শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪, ১১:১৯

সেনাবাহিনীর জন্য চিরস্থায়ী কলংক

সেনাবাহিনীর জন্য চিরস্থায়ী কলংক

‘সেনাবাহিনীর জন্য চিরস্থায়ী কলংক’

জাহিদ নেওয়াজ খান: সেদিন সকালে ঘুম ভেঙেছিলো মায়ের কান্নায়। বুঝতে পারি, মায়ের বুক চাপড়ে হাউমাউ করে কান্নার কারণ, রেডিওর একটি ঘোষণা। রেডিওতে কেউ কিছু বলছিলেন, আর মা বুক চাপড়ে বলছিলেন, মুজিবররে মাইরা ফেলছে, মুজিবররে মাইরা ফেলছে। তখন আমার বয়স মাত্র ছয়। মুজিব বলতে আমার কাছে একটাই ইমেজ, আঙুল তুলে একজন মানুষের বক্তৃতার ছবি। মানুষটিকে চিনতাম না, কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে মায়ের কান্নায় মনে হচ্ছিলো, আমাদের কাছের কোনো মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যে মানুষটিকে মেরে ফেলা হয়েছে।

আরো একটু বড় হয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে চিনেছি। তিনি কেনো বঙ্গবন্ধু সেটা বুঝেছি, কিভাবে তিনি জাতির জনক সেটা উপলব্ধি করেছি। কিন্তু সপরিবার তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখতে এতোগুলো বছর চলে গেলো যে ততোদিনে আমি লেখাপড়া শেষ করে পুরোদস্তুর সাংবাদিক। সেদিনের ছয় বছরের এই আমি রিপোর্টার হিসেবে জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলংকজনক ঘটনার বিচার কাভার করার মতো বয়সী।

নাজিমউদ্দিন রোডে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে বিশেষ এজলাসে এক বছরের মতো সময় ধরে চলে ওই বিচার। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল। রায়টি এখন ঐতিহাসিক এক দলিল। যেহেতু বিশাল রায়, বিচারক তাই এজলাসে পুরো রায় না পড়ে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড আর চারজনকে বেকসুর খালাস দেয়ার মূল আদেশটি পড়ে শুনিয়েছিলেন। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণও পাঠ করেছিলেন বিচারক। এজলাসে বসে ১৬ বছর আগে শোনা ওই পর্যবেক্ষণগুলো এখনো কানে বাজে।

ডেথ রেফারেন্সের পেপার বুকের দলিল ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, রায়ের একেবারে শেষদিকে এসে বিচারক কাজী গোলাম রসুল লিখেছেন: “প্রাসঙ্গিকভাবে ইহা উল্লেখ না করিয়া পারা যায় না যে, এই মামলায় প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ইহা প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ বিশেষ করিয়া যাহারা ঢাকায় অবস্থান করিতেছিলেন, তাহারা তাহাদের দায়িত্ব পালন করেন নাই, এমনকি পালনের কোন পদক্ষেপও গ্রহণ করেন নাই, যথেষ্ট সময় পাওয়া সত্বেও। ইহা অত্যন্ত দু:খের বিষয় যে, বঙ্গবন্ধুর টেলিফোন আদেশ পাওয়ার পরও তাহার নিরাপত্তার জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নাই। সাক্ষ্য প্রমাণে ইহা পরিষ্কার যে, মাত্র দুইটি রেজিমেন্টের খুবই অল্প সংখ্যক জুনিয়র সেনা অফিসার/সদস্য এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেন এই কতিপয় সেনা সদস্যকে নিয়ন্ত্রণ/নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে নাই তাহা বোধগম্য নয়। ইহা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সেনাবাহিনীর জন্য একটি চিরস্থায়ী কলংক হিসাবে চিহ্নিত হইয়া থাকিবে।”

খুনি কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হলেও, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্যের লাইনে লাইনে ফুটে উঠেছে প্রাতিষ্ঠানিক সেই ব্যর্থতার কথা।

উচ্চবাচ্যহীন সেনাপ্রধান
সেসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) শফিউল্লাহর সাক্ষ্যেও তার ব্যর্থতা এবং অসহায়ত্বের কথা স্পষ্ট। প্রসিকিউশনের ৪৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি জানাচ্ছেন, ১৫ আগস্ট তার বেটম্যান দরজা ধাক্কা দিলে বের হয়ে দেখেন ডিএমআই (ডিরেক্টর, মিলিট্যারি ইন্টেলিজেন্স) লে. কর্নেল সালাহউদ্দিন এসেছেন। সালাহউদ্দিন তাকে জিগগেশ করেন, ‘স্যার আপনি কি আরমার এবং আর্টিলারিকে শহরের দিকে যেতে বলেছেন?’ জবাবে শফিউল্লাহ ‘না’ বললে সালাহউদ্দিন জানান, ‘তারা তো রেডিও সেন্টার, গণভবন এবং ৩২ নম্বর রোডের দিকে যাচ্ছে।’

ডিএমআই’র কথা শুনে সেনাপ্রধান শংকিত বোধ করেন এবং জিগগেশ করেন, ‘ডাজ সাফায়েত (৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার) নো অ্যাবাউট ইট?’ কর্নেল সালাহউদ্দিন জানেন না জানালে শফিউল্লাহ তাকে বলেন, সাফায়েতের কাছে যাও এবং তিনটা পদাতিক ব্যাটালিয়নকে দিয়ে প্রতিহত করার জন্য আমার নির্দেশ সাফায়াতকে জানাও, আমি তাকে টেলিফোনে নির্দেশ দিতেছি।’

শফিউল্লাহর দাবি, তিনি পরে টেলিফোনেও সাফায়াতকে একইরকম নির্দেশ দেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে ফোনে না পেলেও একসময় বঙ্গবন্ধুই তাকে ফোনে পেয়ে বলেন, ‘শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে। কামালকে বোধহয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’ জবাবে শফিউল্লাহ তাকে বলেন, আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট অফ দ্যা হাউস?’
এর ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ তার বাসায় আসেন। তিনি তখন খালেদ মোশাররফকে ৪৬ ব্রিগেডে গিয়ে সাফায়েতকে সহায়তার নির্দেশ দেন। কারণ ‘তখনও পর্যন্ত তাহার পূর্বের দেওয়া নির্দেশের কোন তৎপরতা দেখিতে পাইতেছিলেন না।’ জেনারেল শফিউল্লাহ আদালতকে জানান, একপর্যায়ে ডেপুটি চিফ জিয়া বলেন, ‘ডু নট সেন্ড হিম। হি ইজ গোয়িং টু স্পয়েল ইট।’

সেনাপ্রধানের এভাবে কিছু করতে ব্যর্থতার মধ্যে অনুমান সকাল ৭টার দিকে রেডিও ঘোষণার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কথা শুনতে পান। একপর্যায়ে ডেপুটি চিফ জিয়া বলেন, ‘খালেদ মোশাররফকে আর বাহিরে যাইতে দিও না। তাহাকে বলো অপস অর্ডার তৈরি করতে, কারণ ইন্ডিয়ান আর্মি মাইট গেট ইন দিস প্রিটেক্সট।’

শফিউল্লাহ পরে ৪৬ ব্রিগেডে যেতে চাইলে, তার ভাষ্যমতে, মেজর ডালিম তার সৈন্য-সামন্ত ও অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত গাড়ি নিয়ে তার পেছনে পেছনে যায়। মেজর রশিদ এবং মেজর হাফিজ তাকে রেডিও সেন্টারে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। সেনাপ্রধানের সাক্ষ্য উদ্ধৃত করে রায়ে বলা হয়েছে, ‘ঐখানের পরিবেশ দেখে (সেনাপ্রধান) হতভম্ব হইয়া যান এবং তাহাদের চাপের মুখে বলেন যে, আমি একা যাইবো না, এয়ার এবং নেভাল চিফের সাথে কথা বলি।’

সেনাপ্রধানের প্রতিরোধ চেষ্টা ‌এভাবে সেখানেই শেষ হয়ে যায়। ‘কোন কাউন্টার অ্যাকশনে রক্তপাত ও সিভিল ওয়ার হইতে পারে এই ধরনের পরিস্থিতি ধারণা করিয়া মেজর রশিদ এবং মেজর ডালিমের অস্ত্রের মুখে তিনি রেডিও সেন্টারে যাইতে বাধ্য হন।’

পরের তিনদিন তিনি বঙ্গভবনে অবস্থান করতে ‘বাধ্য’ হলেও ১৮ আগস্ট ক্যান্টনমেন্টে ফিরে একটি কনফারেন্স ডাকেন। এতে এয়ার, নেভাল ও বিডিআর চিফ, আইজি, ডিজিএফআই, ব্রি. রউফ ডিএমএ, কর্নেল নূর উদ্দিন, ডিএসটি কর্নেল মালেকসহ সিনিয়র আর্মি অফিসাররা উপস্থিত ছিলেন। কনফারেন্সে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা যার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই। সেনাপ্রধান হিসেবে শফিউল্লাহকে বলা হয়, ‘এইসব উচ্ছৃঙ্খল অফিসারদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে।’

