মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:০৫

লতিফ সিদ্দিকীর বিদায়: না রাজনীতিতে পুনর্বাসন

লতিফ সিদ্দিকীর বিদায়: না রাজনীতিতে পুনর্বাসন

ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ, মহানবী (সা.) ও তাবলিগ জামাত সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য দেয়ার ঘটনায় দীর্ঘ নাটকীয়তার পর আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে যোগদান এবং পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ১৬ মিনিটের বক্তব্যের পর তিনি পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। স্পিকার তা গ্রহণ করেছেন। অবশ্য পরিস্থিতি বুঝতে পেরে এর আগেই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

এ ঘটনা আসলেই কী লতিফ সিদ্দিকীর বিদায় না রাজনীতিতে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া এনিয়ে এখন সর্বমহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অবশ্য নাগরিকদের মনে এ ধরনের প্রশ্ন জাগার পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কেননা, এ নিয়ে আওয়ামী লীগের ভুমিকা ও আর লতিফ সিদ্দকীর বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যই প্রমাণ করে এ বিদায় আসলে বিদায় নয়, এ পদত্যাগ আসলে পদত্যাগ নয়, মূলত: সিদ্দিকীর ঘুরে দাঁড়ানোর একটি বিশেষ প্রক্রিয়া হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে লতিফের ইতোপূর্বে দেয়া কিছু বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। গেল বছরের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় ফিরে তিনি বলেছিলেন, দেশে ফিরতে চান। তবে এ ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। তার বক্তব্য নিয়ে দল ও দলের সভানেত্রী যেভাবে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন তা নিয়ে তিনি অনুতপ্ত। এর ক’দিন পরই অবশ্য তিনি সরকারের গ্রিন সিগনালেই দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

এরপর তিনি গেল ২৩ আগস্ট নির্বাচন কমিশনে শুনানি শেষে ইসিতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমার নেতা চান না আমি এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করি। সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আমার কোনো লোভ নেই। তাই দলের প্রতি, নেতার প্রতি আস্থা ও আনুগত্যের অংশ হিসেবে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেব।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে একটি অনুষ্ঠানে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী পবিত্র হজ ও মহানবী (সা.) নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় বাংলাদেশসহ বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে। এপ্রেক্ষিতে অনেকটাই চাপের মুখে সরকার প্রথমে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেয়।

এরপর আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সর্বশেষ প্রাথমিক সদস্য পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়। তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলে তড়িঘড়ি করে স্পিকারকে চিঠিও দেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতে ইসিকে চিঠি দেন স্পিকার।

এ বিষয়ে লতিফ হাইকোর্টে রিট করে হেরে যান। এরপর আওয়ামী লীগ ও লতিফ সিদ্দিকীর লিখিত বক্তব্য দেয়ার পর গেল ২৩ আগস্ট শুনানির আয়োজন করে ইসি। কিন্তু ওইদিন লতিফ সিদ্দিকীর অনুরোধের প্রেক্ষিতেই সরকারের তলবীবাহক নির্বাচন কমিশনও শুনানি স্থগিত করে।

এছাড়া গেল মঙ্গলবার মাগরিবের বিরতির পরই লতিফ সিদ্দিকী সংসদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে তার নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে যে বক্তব্য রাখেন এখানে্ও সরকারের এক ধরনের সহানুভুতি কাজ করেছে। অন্যথা তার এভাবে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়া এবং বক্তব্য রাখা সম্ভব হতো না বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল।

এখন আসি তার বক্তব্যের দিকে, মঙ্গলবার মি. সিদ্দিকী জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অংশ নিয়ে বলেন আজ আমার সমাপ্তির দিন। কারো বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, অভিযোগ আনছি না। দেশবাসী আমার কোনো আচরণে দুঃখ পেয়ে থাকলে দেশবাসীর কাছে নতমস্তকে ক্ষমা চাচ্ছি।

বক্তব্যে লতিফ সিদ্দিকী নিজেকে একজন সাচ্চা মুসলমান, বাঙালি ও আওয়ামী লীগার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি মুসলমান, আমি বাঙালি এবং আমি আওয়ামী লীগার। আমার এ পরিচয় মুছে দেয়ার ক্ষমতা পৃথিবীতে কারো নেই।

তিনি বলেন, সবার আগে ঠিক করতে হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি হবে? বাঙালি আত্মপরিচয়ের সড়ক ঘোষণায় স্কুল ও কলেজ জীবনে চারবার বহিষ্কার হতে হয়েছে। দল থেকে অতীতেও দুইবার বহিষ্কৃত হতে হয়। দুর্নীতি বা অন্য কোনো কারণে নয়, দলের দুর্বল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

সাবেক এই মন্ত্রী ইসিকে দেয়া স্পিকারের চিঠি সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলেন। তবে তিনি শেষ বেলায় কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না বলে ঘোষণা দেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আমি ধর্মবিরোধী নই, আমি ধর্ম অনুরাগী। আমি অমানুষ নই, প্রথমত আমি মানুষ। মানুষ ও মনুষ্যত্বের অনুশীলন করি।

লতিফ সিদ্দিকী এও বলেন, তিনি পবিত্র হজ পালন করেছেন এবং ধর্মীয় জীবন একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। এবার তাকে ষড়যন্ত্রকারী, ধর্মদ্রোহী, শয়তানের রিপ্রেজেনটেটিভ আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হয়। যে প্রক্রিয়ায় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তা কতখানি যৌক্তিক তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তবে তার বিরুদ্ধে যতই ষড়যন্ত্র করা হোক, ঘাত-প্রতিঘাত যতই আসুক তা তিনি মোকাবিলা করবেন বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি কোনোভাবেই ‘পথভ্রষ্ট’ হবেন না বলেও উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বিদায় বেলায় বলতে চাই- আমি মানুষের জন্য রাজনীতি করেছি। মানুষকে ভালোবেসেছি। মানুষের ভালোবাসাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মূলধন। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে লতিফ সিদ্দিকী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। স্পিকার বরাবর লেখা পদত্যাগপত্রটি তিনি পড়ে শোনানোর অনুমতি চান।

