নিউজ ডেস্ক: আইএস নামক ইসলামিক ষ্ট্যাট এক বছরের কিছু সময় ধরে ইসলামের নামে হঠাৎ করে উগ্র মতবাদ প্রচারের মাধ্যমে, তরুণ-তরুনীদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে, বিশেষ করে ব্রিটেনের তরুন-তরুনী মুসলমান ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ব্যাপক এক সাড়া আর হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে।
আইএস এমন সব কর্মকান্ড করছে, এমন জঘন্য কায়দায় সমস্ত মানবতাকে ভুলুণ্ঠিত করে বর্বর আর নির্মম কায়দায় জিহাদী কার্যক্রমের নামে শিরচ্ছেদের নামে যে সব ভিডিও বার্তা ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছে, তা নিয়ে তাবত মানবতাকামী আর ইসলামিক দুনিয়ার সকল স্কলার, ইমাম আর বিশেষজ্ঞগণ আইএস এর কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ ইসলামিক শরীয়া ও নিয়মা-কানুনের বিরোধী বলে মতামত দিয়েছেন। ব্রিটেনের ১০০ ইসলামিক স্কলার আর সারা বিশ্বের হাজারো নামী দামী স্কলাররা প্রকাশ্যেই বলছেন আইএস অনৈসলামিক এবং ইসলাম সম্মত নয় এমন বর্বর কর্মকান্ড করছে।
সম্প্রতি ব্রিটেনের তিন বাংলাদেশী স্কুল পড়ুয়া তরুনী পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সিরিয়ায় আইএসের সাথে যোগ দেয়ার জন্য তার্কি বর্ডার হয়ে গমণ করেছেন বলে ব্যাপক জল্পনা-কল্পণা করছে প্রভাবশালী সকল প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া।তিন তরুনী শামীমা(১৫), খাদিজা(১৬) আর আমিরা আব্বাসী(১৫) সিরিয়া গমনের প্রেক্ষিতে ব্রিটেন সরকারের নড়ে চড়ে বসে।
সর্বত্র একই আলোচনা এ কেমন করে ঘটলো বা সম্ভব হলো। ব্রিটেনের বিগত কয়েক দশক ধরে যে বাংলাদেশী পরিবারগুলোর শান্তি প্রিয় হিসেবে যে সুখ্যাতি ছিলো, তা মূলত ধুলায় মিশিয়ে যাচ্ছে, শুধু মাত্র এই তিন স্কুল পড়ুয়া ছাত্রীর জন্যেই নয়, বরং আইএস জিহাদী কার্যক্রমের পর থেকে ব্রিটেনের বাংলাদেশী পরিবারগুলোর তরুন-তরুনীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ- উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
মসজিদে মসজিদে কাউন্সিল আর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে ইমাম সাহেবগণ আইএসের জঙ্গিদের ইন্টারনেট সাইবার আক্রমন আর মগজ ধোলাইয়ের হাত থেকে ছেলে মেয়েদের রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও কৌশল নিয়ে দিকনির্দেশনাও প্রদান করা হয়। এতো কিছুর পরেও থামছেনা আইএস এর এই জঙ্গিদের সাথে বাংলাদেশী পরিবারগুলোর সম্পৃক্ততা।
শামীমা, খাদিজা, আমিরার পর এবার ব্রিটেনের আরো এক বাংলাদেশী পরিবারের বধু স্বামীকে ফেলে আপন সন্তান সন্তুতি নিয়ে আইএস জিহাদীদের সাথে শরীক হওয়ার জন্য ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন বলে আরব নিউজ, ডেইলি মেইল আর স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে এই সংবাদ নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ঘটনার বিবরনে জানা যায়, রেহেনা বেগম নামের এই বাংলাদেশী মা তার আট বছরের শিশু সন্তান আর তিন বছরের কন্যাকে নিয়ে তুরস্কের বর্ডার হয়ে সিরিয়া গমন করেছেন বলে ব্যাপকভাবে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে।
আরব নিউজ, ডেইলি মেইল সূত্র জানিয়েছে, ৩৩ বছর বয়সী এই রেহেনা বেগম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বাংলাদেশী, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি হিথরো হয়ে ইস্তাম্বুল যান, সেখান থেকে তিনি অভ্যন্তরীন ফ্লাইট ধরে তুরস্কের আরো এক শহর গাজিয়ানটেপ গমন করে বর্ডার ক্রস করে সিরিয়ায় পৌছেছেন বলে বলা হচ্ছে।
এদিকে গত রাতের আগের রাতে পুলিশ মোহাম্মদ আল-রশিদ নামের একজন সিরিয়ানকে আইএস কার্যক্রমে গ্রেপ্তার করেছে। তার ল্যাপটপে পুলিশ এই রেহেনা বেগমের ডিটেইলস আইডি সহকারে পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, শামীমা, খাদিজা, আমিরাকে সিরিয়া যেতে সাহায্যকারী হিসেবে পুলিশ এই গেপ্তারকৃত রশিদ সাহায্য করেছে, তারই( সিরিয়ানের) সহযোগীতায় রেহেনা বেগম শিশু সন্তানদের নিয়ে সিরিয়া গমন করেছেন।কারণ পুলিশকে রশিদ জানিয়েছে সে ব্রিটিশ যোদ্ধাদের সাহায্য করছে সিরিয়া যেতে, আফ্রিকান ও অস্ট্রেলিয়ানদেও এবং তার ল্যাপটপে আরো দুজন ব্রিটিশের আইডি পুলিশ পেয়েছে, তাদের বয়স হলো ১৯ এবং ২৯।
রেহেনা বেগমের স্বামী আজিজুল ইসলাম একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার। তিনি ঘটনার প্রেক্ষিতে হতবাক এবং শোকে মুহ্যমান। দুটি অবুঝ শিশু সন্তানের জন্য তিনি এক সাগর দুঃখের পাহাড় তার বুকের মধ্যে চেপে আছে বলে বিলাপ করছেন। আজিজুল ইসলাম বলেন, দুটি শিশু সন্তান নিয়ে তার স্ত্রী ফিরে আসবেন। তিনি আরো বলেন, তার এই সিদ্ধান্ত তার দুটি অবুঝ শিশু সন্তান সহ তাদের পুরো জিন্দেগি ধ্বংস করে দিয়েছেন।
আজিজুল বলেন, আইএস ইসলামের নাম নিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। আমার ধর্ম ইসলাম হত্যা সমর্থন করেনা। তিনি বলেন, একজন মুসলিম মাত্রই জানেন পবিত্র কোরআন এমন হত্যা সমর্থন করেনা। তিনি বলেন, পুলিশ জানিয়েছে তার স্ত্রী তুরস্কের গাজিয়ানটেপ শহরে গিয়েছেন, যা আইএসের সাথে যোগ দেয়ার জন্য সিরিয়ায় পৌছার সব চাইতে পপুলার গেট-ওয়ে।৩৬ বছর বয়সী ট্যাক্সি ড্রাইভার আজিজুল বলেন এটা অত্যন্ত বেদনা দায়ক আমার স্ত্রী আইএসের সাথে যোগ দেয়ার জন্যে ঘর ছেড়েছেন, দুটি সন্তানের জন্যে আমার খুব কষ্ট হয়। মাস খানেকের মতো হলো আজিজুল তার সন্তানদের দেখতে পাননি।
আজিজুল আরো বলেন, আমি বুঝতে অক্ষম সে কেন গেলো? তার দুটি সন্তান রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব ঘর, তারপরেও কেন সে গেলো? এমন অনেক ব্রিটিশ রয়েছেন তুরস্কে হলিডেতে যান, আমার মনেই হয়না সে আইএসের সাথে যোগ দিয়েছে, কেননা এখনো আমি বিশ্বাস করি সে ফিরে আসবে।