পরদিন ফরমেশন কমান্ডারদের যে বৈঠক ডাকা হয় তাতে খন্দকার মোস্তাকের নির্দেশে মেজর রশিদ ও মেজর ফারুকও যোগ দেয়। ‘কনারেন্সের উদ্দেশ্য এ ছিল শৃঙ্খলাভঙ্গকারী অফিসারদের সেনানিবাসে ফেরত আনা। ফেরত আনার উদ্দেশ্যে কৌশলগতভাবে (শফিউল্লাহ) বলেন যে, ইন্ডিয়া মাইট অ্যাটাক বাংলাদেশ। আমাদের এটা প্রতিহত করিতে হইবে। সেইহেতু রিগ্রুপিং এর দরকার আছে। একপর্যায়ে সাফায়েত জামিল, মেজর রশিদ এবং মেজর ফারুককে লক্ষ্য করিয়া বলিল, দে মাস্ট বি পুট টু কোর্ট মার্শাল। ইহাতে তাহাদের মুখ মলিন হইয়া যায়।’

ফারুক-রশিদের মুখ মলিন হয়ে গেলেও ব্যবস্থা কিন্তু কেউ নিতে পারেননি। বরং শফিউল্লাহর ‘মনে হইল কনফারেন্স ডাকার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। তখন কনফারেন্সের সমাপ্তি ঘোষণা করিয়া (শফিউল্লাহ) চলিয়া আসে এবং প্রতিক্রিয়া দেখিতে থাকে।’

এর কয়েকদিন পর ২৪ আগস্ট জেনারেল ওসমানীকে ডিফেন্স অ্যাডভাইজর করা হয়। সেনাপ্রধান হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ওসমানীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে শফিউল্লাহকে ওসমানী বলেন, ‘তুমি দেশের জন্য অনেক কিছু করিয়াছ, এখন তোমার সার্ভিস বিদেশে দরকার।’ শফিউল্লাহ তখন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ওসমানীসহ খন্দকার মোস্তাকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে ‘প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাকও তাহার (শফিউল্লাহর) অনেক প্রশংসা করিয়া বলেন, তোমার সার্ভিস এখন দেশের বাহিরে দরকার। তিনি বাহিরে যাইতে রাজি নন জানাইলে (মোস্তাক) বলেন, ডোন্ট থিংক অফ স্টেয়িং ইন দ্যা কান্ট্রি।’

রায়ে বলা হচ্ছে, শফিউল্লা ‘তখন উচ্চবাচ্য না করিয়া ক্যান্টনমেন্টে ফেরত আসেন। এখানে আসিয়া দেখেন জেনারেল জিয়া ইতিমধ্যে চিফ হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে অফিসারদের সাথে মিটিং করিতেছেন।’

রহস্যময় উপপ্রধান
৪৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জেনারেল শফিউল্লাহ আদালতকে জানান, ‘তাহার এবং জেনারেল জিয়াউর রহমানের একইরকম যোগ্যতা থাকা সত্বেও বাই নম্বরে জেনারেল জিয়াউর রহমান সিনিয়র ছিলেন। কিন্তু জেনারেল ওসমানীর পরে ১৯৭২ সনে জিয়াউর রহমানের স্থলে তাহাকে চিফ অব আর্মি স্টাফ করিলে তিনি (শফিউল্লাহ) উহার প্রতিবাদ করিয়া ততকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলে তিনি বলেন, তোমার কথা শুনিয়াছি। দেয়ার ইজ সামথিং কলড পলিটিক্যাল ডিসিশন। জবাবে তিনি (শফিউল্ল‍াহ) বলিয়াছেন, স্যার, ফ্রম টুডে অ্যান্ড অনওয়ার্ডস আই অ্যাম অ্যা ভিকটিম অব সারকামস্টেন্সেস। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন, তোমরা বড় বড় কথা বল, যাও কাল হইতে তুমি জেনারেল ওসমানীর নিকট হইতে দায়িত্ব বুঝিয়া নাও।’

শফিউল্লাহ অফিসে গিয়ে প্রথমে কুমিল্লায় জিয়াউর রহমানকে ফোন করেন। টেলিফোনে তার নিয়োগসহ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত জানান। কথা শোনার পর জিয়া বললেন, ‘ওকে শফিউল্লাহ গুড বাই।’

এর সপ্তাহখানেক পর একটা নতুন পদ ‘ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ’ সৃষ্টি করে ওই পদে জিয়াকে নিয়োগ দেয়া হয়। ‘এই পদ পাওয়ার পরেও তাহার মনে ক্ষোভ থাকিয়া যায়।’

কর্নেল তাহেরও মনে করতেন, জিয়ারই আর্মি চিফ হওয়া উচিত। তাহের একদিন শফিউল্লাহর অফিসে এসে বলেন, ‘স্যার, এতদিন তো চিফ অব আর্মি স্টাফ থাকলেন- এখন এই পদটা জিয়াউর রহমানের জন্য ছাড়িয়া দেন। তাহার নিকট হইতে এই অপ্রত্যাশিত কথাগুলি শুনিয়া তখনই (শফিউল্লাহ) তাহাকে বলে, ডু ইউ নো, ইউ আর ডাউন ক্যাটাগরাইজড? তুমি এখনই সিএমএইচে যাও এবং সসম্মানে মেডিক্যালি বোর্ড আউট হইয়া যাও। তা না হইলে তোমাকে চাকুরি হইতে বহিষ্কারে বাধ্য হব। বঙ্গবন্ধুকে এই বিষয়টি জ্ঞাত করিলে তিনিও ইহা সমর্থন করেন। অবশেষে কর্নেল তাহের মেডিক্যালি অবসর গ্রহণ করেন।’
শফিউল্লাহ আদালতকে জানান, তাহেরের অবসরে আর্মিতে কিছু প্রতিক্রিয়া এবং অপপ্রচার হয়। রক্ষী বাহিনী গঠন এবং রক্ষী বাহিনীকে কার্যকর করার জন্য গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হলে সামরিক বাহিনীতে অপপ্রচার এবং একটি অসন্তোষ দেখা যায়। পাশাপাশি ছিলো মেজর ডালিমের অবসরের ঘটনায় কিছু অপপ্রচার। ডালিমকে অব্যাহতি দেয়া হলে মেজর নূর সরকারের বিরুদ্ধে কিছু আক্রমণাত্মক মন্তব্য করে। এ কারণে তাকেও চাকুরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিলো। জেনারেল জিয়ার পি.এস ছিলো বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মেজর নূর। তাদের অবসরেও কিছু অপপ্রচার চলে, কারো কারো মধ্যে অসন্তোষও ছিলো।

সেনাবাহিনীতে এরকম অসন্তোষ এবং জিয়ার সেনাপ্রধান হতে না পারার ক্ষোভকে এক করে তাকে ব্যবহার করে মেজর রশিদ এবং মেজর ফারুক।

১৬৪ ধারায় ফারুকের জবানবন্দিটা এরকম: ঐ সময়ে লেডিস ক্লাবে মেজর ডালিমের স্ত্রীকে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলের সাথে অপ্রীতিকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের কতক অফিসার ও জওয়ানরা গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়ি তছনছ করে। তাতে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে মেজর ডালিম, মেজর নূর ও আরো কয়েকজনের চাকরি চলে যায়। ঐ সময় ততকালীন ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মাঝে মাঝে পরিবারসহ আমার বাসায় হেঁটে হেঁটেই চলে আসতেন। তিনি দেশের পরিস্থিতি আলোচনা করতেন। একসময় বলেছিলেন, তোমরা ট্যাংক-‍টুং ছাড়া দেশের আর খবরা-খবর রাখ কি? আমি বলি যে, দেখিতেছি তো দেশের অনেক উল্টাসিধা কাজ চলছে। আলাপের মাধ্যমে তিনি আমাকে ইনস্টিগেট করে বললেন, দেশ বাঁচানোর জন্য একটা কিছু করা দরকার। আমি বিষয়টিকে তখন গুরুত্ব দেই নাই। ১৯৭৫ সনের প্রথমদিকে বাকশাল গঠন করা হয়। জেলায় জেলায় গভর্নর নিযুক্ত প্রক্রিয়া চলছিল।’

ফারুকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এরপর আছে: এ নিয়ে মেজর রশিদের সাথে দেশের আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা হতে থাকলে সিদ্ধান্ত হয় যে, একমাত্র শেখ মুজিবকে ক্যান্টনমেন্টে এনে তাকে দিয়ে পরিবর্তন করা ছাড়া দেশে কোন পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। রশিদের বাসায় এসব আলোচনাকালে তার স্ত্রী জোবায়দা রশিদও (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় প্রথমে তাকে আসামী করা হলেও পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তি পান) উপস্থিত ছিলেন। এ ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের সাথে আলোচনা হয় এবং সাজেশন চাইলে তিনি বলেন, আমি কী করতে পারি, তোমরা করতে পারলে কিছু কর। পরে আমি রশিদের বাসায় গিয়ে মতামত তাকে জানাই। রশিদ তখন বলে, এই বিষয় নিয়া তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। এটা পলিটিক্যাল ব্যাপার। আমি ডিল করব। রশিদ পরে জিয়ার সঙ্গে এবং খন্দকার মোস্তাক আহম্মদের সাথে যোগাযোগ করে।’

মেজর রশিদের সঙ্গে জিয়ার আসলে কি কথা হয়েছিলে, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পলাতক রশিদ ছাড়া আর কারো জানা নেই। তবে মামলার ৪৪ নম্বর সাক্ষী কর্নেল সাফায়েত জামিল তার সাক্ষ্যে বলেছেন, ১৫ আগস্ট ভোরে জিয়ার বাসায় গিয়ে তিনি তাকে ‘সেভরত অবস্থায় পান। তাহার নিকট হইতে ঘটনা শোনার পর জেনারেল জিয়া বলিলেন, সো হোয়াট প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার, আপহোল্ড দ্যা কনস্টিটিউশন।’

