সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৯

হরতাল-অবরোধের রাজনীতি দেশবাসীর জন্য ভোগান্তি

হরতাল-অবরোধের রাজনীতি দেশবাসীর জন্য ভোগান্তি

আমাদের দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলনের প্রধানতম সহায়ক হচ্ছে হরতাল ও অবরোধ। আর তা কার্যকর করা হয় বিভিন্ন রকমের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের মাধ্যমে। তাতে করে খেটে-খাওয়া মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না। এটা একটা কঠিন বাস্তবতা।

অধিকন্তু ওরকম কর্মকান্ডে যোগাযোগ ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়ে, যত্রতত্র নির্বিচার ভাঙচুরে কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়, বোমার আঘাতে প্রাণহানি ঘটে প্রতিনিয়ত। আগুনে পুড়ে পঙ্গু হয়ে যায় অনেক মানুষ। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ব্যাহত হয় আমদানি রফতানি। সব মিলিয়ে একটা বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রতিদিনের হরতাল-অবরোধ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় শতশত কোটি টাকা। পরিণামে দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। বর্তমানে তো বটেই, ভবিষ্যতেও দেশ ও জাতিকে এসব উচ্ছৃঙ্খল কর্মকান্ডের জন্যে উচ্চমূল্য দিতে হবে।

What is inevitable can seldom be prevented. বলা হয় Truth is always bitter. অর্থাৎ সত্য সবসময় তিক্ত। তিরিশ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। আমাদের অবিস্মরণীয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিলো এমন এক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যেখানে দুর্নীতি, ক্ষমতালিপ্সা, স্বৈরাচারি শাসনব্যবস্থা থাকবে না। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই সে চেতনার মৃত্যু হয়। একের পর এক অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জাতির কাঁধে চেপে বসে। বিরোধিতার পথে বিছিয়ে দেয়া হয় বিষাক্ত কাঁটা।

বস্তুত: সে কারণেই গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে স্থান পেতে থাকে অগণতান্ত্রিক পন্থা। রাজনীতির নামে দেশে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ তারই অবধারিত পরিণাম। এ বিষয়টি আগে না বুঝলেও এখন ঠেকে হলেও বুঝতে হবে। বুঝতে না চাওয়ার খেসারত না দিয়ে গত্যন্তর থাকে না। It is a must. গণতন্ত্রকে গণতান্ত্রিক পথে চলতে দিতে হবে। আইয়ুব ইয়াহিয়ারা সে পথে না হেঁটে বিকল্প পথে চলে নিজেদের ও দেশের, দেশবাসীর সর্বনাশ ডেকে আনে। একাত্তর পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশেও ওরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা চলে। কিন্তু ওপরে যে উল্লেখ করা হলো

What is inevitable can seldom be prevented- শেষ পর্যন্ত তাই হয় বারবার। মনে হচ্ছে, একই পথে চলার কারণে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে অভিন্ন এক ভবিষ্যৎ। দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে তা অনস্বীকার্য। যদিও সরকারি ভাষ্য হলো, জনগণ বিশ দলীয় জোটের হরতাল-অবরোধে সাড়া দেয়নি। যদি তাই হয় তবে জনগণ ছাড়া অন্য কোনো মহল দেশব্যাপী আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে সেটাই মেনে নিতে হয়। সে রকম অবস্থায় ধরে নিতে হয় যে, এই মহলটি অত্যন্ত শক্তিশালী বা প্রভাবশালী। যাদের শায়েস্তা করতে দেশের সব প্রধান প্রধান এলাকায় সীমান্তরক্ষী, র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

উল্লেখিত পরিস্থিতিতে আমার প্রশ্ন, সরকার পরিস্থিতির ওরকম অবনতি হতে দিলো কেন? এদিকে অধিকাংশ বোদ্ধা লোকের ধারনা, দেশে গণতান্ত্রিক শাসন নেই বলেই অগণতান্ত্রিক শক্তি প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। বিরোধী দলগুলোর প্রতি সরকার ও সরকারি দলের অসহিষ্ণুতা, যাচ্ছে তাই আচার আচরণ, রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার বহির্ভূত ভাষায় ‘ধোলাই’ (সমালোচনা অর্থে) আমাদের দেশে গণতন্ত্রের গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

