
নিউজ ডেস্ক: বিএনপির আগাম নির্বাচনের দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে এই মুহুর্তে আলোচনার প্রয়োজনও নেই বলে মনে করছেন দলের নেতারা। বরং আগাম নির্বাচনের দাবি নিয়ে দেশে কোনো ধরণের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করার জন্যই প্রস্তুত সরকারি এই দল।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বাংলানিউজকে তাদের এ ধরনের মনোভাবের কথা জানান। তাদের স্পষ্ট মত, সংবিধান অনুযায়ী গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের নির্ধারিত মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ করার পরই নির্বাচন হবে।
এই অবস্থান নিয়েই সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অগ্রসর হচ্ছে। আর এই অবস্থানে তারা অনড় থাকবেন বলেই নেতারা জানান।
এদিকে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য বিএনপি তথা এর নেতৃত্বাধীন জোট আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে সরকারের উপর চাপ তৈরি করতে কুটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে এমন খবর রয়েছে।
কিন্তু এই তৎপরতাকেও একেবারেই পাত্তা দিচ্ছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিএনপির এই তৎপরতা নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। তাদের যে কোনো তৎপরতা মোকাবেলায় সরকার ও দল বিভিন্ন কৌশল নিয়ে অগ্রসর হবে বলে আওয়ামী লীগের নেতারা জানান।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বাংলানিউজকে বলেন, প্রাথমিকভাবে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে রাজনৈতিক চালে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। পরে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে বিএনপি যে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছিলো তাও ব্যর্থ। পরে আন্তর্জাতিকভাবে কিছু ‘কূটচাল’ চালানোর চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি-জামায়াত জোট।
তিনি বলেন, এখন নতুন নির্বাচনের দাবি করে লাভ নেই। সংবিধান অনুযায়ী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হয়েছে। সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর, এর পরেই আসবে নির্বাচনের প্রশ্ন। এ নিয়ে আলোচনারও প্রয়োজন নেই। আওয়ামী লীগ এ নিয়ে ভাবছে না।
মেয়াদ শেষে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে প্রয়োজন হলে সকল দলের সঙ্গেই আলোচনা করা হবে, বলেন মাহবুবুল আলম হানিফ।
এদিকে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর পরই প্রভাবশালী দেশগুলোসহ বিভিন্ন দেশের সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন জানানো হয়েছে।

গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুক্তরাজ্য সফরের সময় সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বাংলাদেশের নির্বাচনকে অতীত বলে মন্তব্য করে ভবিষ্যতে দিকে এগিয়ে যাওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে চায় এবং ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে এক যোগে কাজ করে যাওয়ার কথা জনিয়েছেন ক্যামেরন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের আগ্রহও ব্যক্ত করেছেন, যা এই সরকারের জন্য ইতিবাচক।
এ নিয়ে বাংলানিউজের কথা হয় আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান সফরের সময় সে সব দেশের সরকার প্রধানরা সম্পর্ক আরও জোরদারের কথা বলেছেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের নতুন বিজেপি সরকারের অবস্থানও সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে গত জুনেই স্পষ্ট হয়েছে, বলেন তিনি।
সুষমা স্বরাজের সফরের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার সঙ্গে দেখা করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে সুবিধা করতে পারেননি, বলেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা।
সেবার সুষমা স্বরাজ স্পষ্ট জানিয়ে দেন বিষয়টি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশের জনগণ। বাংলাদেশে যে সরকারই থাক তারা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার উপর গুরুত্ব দেবেন।
বিএনপির বর্জনের মধ্যেও সংবিধান অনুযায়ী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় এতে পূর্ণ সমর্থন দেয় ভারত। তখন সেখানে ক্ষমতায় ছিলো কংগ্রেস। ওই দলটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু গত মে’তে ভারতের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিজেপি দেশটির সরকার গঠন করে। তখন বিএনপি বলয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাসও লক্ষ্য করা যায়।
কংগ্রেসের পরাজয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বেকায়দায় পড়বে বলে তাদের ধারণা ছিলো। বিএনপির নেতারাও প্রকাশ্যে বিভিন্ন কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সফরের মধ্য দিয়ে তাদের সেই উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ে।
ওই সফরে সুসমা স্বরাজ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারসহ বহুল আলোচিত তিস্তার পানি বন্টন ও সীমান্ত চুক্তিসহ অমিমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে ইতিবাচক সাড়া দেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সময় এই সমস্যাগুলো সমাধানে বিজেপি সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রের খবর।
এ বিষয়গুলো সরকারের জন্য ইতিবাচক বলেই আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন। আর এ কারণেই বিএনপির সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও সরকারি দলটি গুরুত্ব দিচ্ছে না। আলোচনার প্রসঙ্গেও রয়েছে অমত। যুক্তরাজ্য সফর শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই আলোচনার কথা নাকচ করে দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে ফারুক খান বাংলানিউজকে বলেন, অতীতে ভারতে যে সরকারই ছিলো আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক সব সময়ই ভাল ছিলো। বর্তমান বিজেপি সরকারের সঙ্গে সেই সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে এবং আরও উন্নত হবে।
আসলে আমার তো বিশ্ব শান্তির পক্ষে পথ দেখিয়েছি। বিএনপি যেটা মনে করছে বিদেশিরা তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। এটা তাদের স্বপ্ন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন পুরণ হবে না, বলেন ফারুক খান।

এদিকে দায়িত্বশীল একটি সুত্র জানায়, বিএনপি নির্বাচনের জন্য কুটনৈতিক সৃষ্টির তৎপরতা চালালে সরকারও বসে থাকবে না। জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে ওই নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে সহিংস ঘটনা ঘটে তার চিত্র আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরবে সরকার।
ইতোমধ্যে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতা তুলে ধরে একটি ফটো অ্যালবাম প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ। এতে হত্যা, নির্যাতন, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া ও ভাঙচুরের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২৩ আগস্ট এই ফটো অ্যালবামের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের কাছেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সময়ের সংহিসতার চিত্র তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতাগুলোও তুলে ধরা হবে বলে ওই সুত্রটি জানায়।
এদিকে, সরকারের বিরু্দ্ধে আন্দোলনের কথা বললেও বিএনপি তেমন একটা সুবিধা করতে পারবে না বলে আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে আন্দোলনের হুমকি দেয়ার পর বিএনপি যে দুইটি কর্মসূচি পালন করেছে তাতে দলের কর্মীদের মধ্যেও তেমন একটা সাড়া পায়নি বলে আওয়ামী লীগের নেতারা মন্তব্য করেন।
তবে বিএনপির যে কোনো আন্দোলনের ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে সরকার তথা আওয়ামী লীগও। গত নির্বাচনের আগে আন্দোলনের নামে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো সেই ধরনের পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর নির্দেশ রয়েছে বলেও জানান নেতারা।
এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভাকেট কামরুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, কোনো দল গণতান্ত্রিকভাবে কর্মসূচি পালন করতে পারে। সেটা তাদের অধিকার রয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের নামে, কর্মসূচির নামে যদি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে, সন্ত্রাস করে তবে প্রশাসন আছে তারা কঠোর ব্যবস্থা নেবে। আর আওয়ামী লীগও তা প্রতিহত করবে।