কেউ যদি শুধু উপপ্রধানের বক্তব্যের প্রথম অংশ শোনেন যে ‘রাষ্ট্রপতি মৃত, তাতে কি হয়েছে’; তাতে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে এই হত্যাকাণ্ডকে তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন। কিন্তু পুরোটা শুনলে মনে হবে, সংবিধানকে উর্ধ্বে তুলে ধরে উপরাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা কথা বলছেন তিনি।

এখানে জিয়াকে সংবিধানের রক্ষক মনে করা হলেও পরে আর কোনো কার্যক্রমে তার প্রমাণ মেলেনি। তিনি নিজে সেনাপ্রধান হয়েও সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেননি। এর আগে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে সেনাপ্রধান শফিউল্লাহও তার কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাননি। বরং শফিউল্লাহ তার সাক্ষ্যে বলেছেন, ১৯ আগস্ট ফর্মেশন কমান্ডারদের কনফারেন্স শুরু হওয়ার আগে ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল সাফায়েত জামিল তার সঙ্গে ‘দেখা করিয়া বলে— ডু নট ট্রাস্ট ইওর ডেপুটি, হি ইজ বিহাইন্ড অল দোস থিংস।’

কিংকর্তব্যবিমূঢ় ব্রিগেড কমান্ডার
তবে কর্নেল শাফায়েতও ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান করে সেনাপ্রধান হওয়ার আগে খুব বড় কোনো কিছু করতে পারেননি। তাকে উদ্ধৃত করে বিচারক ‍তার রায়ে লিখেছেন, ১৫ই আগস্ট অনুমান সকাল ৬টায় তাহার (সাফায়েত) বাসভবনের দরজা প্রচণ্ড ধাক্কার আওয়াজ শুনিয়া দরজা খুলিয়া মেজর রশিদকে স্টেনগান কাঁধে দেখে তাহার সাথে নিরস্ত্র ব্রিগেড মেজর হাফিজ এবং আর্মি হেডকোয়ার্টারের অফিসার লে. কর্নেল আমিন আহম্মেদ চৌধুরী ছিলেন। তাহাকে (সাফায়েতকে) দেখামাত্র মেজর রশিদ বলেন, উই হ্যাভ ক্যাপচার্ড স্টেট পাও্য়ার আন্ডার খন্দকার মোস্তাক। শেখ ইজ কিলড। ডু নট ট্রাই টু টেক এনি অ্যাকশন এগেইনস্ট আস। তখন তিনি (সাফায়েত) হতচকিত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া যান। সেই মুহূর্তে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ টেলিফোনে জিজ্ঞাসা করেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কাহারা ফায়ার করিতেছে তাহা জানি কি না। জবাবে (সাফায়েত) বলিল, না। মেজর রশিদ হইতে প্রাপ্ত খবরে তাহাকে বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর জানান (সাফায়েত)।’

সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলে তিনি ৩ কমান্ডিং অফিসারকে ব্যাটালিয়ন প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। রাস্তায় জেনারেল জিয়ার বাসায় তার সঙ্গে কথা বলে ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে ঢোকার মুখে একটি ট্যাংক আক্রমণাত্মক অবস্থায় দেখতে পান। ট্যাংকের উপর মেজর ‍ফারুক বসা ছিল। মেজর ফারুক তার সাপ্লাই ও ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির সারিবদ্ধ গাড়িগুলির উপর হেভি মেশিনগান দিয়ে ফায়ার করে। ‘ফলে কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আরো বেশ কয়েকজন আহত হয়।’

কর্নেল সাফায়েত ১ম বেঙ্গল ইউনিটের লাইনের ভেতরের রাস্তার উপরে আরো তিনটি ট্যাংক আক্রমণাত্মক অবস্থায় দেখতে পান। তার দাবি, তাৎক্ষণিকভাবে ওই ট্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব ছিলো না।

৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল সাফায়েতকে উদ্ধৃত করে বিচারক এরপর লিখেছেন, ‘তিনি ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে যাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ইউনিফরম পরিহিত অবস্থায় ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে আসেন। তিনি চিফ অব আর্মি স্টাফের বরাত দিয়া ৪৬ ব্রিগেডের যাবতীয় অপারেশনাল কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করিবেন বলিয়া জানান।’

কিন্তু হত্যাকাণ্ড ঠেকানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতার মতো খুনি অফিসারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থায় নিতেও ব্যর্থ হয় ব্রিগেড।

