সুমন আহমেদ: সরকারের অর্থ খরচে লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অস্বচ্ছতা এবং মিজারুল কায়েসের ক্ষমতার অপব্যবহার ধরা পড়ে সম্প্রতি সরকারি নিরীক্ষায়। এক গাদা অভিযোগের মধ্যে মোহাম্মদ মিজারুল কায়েসকে লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর লন্ডনে হাইকমিশনার করে পাঠানো হয় ’৮৪ ব্যাচের ক্ষমতাধর কর্মকর্তা মিজারুলকে। তার আগে রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশে রাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি। বলা হয়ে থাকে আওয়ামীলগের খুব কাছের লোক বলে পরিচিতি প্রাপ্ত এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা। যার উপর ক্ষেপে আছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়মীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
অনিয়মের বিষয়ে উত্থাপিত ৫৭টি আপত্তির মধ্যে ৪৭টি অনিষ্পন্ন রেখে দেয়া ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের চূড়ান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে হাইকমিশনের আর্থিক ব্যয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে সরকারি বিধি লঙ্ঘন এবং অনুমোদন ছাড়া ব্যয় করা বিপুল অংকের টাকা ফেরত নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পূর্বাপর যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনার বিষয়ে যথেষ্ট উদ্যোগ না নেয়ার কারণেও তার বিরুদ্ধে সমালোচনা রয়েছে।
জানা যায়, খোদ প্রধানমন্ত্রী ব্রিটেন সফরের সময়ে হোটেল স্যুটে সেই বিশিষ্ট প্রবাসী আর পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সামনেই মিজারুল কায়েসকে ভর্তসনা করেন। মিজারুল কায়েসের পারফর্মেন্স আশানুরূপ না হওয়াতে ইতিমধ্যেই তাকে ব্রাজিলে বদলি করা হয়েছে। তিনি এখনো স্বপদে লন্ডনে অবস্থান করায় প্রাইম মিনিস্টার বিশেষ মহলের সামনেই উষ্মা প্রকাশ করেন। বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছেন, মিজারুল কায়েস সকল নিয়ম নিতির উপেক্ষা আর কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত বিধি ও প্রাইম মিনিস্টারের ব্রিটেন সফরে কোন ভূমিকা রাখতে না পারার ব্যর্থতা-হেতু তাকে ওএসডি করে দেশে নেয়া হচ্ছে।
সরকার প্রধানের বিদেশ ও প্রটোকল এবং দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সহ যাবতীয় আনুষঙ্গিক কাজ কর্ম সাধারণত: আয়োজন ও দেখভালের দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট দেশের হাইকমিশনের উপর। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে এবারের প্রধানমন্ত্রীর ব্রিটেন সফরের কোন আয়োজনের সাথে বাংলাদেশের নিযুক্ত হাই কমিশনার মিজারুল কায়েস কোনভাবেই জড়িত কিংবা সামান্যতমও কোন ক্রেডিবিলিটি ছিলোনা।
সরকারী একেবারে উঁচু পদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, প্রাইম মিনিস্টারের এবারের ব্রিটেন সফর একজন প্রবাসী বাংলাদেশী, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ের জগতে যিনি বাংলাদেশ ও তৃতীয় বিশ্বের আইকন হিসেবে সমধিক পরিচিত, তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং একই সাথে সেই প্রবাসী ব্যবসায়ীর সাথে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কোয়ালিশন সরকারের এমপিদের ব্যক্তিগত কানেকশন এবং বিশেষ করে কীথ ভাজ এমপির একান্ত ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সুবাধে, প্রাইম মিনিস্টারের ব্রিটেন সফর সহ ডেভিড ক্যামেরনের সাথে বৈঠকের যাবতীয় বন্দোবস্ত করেন। গার্ল সামিটের ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ইউরোপ ডেস্কের কর্মকর্তাদের দ্যুতিয়ালিতেই সম্পন্ন হয়। এখানে মিজারুল কায়েস কেবলমাত্র সাক্ষীগোপাল হয়ে আছেন।
যুক্তরাজ্যের কয়েকটি সূত্র জানায়, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মিজারুল কায়েস পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। লন্ডনে নতুন দায়িত্ব নিয়ে যাওয়া হান্নানও পররাষ্ট্র ক্যাডারের ’৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর হান্নান এর আগে ওমান, করাচি, অটোয়া, কলকাতা ও মস্কো দূতাবাসে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্রাজিল থেকে জেনেভায় নতুন দায়িত্ব নিয়ে যাওয়া শামীমও অন্য দুজনের সঙ্গে একই ব্যাচে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি এর আগে ইরান, ব্রুনেই দারুসসালাম, নয়া দিল্লি মিশনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।