর থানা পুলিশের একটি দল মিরপুর দুই নম্বর সেকশনের ই-ব্লকের ৭ নম্বর রোডের সি-১ নম্বর বাসা থেকে দলিল লেখক (ভেণ্ডর) মেহেদী হাসানসহ (৩৫) টুকু মিয়া (৩২) ও ওবায়দুর রহমান নামের তিনজনকে আটক করে। এসময় ওই বাড়ি থেকে ঢাকা জেলা ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের ১৯৩৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ঢাকা জেলার বিভিন্ন থানার ১৪টি বালাম বই, ১১০টি বিভিন্ন কর্মকর্তার নাম পদবী সম্বলিত সীলসহ ভূমি অফিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়।
ওই দিনই মিরপুর থানা পুলিশ আটক তিনজনকে ৫৪ ধারায় আটক দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে আটক দলিল লেখক মেহেদী হাসান জানান, কয়েক মাস থেকে তারা কয়েকজন মিলে বালাম বইয়ের তথ্য পরিবর্তনের সাথে জড়িত, আর এ কাজে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড শাখার পিয়র (অফিস সহকারী) আলী আহমেদ কেটু (৩৫) ও আব্দুস সোবাহানসহ (৩২) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা -কর্মচারী জড়িত।
পুলিশকে দেওয়া তথ্যমতে ১ জুন রাতে পুরান ঢাকার একটি বাসা থেকে বালাম বইয়ের তথ্য পরিবর্তনের জন্য মোটা অংকের টাকা দেওয়া জমির দলিল গ্রহিতা হরেকৃষ্ণ সরকারসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেও পাওয়া যায় রেকর্ড শাখার পিয়ন আলী আহমেদ কেটু ও আব্দুস সোবাহানের নাম।
২২ জুন সকালে তেজগাঁও ঢাকা জেলা ভূমি রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পুলিশ দুই পিয়ন আলী আহমেদ কেটু ও আব্দুস সোবাহানকে গ্রেফতার করে একই ঘটনায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
পাঁচদিনের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে আলী আহমেদ কেটু স্বীকার করেন, প্রতিটি বই দুইলাখ টাকার বিনিময়ে রেকর্ডরুম থেকে পাচার করে তথ্য পরিবর্তনের চাঞ্চল্যকর রহস্যের কথা। আর একাজে সহযোগিতার জন্য ১৫/২০ জনের একটি দল কাজ করে।
যেভাবে জমির মালিকের তথ্য পরিবর্তন করা হয়:
ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদ আরো জানান, জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে বালাম বই রেকর্ড রুম থেকে বের করে নিয়ে আসা হয় মিরপুরে দলিল লেখক মেহেদীর বাসায়, সেখানেই হয় তথ্য পরিবর্তনের মূল কাজটি।
বালাম বইটি পাতা বিশেষ কায়দায় খুলে তাতে নতুন পাতা সংযোজন করে বালাম বইয়ের পাতায় আগে যে কলমে লেখা হয়েছে, যেভাবে লেখা হয়েছে হুবহু তা নকল করে প্রতারক জমির মালিকের তথ্য লেখা হয়। আর এজন্য বিশেষ ভাবে তৈনি সেখানে থাকা আগের সীল ও সীল মোহর দেওয়া হয়। এসব সীল মিরপুর এলাকার একটি দোকান থেকে বেশি দামে তৈরি করে নেন প্রতারাকচক্রের সদস্যরা।
এরকম ১১০টি বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও কর্মকর্তার নামের সীল উদ্ধার করে জব্দ করে পুলিশ।
পুলিশের জব্দ করা বালাম বইগুলো হলো, ঢাকা-৩১৮/১৯৮২, দ্বিতীয় জয়েন্ট ২৫/১৯৩৮, ঢাকা-৬৮০/১৯৭৮ও ৬৬৪/১৯৭৮, কেরাণীগঞ্জ-৯৯/২০০১, ঢাকা- ২৭/১৯৪৫, মিরপুর -৩৫/১৯৮৫, ঢাকা-১৩০/১৯৭৯, মোহম্মাদপুর-১৯৪/২০০৪, দ্বিতীয় জয়েন্ট-৩৩/১৯৯৬-১৭, সাভার-১৩৮/১৯৯৬ ঢাকা-১১২/১৯৭৮।
যেভাবে কাজে লাগানো হয় বালাম বই:
গ্রেফতাররা জানান বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ জমি দখল বা বিক্রির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল তাদের সাথে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বালাম বইয়ের তথ্য পরিবর্তন করে । আর এই বালাম বইয়ের তথ্যকে কাজে লাগিয়ে আদালত বালাম বইয়ের রেকর্ড যাচাই করে মামলার মালিকানা সংক্রান্ত রায়গুলো দিয়ে থাকে। এতে যে মানুষকে তার জমির মালিকানা থেকে বাদ দিয়ে প্রতারক চক্র তাদের সম্পত্তি সহজেই হাতিয়ে নিতে পারে।
এ চক্রের সাথে বেশ রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বিশেষ কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।
মিরপুর থানা অফিসার ইনচার্য সালাউদ্দিন খান জানায়, তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই বাছাই করছে পুলিশ।
তবে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার (ডিআর) আব্দুল কাইয়ুমের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি রেকর্ড রুমের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, এসব জালিয়াতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।