৪২ নম্বর সাক্ষী মেজর জিয়াউদ্দিনকে উদ্ধৃত করে রায়ে বলা হয়েছে: ‘এইদিকে যেহেতু বঙ্গবন্ধু ইতিমধ্যে নিহত হইয়াছে তাই কোন পদক্ষেপ নিলে গৃহযুদ্ধ ও অযথা রক্তক্ষয় হইতে পারে তাই কোন পদক্ষেপে নেয়া সমীচীন নয় বলিয়া (সেনাসদরে) আলোচনা হয়। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ রক্ষী বাহিনীর ডাইরেক্টর হাসানকে রেডিও সেন্টারে নিয়া যাইবার জন্য তাহাকে (মেজর জিয়াকে) নির্দেশ দিলে তিনি উহা পালন করিয়া ডাইরেক্টর হাসানকে রেডিও সেন্টারে নিয়া ‍যান। (তখন) রক্ষী বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে রক্ষী বাহিনীর সদস্যদেরকে ব্যাটল ড্রেসে দেখিতে পান (মেজর জিয়া)।’

গোয়েন্দাদের অন্ত‍ঃহীন ঘুম
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মূলত: অংশ নেয় ১ম বেঙ্গল ল্যান্সার এবং ২ ফিল্ড আর্টিলারি। এর মধ্যে মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদ যে ২ ফিল্ড আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসার ছিলো তা ছিলো ৪৬ ব্রিগেডের অধীন। ঘটনার ৬/৭ মাস আগে ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারও ৪৬ ব্রিগেডের অধীন ছিলো, পরে তা রেজিমেন্ট হেডকোয়ার্টারের অধীনে নেয়া হয়। ল্যান্সার ইউনিটটির সি.ও লে. কর্ণেল মোমিন ছুটিতে থাকায় ১৫ আগস্ট ভারপ্রাপ্ত সি.ও ছিলো টু-আইসি মেজর ফারুক।

বিস্ময়করভাবে জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের আগে ৪৬ ব্রিগেড থেকে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু তারপরও ১ম বেঙ্গল ল্যান্সার এবং ২ ফিল্ড আর্টিলারির কথিত যে যৌথ নাইট প্যারেড থেকে অপারেশনের শুরু সেখানে আসলে কি হচ্ছে তা ৪৬ ব্রিগেড এবং সেনাসদরের অজানা থাকার কথা ছিলো না।
এমনকি যে দু’ ইউনিটের নাইট প্যারেড ছিলো না ‍তাদেরও কেনো মেজর রশিদ যোগ দিতে বলছে সেটা জেনেও ব্রিগেড কমান্ডার বা সিজিএস কোনো ব্যবস্থা নেননি।

প্রসিকিউশনের ৪১ নম্বর সাক্ষী ব্রিগেডিয়ার (সাক্ষ্য দেয়ার সময়) এ কে এম শাহজাহানের সাক্ষ্যেই ‍তা স্পষ্ট। ঘটনার সময় ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের টু-আইসি ছিলেন তিনি। কমান্ডিং অফিসার চৌধুরী খালেকুজ্জামান ছুটিতে থাকায় তিনি ভারপ্রাপ্ত সি.ও ছিলেন। তাদের অবস্থান ছিলো জয়দেবপুরে। ১৪ আগস্ট তাদের রেজিমেন্টের অ্যামবুশ ডেমোনেস্ট্রেশন ছিলো। ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার সাফায়েত জামিল, ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং সিজিএস খালেদ মোশাররফ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে অ্যামবুশ ডেমোনেস্ট্রেশন শেষ হয়।

‘তখন ২ ফিল্ড আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসার মেজর রশিদ তাহার কাছে আসিয়া তাহার ট্রুপস নিয়া রাত্রে নিউ এয়ারপোর্টে যাইবার জন্য বলেন। ঐদিন রাত্রের রোড মার্চের অনুমতি ছিল না বলিয়া তিনি অপারগতা জানান। তারপরও পীড়াপীড়ি করিতে থাকিলে তিনি ব্রিগেড কমান্ডার সাফায়েত জামিল ও সিজিএস খালেদ মোশাররফকে জানাইলে তাহারা ঐ রোড মার্চে যাইতে নিষেধ করেন। বেলা ৩টার দিকে মেজর রশিদ তাহার অফিসে গিয়া বলেন, দোস্ত ইউ হ্যাভ ইসনালটেড মি। তোমাকে একটা রিকোয়েস্ট করলাম, তুমি তো রাখলেই না, বরং সিনিয়রদের বলিয়া দিলে।’

তারপরও রশিদ চেষ্টা চালিয়ে যায়। এ কে এম শাহজাহান বারবারই অস্বীকৃতি জানালে চা পান না করেই চলে যায় রশিদ। কিন্তু মাগরিবের আগে মেজর রশিদ আবার তার বাসায় ফোন করে ট্রুপস নিয়ে নিউ এয়ারপোর্ট যাওয়ার অনুরোধ জানান। আবারও অপারগতা জানান শাহজাহান। কিছুক্ষণ পর সাফায়েত জামিল অ্যামবুশ ডেমোনেস্ট্রেশন শেষ করে ফোর্স গাজীপুর থেকে ইউনিটে ফেরত এসেছে কি না টেলিফোনে জানতে চান। তিন ভাগের এক ভাগ এসেছে
জানিয়ে শাহজাহান বলেন, মেটেরিয়েলস নিয়ে সবার ফিরতে আরো একদিন লাগবে। টু-আইসি শাহজাহান তখন আবারো রশিদের অনুরোধের কথা জানান। জবাবে সাফায়েত জামিল বলেন, ‘ইউ ডোন্ট কাম, ইউ ডু ট্রেনিং অ্যাজ প্রোগ্রাম। আজ রাত ১০টা পর্যন্ত ডিসম্যান্টল করবে, বাকিটা আগামীকাল করবে।’

ইতিহাস সাক্ষী, সাফায়েত জামিলরা যখন শুধু এরকম নির্দেশনা দিচ্ছেন তথন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য ক্যামোফ্লেজ হিসেবে কথিত নাইট প্যারেডের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফারুকের বেঙ্গল ল্যান্সার এবং রশিদের আর্টিলারি ইউনিট। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অবশ্য তখন এরকম নাইট প্যারেডের চর্চা ছিলো।

কিন্তু নাইট প্যারেডের নামে যে বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি চলছে, অস্ত্রাগার খুলে দেয়া হয়েছে, মেজর ফারুক রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে– সেটা বোঝার জন্য সেখানে কোনো গোয়েন্দা কার্যক্রম ছিলো না।
এমনকি চাকুরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তারা যে বিকেল থেকেই ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করছে, তার সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের এবং গোয়েন্দা বিশ্লেষণ; কোনোটাই ছিলো না।

তখনকার ঢাকার স্টেশন কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল হামিদ। ৯ নম্বর সাক্ষী হিসেবে আদালতকে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সনের ১৪ আগস্ট বিকেলে টেনিস খেলার সময় লক্ষ্য করেন যে, চাকুরিচ্যুত মেজর ডালিম ও মেজর নূর টেনিস কোর্টের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। এটা তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। খেলা শেষে তিনি মেজর নূরকে জিগগেশ করেন, ‘তোমরা কার অনুমতি নিয়ে এখানে খেলিতে আস? নূর জানাইল, তাহারা জেনারেল জিয়ার অনুমতি নিয়া এখানে খেলিতে আসে।’

কর্নেল হামিদের কাছে ওই বিকেলে মেজর ডালিমের উপস্থিতি শুধু অস্বাভাবিক ছিলো। পরদিন সকালে বেতারে ডলিমের কণ্ঠ ছিলো পিলে চমকানোর।

তবে উপযুক্ত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক থাকলে সিনিয়র অফিসারদের হয়তো এরকম শোকের খবর শুনতে হতো না। আগের সন্ধ্যা থেকে ফারুক-রশিদরা সবকিছু প্রায় প্রকাশ্যেই করেছে। তাদের সেসব কার্যক্রমের রিপোর্ট করার মতো কেউ ছিলো না। নাকি জেনেও না জানার, দেখেও না দেখার আর শুনেও না শোনার অভিনয় আছে এর মধ্যে?

প্রসিকিউশনের ১২ নম্বর সাক্ষী ল্যান্সারের এল.ডি সিরাজ জানিয়েছেন, তাদের নাইট প্যারেডে মেজর ডালিম, ক্যাপ্টেন হুদা এবং আরেকজন অফিসারকে পরিচয় করিয়ে দেয় মেজর ফারুক। প্রকাশ্য ব্রিফিংয়েই মেজর ফারুক বলে, ‘আগামীকল্য ১৫ই আগস্ট ইউনিভার্সিটিতে মিটিং হইবে। সেই মিটিংয়ে রাজতন্ত্র ঘোষণা করা হইবে। শেখ মুজিব রাজতন্ত্র ঘোষণা করিবেন। আমরা রাজতন্ত্র সমর্থন করি না। এখন আমি যাহা বলিব এবং আমার অফিসারগণ যাহা বলিবে তাহা তোমরা শুনিবে।’

২৪ নম্বর সাক্ষী আর্টিলারির হাবিলদার আমিনুর রহমানের সাক্ষ্য অনুযায়ী, মেজর রশিদ এবং মেজর ডালিম তাদের ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করলাম। বর্তমান সরকার আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করতে পারতেছে না। জনগণ না খাইয়া মরতেছে- এই সরকারতে উৎখাত করতে হবে।’

এ দু’জন ছাড়াও ল্যান্সার এবং আর্টিলারির অন্য সদস্যরা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাতে মোটা দাগে বলা যায়:

