মফিজুল সাদিক: বাংলাদেশে প্রতিবছর যাতে করে খাদ্যভান্ডারে অতিরিক্ত ৪০ হাজার ১৩০ মেট্রিক টন খাদ্য যোগ হয় এবং সুগন্ধি ও চিকন চাল রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায় সেই উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা বিভাগের ৩৫টি উপজেলায় সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ-ভূ-উপরিস্থ পানির যথাযথ ব্যবহার করে ১৬ হাজার ৫২ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। সেচ সুবিধা সম্প্রসারণপূর্বক প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার ১৩০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হবে। এবং অঞ্চল ভিত্তিক খাদ্যশস্যের বহুমুখিকরণ করার পাশাপাশি প্রকল্প এলাকার জনগণের মধ্যে আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণ করা হবে।এছাড়া সারাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন(বিএডিসি)। প্রকল্পটি জুলাই, ২০১৪ থেকে জুন ২০১৯ সাল নাগাদ বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পে সরকারি খাত থেকে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। সুগন্ধি চাল রফতানি ও খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বাংলানিউজকে জানান, প্রকল্পটির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা অতিরিক্ত ৪০ হাজার ১০৩ মেট্রিক টন খাদ্য খাদ্যভান্ডারে যোগ করতে পারবো। এছাড়া প্রতিবছর দেশের খাদ্য নিরাপত্ত্বা নিশ্চিত করে বিদেশে সুগন্ধি ও চিকন চাল রফতানি করবো।’
তিনি আরো জানান, প্রকল্পের আওতায়, ঢাকা বিভাগের তিন জেলার ৩৫টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। এতে করে ১৬ হাজার ৫২ হেক্টর জমি উন্নত সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এতে করে একদিকে শক্তিশালি হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অপরদিকে সুগন্ধি ও চিকন চাল রফতানি করতে পারবো। ময়মনসিংহ জেলার ১২টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। উপজেলাগুলো হলো, ময়মনসিংহ সদর, ভালুকা, গফরগাঁও, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়ীয়া, হালুয়াঘাট, ত্রিশাল, ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল, ফুলপুর, ধোবাউড়া, ও গৌরীপুর।
নেত্রকোণা জেলার নেত্রকোণা সদর, দূর্গাপুর, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া, আটপাড়া, পূর্বধলা, বারহাট্টা, খালিয়াজুরি ও মদনসহ ১০টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ণ করা হবে। এছাড়া কিশোরগঞ্জ জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। উপজেলাগুলো হলো, কিশোরগঞ্জ সদর, করিমগঞ্জ, কটিয়াদি, ইটনা, মিঠামইন, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, অষ্টগ্রাম, হোসেনপুর, তাড়াইল, পাকুন্দিয়া, ভৈরব ও নিকলী।
৫ বছরে প্রকল্পটি ঢাকা বিভাগের ৩টি জেলার ৩৫ উপজেলায় বিএডিসি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত করলে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য আমাদের খাদ্যভান্ডারে যোগ হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ-নেত্রকোণা-কিশোরগঞ্জ জেলাসমূহ অসংখ্যা নদী এবং বিস্তীর্ণ হাওরসমৃদ্ধ। হাওর ও নদীবেষ্টিত এ তিনটি জেলা ভূ-উপরিস্থ পানিসমৃদ্ধ থাকায় এ এলাকার জন্য উপযোগী সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সেচ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব। এবং অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য প্রতিবছর খাদ্য ভান্ডারে যোগ করা যাবে।
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রকল্প এলাকায় ১৩০ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এছাড়া ২৭০টি হাইড্রলিক স্ট্রাকচার নির্মাণ করা হবে। অন্যানন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে ২০টি স্লুইস গেট, বক্স, পাইপ কালভার্ট ও রেগুলেটর ৫০টি ও ইউ-কালভার্ট ৫০টি।
অপরদিকে ২০ সেট ১২ দশমিক ৫ কিউসেক বিদ্যুতচালিত লো লিফট ভাসমান পাম্পসেট ক্রয় ও স্থাপন করা হবে। ৫ সেট ২৫ কিউসেক বিদ্যুতচালিত লো লিফট ভাসমান পাম্প সেট ক্রয় ও স্থাপন করা হবে। ১০০ সেট ৫ কিউসেক বিদ্যুতচালিত লো লিফট ভাসমান পাম্প সেট ক্রয় ও স্থাপন করা হবে। এছাড়া ১০৫ সেট ২ কিউসেক বিদ্যুত চালিত গভীর নলকূপ ক্রয় ও স্থাপন করারও পরিকল্পনা রয়েছে। ৩০ সেট ১ কিউসেক বিদ্যুত চালিত গভীর নলকূপ ক্রয় ও স্থাপন ও ২ কিউসেক বিদ্যুতচালিত গভীর নলকূপের জন্য স্মার্ট কার্ড প্রিপেইড মিটার থাকছে প্রকল্প এলাকায়। প্রকল্পের আওতায় ২৩৫টি সেচ নালা নির্মাণ করা হবে।
অপরদিকে ২ কিউসেক বিদ্যুতচালিত ৭৪টি গভীর নলকূপের ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা বর্ধিতকরণ করা হবে। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় সেচ সুবিধার জন্য ১৩ হাজার ৬০০ মিটার রাবার ও কটন হোস পাইপ কেনা হবে। গভীর নলকূপের জন্য ২৬০টি বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় এই মহাযজ্ঞ বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশে বাৎসরিক খাদ্যভান্ডার আরো সমৃদ্ধ করতেই সরকারের এই উদ্যোগ। এর পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় ২৫টি,২৫ কিউসেক বিদ্যুতচালিত এলএলপি’র জন্য ডিসচার্জ বক্স নির্মাণ করা হবে। এই বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনাসূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ৬৫টি ২-কিউসেক গভীর নলকূপে স্মার্ট কার্ড বেইজড প্রি-পেইড মিটার স্থাপন বাবদ ১ কোটি ১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অফিস অবকাঠামো মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিদর্শনকক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ১ কোটি ২০ হাজার টাকা সংস্থান রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরণের হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার নির্মাণ, খাল খনন ইত্যাদি কাজে ৩০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৭০টি বিভিন্ন ধরনের হাইড্রলিক স্ট্রাকচার, স্লুইস গেইট, রেগুলেটর, বক্স কালভার্ট, ফুট ব্রীজ, পাইপ কালভার্ট নির্মাণ বাবদ ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২৫০টি বৈদ্যুতিক লাইন বাবদ ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ৬৫টি ২-কিউসেক গভীর নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে অতিরিক্ত ৪০টি ২-কিউসেক পুরাতন গভীর নলকূপ উত্তোলনপূর্বক পুনর্খনন করা হবে।
অন্যদিকে বিএডিসি কর্তৃক ইতিপূর্ব স্থাপিত ৬০টি গভীর নলকূপের পাম্প হাউজ এবং পাম্প মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৩০ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা সূত্রে জানা গেছে, বিএডিসি প্রকল্পের বছরওয়ারী আর্থিক বিভাজন অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ৩৪ কোটি ৫৯ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে।