জুটন বনিক: রিকশা চালাই বলে লজ্জা কিসের, আমি কোনো কাজকেই ঘৃণা করি না। যারা কাজকে ঘৃণা করে আমি তাদের ঘৃণা করি। এভাবেই কথাগুলো বলছিল চট্টগ্রামের অটোরিকশাচালক জেসমিন।
পুরো নাম জেসমিন আক্তার (৩৫)। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাবুটিয়া গ্রামে। প্রায় ২০ বছর আগে বিয়ে হয় একই জেলার চান্দিনা উপজেলার রিকশাচালক হারুন-অর রশিদের সঙ্গে। সুখেই কাটছিল তাদের সময়। এরই মধ্যে সংসার আলো করে আসে তিন ছেলে। কিছুদিন বাদে স্বামীর মাথায় ভূত চাপে বিদেশ যাওয়ার।
বড়লোক হওয়ার তীব্র বাসনায় স্বামীর বিদেশ যাওয়ার টাকা যোগাড় করতে জেসমিন নিজেই শুরু করেন ধার-দেনা। অবশেষে বাপের বাড়ি ও নিকটাত্মীয়ের টাকায় স্বামী হারুনকে বিদেশ পাঠাতে সক্ষম হন তিনি। কে জানতো এই বড়লোক হওয়ার বাসনাই তার জীবনে একদিন কাল হবে দাঁড়াবে।
বিদেশ যাওয়ার বছর খানেক বাদেই স্বামী হারুনের ফোন আসে জেসমিন আমি এখন রিকশাওয়ালা না, পয়সাওয়ালা। একসময় খবর আসে হারুন এখন অন্য কারো হয়ে গেছে। এরপর থেকে তার জেসমিনের ঘৃণা জন্মায়। তখন অভাবে জেসমিন দিশেহারা। কারো কাছ থেকেই আর কোনো সাহায্য পাচ্ছিলেন না। একসময় ভাগ্য অন্বেষণে ছুটে আসেন চট্টগ্রামে। মনে মনে ঠিক করেন রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করবেন। আর এটাই হবে তার (হারুনের) প্রতি জেসমিনের চরম প্রতিশোধ।
এরপর থেকে জেসমিনের নরম কোমল হাত হয়ে ওঠে বজ্রকঠিন। মহানগরের পিচঢালা পথ এখন তার ঠিকানা। সেই ত্রি-চক্রের রিকশাই তার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। মঙ্গলবার সকালে জেসমিন আখাউড়ায় আসেন খরমপুর শাহ্ পীর কল্লা শহীদ মাজার জিয়রত করতে। স্টেশন থেকে বের হতেই দেখা হয় তার পরিচিত এক রিকশাচালকের সঙ্গে। পরে পরিচিতের রিকশা চালিয়েই জেসমিন ছোটেন গন্তব্যস্থলে।
এ সময় তাকে রিকশা চালাতে দেখে পথচারীরা হতবাক হয়ে যান। আখাউড়া পৌরশহরের সিএনজি চালিত অটোরিকশার যন্ত্রাংশ বিক্রেতা গাজী আলাউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, একজন নারী রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন যা সত্যিই প্রসংশনীয়। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট (অব.) সুলতান মাহমুদ বলেন, এই প্রথম কোনো নারীকে দেখলাম যিনি পুরুষের পাশাপাশি রিকশা চালাচ্ছেন।
জেসমিন বাংলানিউজকে জানান, রিকশা চালিয়ে এখন আমি স্বাবলম্বী। বর্তমানে চট্টগ্রামে আমার ব্যাটারিচালিত চারটি অটোরিকশা আছে। একটি নিজে চালাই। বাকি তিনটি ভাড়ায় চলে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন এক/দেড় হাজার টাকা আয় হয়। তিনি আরো জানান, চট্টগ্রামের ভাড়া বাসায় সুখেই আছেন তিনি। তবে তার তিন ছেলে থাকে গ্রামের বাড়িতে।