আমরাও বিশ্বাস করি। তাই যেন হয়। এই রেহেনা এক সময় রয়াল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ডে চাকুরী করতেন বলে স্থানীয় বাংলাদেশী সূত্র উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এমন করে সংসার ফেলে, ব্রিটেনের মতো উন্নত জীবন ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এমন করে দুঃখের পাহাড় মাথায় নেয়ার জন্য তরুন তরুনীরা কেন যাচ্ছে বিপথে ? সময় এসেছে আমাদের সেই সব ভাববার। স্বামী আজিজুলের কাছ থেকে জানা গেছে, তার স্ত্রীকে যখন তিনি বিয়ে করেন, তখন সে নামায-কালাম বা এতো ধার্মিক ছিলোনা। সে স্বাভাবিক এক ব্রিটিশ বাংলাদেশী তরুনী ছিলো। ছিলো খুব উচ্ছ্বল। হঠাত করে তার স্ত্রীর মধ্যে এক ব্যাপক পরিবর্তন তিনি লক্ষ্য করলেন। হিজাব পড়া শুরু, নামায পড়া, ধর্মীয় আলোচনায় যাওয়া। তিনি ভাবছেন ভালোইতো। আল্লাহর নাম নেয়া সেটা ভালো কাজ।কিন্তু এমন পরিবর্তন তিনি ভাবতেও পারেননি। একেবারে জিহাদি কাজে যোগদান।
একদল রিসার্চরাও দেখেছেন, হঠাত করেই আমাদের তরুন-তরুনীদের মধ্যে এক ধরনের ফ্যানাটিক ইসলামিক এক পরিবর্তন দেখা দেয়। যা তারা আগে কখনো করতোনা। নামায পড়া, ধর্মীয় আলোচনা, অত্যধিক মাত্রায় গোগল সার্চের মাধ্যমে ইসলামিক নামে বেনামের তথাকথিত আধ্যাত্মিক ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্য শুনতে অত্যধিক মনোযোগ, ক্লাস, কাজ সব ফেলে দিয়ে সেই দিকে ঝুকে পড়া, ইসলামিক ড্রেস পরিধান, আর আল্লাহু আকবার ইত্যাদি ধবনি সব কাজের ব্যাপারের শোকরিয়া আদায়ের সাইন হিসেবে উল্লেখ, বিজ্ঞান, জ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প সব কিছুকেই অবজ্ঞা আর ইসলামের বিরোধী হিসেবে দেখা, কোরআন অধ্যয়ন না করে কোরআনের নাম নিয়ে ইন্টারনেটে শেখা ঐ ধর্মীয় বক্তার বক্তব্য প্রচারে ও আলোচনায় মত্ত থাকা, ঘন ঘন মোবাইল ফোনে ফিস ফিস করে দিনে রাত আল্লাহ রসূলের নাম নিয়ে অপর প্রান্তের সাথে আলোচনা, ফেস বুকে, ওয়াটঅ্যাপে চ্যাট, ভাইভারে কথা বার্তা যখন তখন, ক্লাসের ফাঁকে, কাজের ফাঁকে, অপরিচিত আল খেল্লা ধারীদের সাথে যোগাযোগ সখ্য, মুখে ক্লিন শেভের পরিবর্তে দাঁড়ি ইত্যাদি লক্ষণগুলো হঠাত এবং নাটকীয়ভাবে ছেলে মেয়েদের মধ্যে আসা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে লক্ষণগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এ সব দেখলে অভিভাবক ও পরিবারের কর্তাদের সতর্কভাবে পর্যালোচনা করে খুন শান্ত ও মোলায়েম এবং যত্নের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সেই ফ্যানাটিক আইএস কানেকশন থাকে, যাতে ফিরে আসে- সেই কার্যক্রম, কাউন্সেলিং, পরামর্শ, সহযোগীতা করা জরুরী। কারণ এই অবস্থায় আরো