বলাবাহুল্য, উপর্যুক্ত কারণে আমাদের দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন বারবার সহিংসতার নামান্তর হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুসংস্কৃতি লাঠিপেটা ও গ্রেফতার হয়রানি হয়ে বাধার কবলে না পড়লে দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গত চার দশকে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠতো। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দল ও নেতা-কর্মিদের ‘জোর যার মুলুক তার’ মনোভাবের কারণে আমরা অর্থাৎ দেশবাসী অচলাবস্থার সঙ্কট থেকে বের হতে পারছি না।

বিশ দলের উদ্যোগে একমাস ধরে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর মনোভাব দেখাচ্ছে। এটা একটা রাজনৈতিক সঙ্কট বিধায় তা সমাধানে রাজনৈতিক পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার দমননীতির আশ্রয় নেয়ায় সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশ ও দশের স্বার্থে উভয় পক্ষকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথে এগোতে হবে। তা না করলে দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ হবে না। গত চার দশকে দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু না হওয়ার যে কারণ, তা এখনো পুরাপুরি বহাল রয়েছে। এটাতো ঠিক নয় যে, সরকারের সব পদক্ষেপ দেশোন্নয়নের সহায়ক। পক্ষান্তরে, বিরোধীদলের তৎপরতা দেশোদ্রোহিতার নামান্তর। ওরা দেশের শত্র“।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলমান থাকার প্রেক্ষাপটে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ‘যেকোনো মূল্যে’ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন-কানুনে রাষ্ট্রীয় জীবনে সম্ভাব্য যে পরিস্থিতিরই উদ্ভব হোক না কেন, তা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, তাও নির্দিষ্ট করে বলা আছে। বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজেও তা প্রযোজ্য। কোনো দেশের সংবিধান এটা বলেনি যে, দেশে এমন অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে, যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠি আইনের ঊর্ধ্বে ওঠার প্রয়োজন দেখা দেবে।

প্রধানমন্ত্রী সকল শ্রেণির মানুষের জান-মালের নিরাপত্তায় বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ও বিচলিত থাকবেন, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু ‘যেকোনো মূল্যে’ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সরকারপ্রধান হিসেবে পুলিশকে সেই ‘স্বাধীনতা’ দেয়ার সুযোগ প্রধানমন্ত্রির নেই। এ রকম কোনো সুযোগ প্রচলিত আইনে কারও জন্য রাখা হয়নি। এ ধরনের মনোভাবের সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মুখে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চারিত কিছু সংবেদনশীল ঘোষণার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তাও ভাবনার বিষয়। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, বিরোধী দলের চাপিয়ে দেয়া অবরোধের মধ্যে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং জনমনে ভোগান্তি ও ভয়ভীতি অব্যাহত রয়েছে। এই অবস্থা থেকে মানুষ রেহাই চায়। কিন্তু সেটি করতে হলে জনগণকে আস্থায় নিয়েই করতে হবে।

অতএব, সরকারকে বুঝতে হবে, সমস্যাটি রাজনৈতিক। তাই ‘যেকোনো মূল্যে’ পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা না করে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে আইনের শাসনের শর্ত পূরণ করুন। ভাবুন রাজনৈতিক সমাধানের কথাও। রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এ-জাতীয় সময়ে অধিক তৎপর থাকতে হয়। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে যারা আছে, তাদের সামনে দেখা দেয় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ।

সংকটটি রাজনীতিসৃষ্ট হলেও আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থায় প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। সুতরাং জনগণের যানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা রয়েছে, তাদের অধিকতর তৎপর হতে হয়। রাষ্ট্রের আইন এ দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করেছে। তা যথার্থভাবে পালন করা তাদের কর্তব্য। দাবি যেটাই হোক, গাড়িতে পেট্রলবোমা মেরে কিংবা অন্য কোনোভাবে কেউ কাউকে হতাহত করতে পারে না। সৃষ্টি করতে পারে না চলার পথে বিঘ্ন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্তব্যরত সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে পারে না। পারে না রেললাইন উপড়ে ফেলে দুর্ঘটনার কারণ ঘটাতে। এমনকি পারে না জলযানে আগুন দিতে।