১. নাইট প্যারেডের নামে ফারুকের ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের সদস্যরা রাতে নিউ এয়ারপোর্টে এক হয়।
২. তাদের সঙ্গে পরে যোগ দেয় রশিদের ২ ফিল্ড আর্টিলারি।
৩. সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারাও নাইট প্যারেডে যোগ দেয়।
৪. রশিদ এবং ফারুক সেনা সদস্যদের সামনে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতা করেন।
৫. ট্যাংকের গোলা তো ছিলোই না, নিয়ম অনুযায়ী ছোট কোনো অস্ত্রের গুলিও তাদের ছিলো না।
৬. রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে কর্নেল রশিদ এবং অন্যরা অস্ত্রাগার খুলে অস্ত্র এবং গোলা-বারুদ নিয়ে যায়।
৭. বালুরঘাট থেকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর এবং বাইরে দিয়ে খুনিরা বঙ্গবন্ধু ভবন, সেরনিয়াবাতের বাসভবন, রেডিও সেন্টারে এবং শেখ মণির বাড়িতে পৌঁছায়।
৮. সারারাত ধরেই খুনের এ প্রস্তুতি চলতে থাকে।
৯. খুনিদের প্রথম দলটি বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছায় ভোর ৪টায়। এক ঘণ্টা ধরে তারা কামানসহ নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে।
কিন্তু মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স সেনাপ্রধানকে যখন খবর জানাতে পেরেছে, ৩২ নম্বরে তখন নারকীয় হামলা শুরু হয়ে গেছে।

সেসময়ের ডিজিএফআই প্রধান ব্রিগেডিয়ার রউফ ঘটনার কিছুদিন আগে মেজর ডালিম এবং মেজর নূরসহ কিছু অফিসারের সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু ১৪ আগস্ট রাত থেকে ফারুক-রশিদের এতো তৎপরতা, অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং ট্যাংকসহ ‍দুটি ইউনিটের রাষ্ট্রপতির বাসভবনের দিকে যাওয়া, ঘণ্টাখানেক সময় ধরে রাষ্ট্রপতির বাসভবন ঘিরে অবস্থান নেয়া; এসবের কিছুই তারা জানতে পারেনি।

তখন তাদের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় মেজর জিয়াউদ্দিনের সাক্ষ্যে। ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

ভোর সাড়ে ৫টায় গুলশানে ডিজিএফআই’র ‍অফিসার্স মেস থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হন। পথে মহাখালিতে রাস্তার আইল্যান্ডের উপর একটি ট্যাংক এবং রাস্তার পাশে খাদে আরেকটি ট্যাংক দেখতে পান। বর্তমান জাদুঘরের কাছে আসলে ডিজিএফআই’র একজন সৈনিক এসে রেডিওতে মেজর ডালিমের ঘোষণার কথা জানান। মেজর জিয়াকেও পাশের চায়ের দোকানে নিয়ে রেডিওর সেই ঘোষণা শোনান তিনি। এর মানে হলো রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায়

থাকা ডিজিএফআই ইউনিট রাষ্ট্রপতির নিহত হওয়ার খবর প্রথম জানতে পারে রেডিও থেকে।

বেনিফিট অব ডাউটে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্ব
জাতির জনক হত্যাকাণ্ড ঠেকানো এবং পরে খুনিদের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ব্যর্থতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের দিকটিও রায়ে তুলে ধরেছিলেন বিচারপতি কাজী গোলাম রসুল।

ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে বেনিফিট অব ডাউট দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন: ‘উপরোক্ত সকল সাক্ষ্য প্রমাণ পর্যালোচনায় ১৫-৮-৭৫ তারিখ বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে আসামি তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের লিপ্ত থাকা সম্পর্কে স্পষ্ট প্রমাণ বা সম্মতি নাই। কিন্তু ঘটনার পরপরই রেডিও স্টেশনে গমনসহ ক্ষমতাসীনদের সাথে তাহার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হইল, এই বিজড়নের কারণে তাহাকে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলা যায় কি না? এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাহা এই যে, অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার পূর্বে ও পরে নেতার অনুসারীগণের ব্যবহারের অনেক পার্থক্য। ইহা কিছুটা বোধগম্য, আমাদের দেশের নেতাভিত্তিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে যেমন- নেতা আছেন তো সব আছে, আমিও আছি, নেতা নাই তো কেউ নাই, আমিও নাই। জনাব ঠাকুরের মতো বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠজনেরাও পরে মোস্তাক মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন।

তবে পেশাগত কিংবা অন্য যে আনুগত্যই হোক, ১৫ আগস্টের ভয়াল সেই ভোরে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষায় একজনই এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি শহীদ ব্রিগেডিয়ার জামিল।

লেখক: জাহিদ নেওয়াজ খান, বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল আই।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2024