কঠোরতা ও অত্যধিক শাসন আবার লাগামছাড়া- উভয়ই হীতে বিপরীত হবে। আইএস হলো প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী এবং আধুনিক সব প্রযুক্তি তাদের আয়ত্মে। তারা সন্তানদের মগজ ধোলাইয়ে ওস্তাদ। এদের কাছ থেকে বা এই সব সন্ত্রাসী জঙ্গিদের খপ্পড় থেকে আপনার আমার সকলের সন্তানদের রক্ষা করা পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।কোমলপ্রাণ একবার বিঘড়ে গেলে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা অনেক কষ্টসাধ্য এক কাজ।
গত শুক্রবার জুম্মার পূর্বে বক্তব্য দিতে গিয়ে শেডওয়েল মসজিদের খতিব মাওলানা নূরুল ইসলাম বলেছেন, দুনিয়ার সমস্ত আলেম ওলামা আর ইসলামিক স্কলার ও মুফতীগন একমত, আইএস হলো সন্ত্রাসী সংগঠণ। এদের কার্যক্রম ইসলাম ও ইসলামী শরীয়া বিরোধী। তিনি বলেছেন, আজকের যুগে, হযরত ঈসা আলাইহিওয়াসাল্লামের আসার আগে ইসলামিক দুনিয়ার সাথে অন্য কোন জাতি গোষ্ঠী গোত্রের কোন জিহাদের প্রয়োজন নাই, নিষিদ্ধ। ইসলাম এলাও করেনা এই ধরনের জিহাদি কার্যক্রম। তাই সাবধান সকল মা বাবা ভাই বন্ধু বিনীতভাবে আপনার সন্তানদের প্রতি তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রাখবেন, যাতে গোগল, ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুক,ভাইভার, ওয়াটসঅ্যাপ, ট্যাঙ্গো, লাইন ইত্যাদির মাধ্যমে আইএস এর জঙ্গিদের সাথে কানেকশন যাতে না হয়। সাবধান, তাহলেই বড় বিপদ, বড় মুসিবত ডেকে আনবেন। আইএস একটি জঙ্গি সংগঠণ।
ব্রিটেনের হোম সেক্রেটারি থেরেসা মে বলেছেন, উগ্রপন্থাদের কে সহযোগীতা করছে কতিপয় মসজিদ। তিনি চান এই সব মসজিদ বন্ধ করে দিতে, যারা তরুন-তরুনীদের বিপথগামী করছে। থেরেসা মে পরিকল্পনা করছেন মসজিদ সহ হেট প্রিচার বন্ধ করে দিতে। একই সাথে শরীয়া কোর্ট রিভিউ করতে-কেননা এটা ইসলামিক নারীদের ফ্যানাটিক কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করছে বলে মত প্রকাশ করেছেন।
আজ এক পরিকল্পনার মাধ্যমে থেরেসা মে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে এই সকল ফ্যানাটিক কার্যযক্রমের মসজিদ সমূহ বন্ধ করে দেয়ার কথা জানিয়েছেন।তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতের টোরি সরকার এই ক্লোজার অর্ডার উপস্থাপন, বাস্তবায়ন করবে।তিনি আরো বলেন, আঞ্জাম চৌধুরীর মতো উগ্রপন্থী প্রিচার যারা ব্রিটিশ মূল্যবোধে বিষ ছড়িয়ে দিতেছে ও সমাজে বিতৃষ্ণা ছড়াচ্ছে, উগ্রপন্থাকে লালন ও সহযোগীতা করছে, তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিবে। অপরদিকে লেবার দলের নেতা মিলিব্যান্ডের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে বক্তৃতা দেয়ার সময় সাবেক ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার সরকারের পলিসি ব্রিটেনে উগ্রপন্থা ঠেকাতে ব্যর্থ বলে সমালোচনা করেছেন।