যে বা যারা এগুলো করে, তাদের যথাযথভাবে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রশাসনের দায়িত্ব। আশঙ্কা করা অযৌক্তিক হবে না যে, বর্তমান প্রশাসনব্যবস্থাকে যেভাবে দলমুখী করা হয়েছে, এতে প্রকৃত দোষী ব্যক্তির পাশাপাশি কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে তাদের বাদ দিয়ে শুধু বিরোধী দল করে বলেই কিছু লোককে মামলায় জড়িয়ে দেয়া হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, তা হচ্ছেও। এসব ঘটনায় মামলা হচ্ছে শত শত ব্যক্তির নামে। সৃষ্টি হচ্ছে গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের সুযোগ। এতে প্রকৃত উদ্দেশ্য হবে ব্যাহত। জনগণের যানমালের ক্ষয়ক্ষতি যারা করে চলেছে, তারা অনেক ক্ষেত্রে থাকবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ যেকোনো অবস্থায় এ-জাতীয় অপরাধীদের ক্ষমাহীন দৃষ্টিতে দেখা যৌক্তিক ও সংগত। আর তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।

এরপর থাকছে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেয়ার বিষয়টি। শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, সংকটের উৎস রাজনীতি। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার মন্তব্য রাখা অসংগত হবে। আচরণবিধি অনুসারে তা করার সুযোগ তাদের নেই। তবে তারা বলতে পারে, যেকোনো অবস্থায় জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি যে বা যারা ঘটাবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

শুধু বলা নয়, দৃশ্যমান ও পক্ষপাতহীনভাবে তা করতেও হবে। হরতাল-অবরোধ আহ্বান করার অধিকার কোনো দলের যেমন রয়েছে, অন্যদের রয়েছে তা মানা না-মানার অধিকার। অথচ এসব কর্মসূচির শুরুতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা, ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে জনজীবনকে অচল করে দেয়া হয়। অতীতেও তা হয়েছে। তবে যেকোনো এক স্থানে এসে বিষয়টির ইতি ঘটা প্রয়োজন। চলাচলের স্বাধীনতায় বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগকারীদেরও একইভাবে আনতে হবে আইনের আওতায়। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে ধরনের সহিংসতা, পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে তার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এটা শুধু জনগণকেই বিচলিত, ক্ষুব্ধ করছে না; এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলেও বিশেষ উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ নিয়ে বহির্বিশ্বের বরাবরই আগ্রহ আছে। সেই আগ্রহও আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছি। কিন্তু বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সেখানে স্বাভাবিকভাবে দেশের মানুষের সঙ্গে তারাও উদ্বিগ্ন।

গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার জন্য সব সময় নির্বাচন ও নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতিকেই এখানে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছিল। সেই ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করা হয়। নির্বাচনের ব্যাপারে প্রথম দিকে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন অবস্থান ছিল; কিন্তু নির্বাচনের পর যেহেতু সরকার ও তার পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে তেমন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি, তাই বহির্বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের তেমন পার্থক্য ঘটেনি। সরকার নানাভাবে তাদের সহযোগিতা পেয়েছে এবং তারাও সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু এখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে পরিস্থিতি চলছে সেটা থেকে স্বাভাবিকভাবে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে। এই এক নতুন বাস্তবতা। এই বাস্তবতা হলো সহিংসতার, নাশকতার, সন্ত্রাসের। এটা কখনো কেউ মেনে নিতে পারে না।

আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই মনে করে যে, রাজনৈতিক দাবি, রাজনৈতিক স্বার্থ বা রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার কোনোভাবেই এমন সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হতে পারে না। এমন চোরাগোপ্তা হামলা, নাশকতা কোনো রাজনীতির ভাষা হতে পারে না। এমনটা মানুষ দেখেছিল যখন আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করি, ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে থেকে নিজেদের উত্তরণের জন্য লড়েছি, সেই সময়। তখন আমাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল যারা প্রতিপক্ষ; অর্থাৎ যারা শাসনকার্য পরিচালনা করত। কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত তারা। এমনকি নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী যে আন্দোলন, সেখানেও এমনটা ছিল না। নব্বইয়ে আন্দোলন আমাদের গণতন্ত্রের আন্দোলন, ভোটের আন্দোলন। এখন যেভাবে আন্দোলনের লক্ষ্য সাধারণ মানুষ, সেটা তখন ছিল না। কখনোই আমাদের দেশে এমন আন্দোলন ছিল না যে, যেখানে সাধারণ মানুষ কাজ করে খায়, যে বাসে চড়ে, সে পথে যাতায়াত করে, সেগুলোকে আক্রমণের লক্ষ্য করা। এখন কী হচ্ছে? বাসে আগুনে দেয়া, পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেয়া, পেট্রলবোমা মারা। এগুলো সন্ত্রাসী কাজ। তাই এসব নিয়ে শুধু দেশের ভেতরে নয়, বাইরে যারা কোনো না কোনোভাবে দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত তারাও উদ্বিগ্ন। কূটনীতিকরা উৎকণ্ঠিত। তাঁরা বুঝতে পারছেন কী হচ্ছে। তাঁরা সতর্ক। কারণ এখানে তাঁদের অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে, কূটনৈতিক স্বার্থ আছে, ইমেজের ব্যাপার আছে। তাই তা কোনোভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেউই চাইবে না পরিস্থিতি এমন থাক। সরকার নিজের থেকেই কূটনীতিকদের কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা দিয়েছে। এটা অবশ্যই দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে। আর এটা তো ঠিকই যে সরকার বলুক আর না বলুক, তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত। তাদের নিজেদের চ্যানেল, সোর্স, আমাদের মিডিয়া সব কিছু থেকেই তারা খবর সংগ্রহ করে। সব সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এখন বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের জোয়ার চলছে। ফ্রান্সের শার্লি এবদো পত্রিকায় আক্রমণ হলো, সেটা নিয়ে সারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের একটা ফেনোমেনা তৈরি হয়েছে। আর বাংলাদেশে যে আক্রমণ হচ্ছে, সেটা যে কোনো এক্সট্রিমিষ্ট ফোর্সের করা, সেটা বোঝা যায়। যদিও এখনো আমরা তার কোনো প্রমাণ পাইনি। তাই এটা নিয়ে তাদের উৎকণ্ঠা থাকবেই। কারণ, বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র, যা ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নানা কারণে সম্ভাবনাময়, সেই রাষ্ট্রের মধ্যে এ ধরনর বিষয়গুলো যখন গুরুত্ব পায় তখন সেটা শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই উৎকণ্ঠার কারণ। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি দেশের রাজনৈতিক আবহকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী করার যে প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি, তা এসব কারণে বিলম্বিত হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া যদি আরো চলমান থাকে, তাহলে অবশ্যই তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। তাই এসব কর্মকাণ্ড যারা করছে, তারা যদি সেটা বন্ধ না করে তাহলে সেটা রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি, এমনকি সভ্যতাকেও হুমকিতে ফেলবে। তাই প্রথমত, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। দরকার দেশের সব নাগরিক, সুধীসমাজ, সরকার, রাজনীতিবিদ সবার সচেতনতা। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে কখনো সাধারণ মানুষ আক্রমণের লক্ষ্য হতে পারে না। আমরা রাজনৈতিক আন্দোলন চাই। রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনা-সমালোচনা ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ নির্বাচন, জবাবদিহিমূলক সংসদ আমাদের কাম্য। বর্তমান রাজনৈতিক হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, কাদা ছোড়াছুড়ি, পারস্পরিক দোষারোপ, হরতাল-অবরোধ, ককটেল আর পেট্রলবোমার আতঙ্ক, নিরীহ জনগণের অপরিসীম ভোগান্তি, জীবন্ত দগ্ধ ও পঙ্গুত্ববরণসহ যাবতীয় অঘটন হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যদিনকার নিয়তি। তার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে নতুন করে সংযোজন হয়েছে প্রতিনিয়ত ‘পেট্রলবোমা’ ছুড়ে যানবাহনের প্রভূত ক্ষতিসাধন করা; নিরীহ যাত্রী এবং পথচারীদের অগ্নিদগ্ধ করে নিহত ও আহত করা। এই নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা দেখতে পেলে স্বয়ং চেঙ্গিস ও হালাকু খানের বিদেহী আত্মাও হয়তো থরথর করে কেঁপে ওঠতো। কিন্তু আমাদের সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রী ও তাদের কর্মীদের কোনো ভাবান্তর নেই। এটাকে পৈশাচিকতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আমাদের দেশে প্রতি এক হাজার ৬০০ জনের জন্য একজন পুলিশ। তা সত্ত্বেও দেশের বর্তমান বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যরা জনগণের জানমাল রক্ষার্থে প্রাণান্ত চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না। তবে রাজনৈতিক দলগুলো নিষ্ঠুরতার দাঁতভাঙা জবাব পাবে এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এ পর্যন্ত রাজনৈতিক নাশকতায় ৫৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। হাসপাতালে যখন সন্তান পেট্রলবোমায় ঝলসে যাওয়া বাবার মুখ দেখতে ভয় পাচ্ছে, সন্তানহারা, স্বামীহারা, স্বজনহারা যখন আর্তচিৎকারে ব্যাকুল, ঠিক তখনই খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে কোকোর অকালমৃত্যুতে খালেদা জিয়া অবিরাম কেঁদে যাচ্ছেন। তাঁর কী মনে পড়ে না এই কান্না তো ৫৮ জন স্বজনহারা পরিবারেও এখন চলছে। তারপরও কেন তাঁর শুভবুদ্ধির উদয় হচ্ছে না? প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে জাতি নাশকতা দমনে কার্যকর পদক্ষেপ চায়। জঙ্গিবাদ দমন করুন। তালেবান হামলা ঠেকাতে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুন খোয়া প্রদেশে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অস্ত্র পরিচালনায় প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই জঙ্গিবাদ দমন করা ন্ াহলে অদূরভবিষ্যতে হয়তো বাংলাদেশের জন্যও এ ধরনের দুরবস্থা অপেক্ষা করবে।

২০১৯ সালের আগে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে সরকার আগ্রহী নয়। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচিতে জনদুর্ভোগ চরম ওঠেছে। নিভে গেছে অনেক প্রাণ। আতঙ্কিত হয়ে অনেকে ঘরের বের হতে পারছে না। কিন্তু বিএনপির এ আন্দোলনের পরও সরকার নির্বাচন দেবে বলে মনে করি না। বিএনপির উচিত ছিল আন্দোলনের জন্য জনমত তৈরি করা। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন জনগণের স্বতঃর্স্ফূত অংশগ্রহণেই দাবি আদায় সম্ভব হয়েছিল। ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। সুতরাং জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন না করে ২০১৯ সালে নির্বাচন কিভাবে হবে, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।

অনড় অবস্থানে সরকার ও বিরোধী দল। আমি মনে করি, বিরোধী দলের বর্তমান যে সমর্থন তার ওপর ভর করে সুবিধা করতে পারবে না। তাই যত দ্রুত তারা তাদের এই ভুল বুঝতে পারে ততই তাদের মঙ্গল। তাদের বুঝতে হবে ক্ষতিটা হচ্ছে জনগণের। সরকারকেও অনুরোধ করব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে কঠোর হস্তে পরিস্থিতি দমন করা হোক।

পেট্রলবোমায় একের পর এক প্রাণহানি ঘটছে। এ জন্য দায়ী সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষই। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। যে রাজনীতি দেশজুড়ে এ ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দায়ী তাকে আমরা তীব্র ধিক্কারের সঙ্গে প্রত্যাখান করি। দেশ ও জনগণের স্বার্থে এ অবস্থার অবশ্যই অবসান হওয়া উচিত। সংলাপের মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে এসে সমাধান হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী নির্বাচনের পথেই এগোতে হবে। তবে সর্বাগ্রে বন্ধ করতে হবে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যার রাজনীতি। মনে রাখতে হবে, দেশটা আওয়ামী লীগ বা বিএনপির নয়, ১৬ কোটি মানুষের।

লেখক : ডা. মো. রেজাউল করিম, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026