স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অত্যন্ত কোমল ভাষায় বলেন, সেটি পড়ে শোনানোর প্রয়োজন নেই। তারপর লতিফ সিদ্দিকী তাকে সময় দেওয়ার জন্য স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে বিদায় নেন। এসময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রীসহ সকল সংসদ সদস্যগণকে লতিফ কিংবা তার বক্তব্যের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা যায়নি। তারা সবাই অনেকটা নীরবতা পালন করে লতিফের বক্তব্যকেই সমর্থন দিয়ে যান।

ফলে লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, সরকার তাকে মন্ত্রীসভা এবং দল থেকে বহিষ্কার করলেও তার দেশে ফেরা, আত্মসমর্পণ, হাইকোর্টে রিট, পদত্যাগের ঘোষণা এবং সংসদে অংশগ্রহণ পুরো প্রক্রিয়াতেই ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে একটা যোগাযোগ ছিল বরাবরই। কেননা, দীর্ঘ ২১ বছর আগে ইসলামের অবমাননাকর লেখা লিখে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন বস্তুবাদী প্রভাবশালী লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তিনি আজও দেশে ফেরার সাহস করেননি।

অথচ, লতিফ সিদ্দিকী হজ, মহানবী (সা.) ও তাবলিগ জামাত সম্পর্কে চরম আপত্তি ও অবমাননাকর বক্তব্য দিয়ে স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই তিনি দেশে ফিরেন। শুধু দেশেই ফিরেননি জাতীয় সংসদেও বক্তব্য রেখেছেন।যে অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী নিজেও উপস্থিত ছিলেন। ফলে এসব বিষয়ে পর্যালোচনায় লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়টি সহজেই রহস্যাবৃত বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগ অনেকটাই কৌশলী ভুমিকা পালন করেছে। তারা দেশবাসীকে অনেকটাই বোকা বানিয়ে লতিফ সিদ্দিকীকে রাজনীতিতে পুনবার্সনের একটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।

ফলে আসন্ন উপনির্বাচনে লতিফ সিদ্দিকী যে সংশ্লিষ্ট আসন থেকে প্রার্থী হচ্ছেন তা অনেকটাই নিশ্চিত করেই বলা যায়। আর সেক্ষেত্রে তার বিজয়ে্ও আওয়ামী লীগ যে সহানুভুতি প্রদর্শন করবে এতে অন্তত: আমার কোনো সন্দেহ নেই।

অবশ্য আ্ওয়ামী লীগ রাজনীতিতে বেশ দক্ষ, কখন কি করতে হয় এবং কাকে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করা কিংবা ছুঁড়ে মারতে হয় এসব বিষয়ে তারা বেশ পাকা। গেল কয়েক বছরের রাজনীতিই তা প্রমাণ করে। তবে আমার মনে এ বিষয়ে জনগণকে এতটা বোকা ভাবা সরকার ও আ’লীগের ঠিক হয়নি। এখন না হলেও ভবিষ্যতে এর খেসারত আওয়ামী লীগকে দিতে হতে পারে।

আর লতিফ সিদ্দিকীর সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই। তবে তিনি যে নিজের ধর্ম বিশ্বাসকে হেয় এবং বিকিয়ে দিয়ে দলবাজি করার চেষ্টা করেছেন তা খুব ন্যাক্কারজনক। সংসদে দেয়া বক্তব্যে তিনি নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন বটে তার এই পরিণতির জন্য নিজের দায়কে এড়িয়ে অন্যদের দোষারোপ করার চেষ্টা করেছেন, এটা তার হীন মানসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এরপরও কেউ যদি কোনো ধর্মকে বিশ্বাস, ধর্ম পালন না করে তবে সেটা তার ব্যক্তি বিষয়। কিন্তু কোনো ধর্মকে হেয় করা কিংবা কারো ধর্মানুভুতি আঘাত দেয়ার অধিকার কারো নেই, এটাই যে কোনো শাসনব্যবস্থায় স্বীকৃত সত্য। কেননা, কোনো ধর্মকে অবমাননাকারী কেহই দুনিয়াতে বেশি দিন ভাল থাকতে পারেনি, তাকে মাসুল দিতেই হয়েছে। ফলে লতিফকে কম মাসুল দিতে হয়নি। তবে তার ভাগ্য দল ক্ষমতায়, অন্যথা হয়তো তাকে আরো বেশি মাসুল দিতে হতো।

সংসদে দেয়া বক্তব্যে লতিফ সিদ্দিকী নিজেকে যেভাবে একজন সাচ্চা মুসলমান দাবি করে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, এতে আমাদের মনে হয়েছে তিনি এ বিষয়ে ভুল বুঝতে পেরেছেন, হয়তো তিনি মহান আল্লাহর ক্ষমা চেয়ে তওবাও করেছেন। যদি তিনি তা করে থাকেন তা খুবই ভাল, অন্যথা তাকে তওবা পড়ার আহবান জানাচ্ছি। সেই সাথে ধর্ম সম্পর্কে সতর্কতার সাথে কথা বলারও আহবান জানাচ্ছি। অন্যথা দেশবাসীর কাছে দ্বিতীয়বার ক্ষমা পা্ওয়া তার জন্য জটিল হতে পারে।

সবশেষে, সরকারের হর্তাকর্তা, আওয়ামী লীগের নেতানেত্রী এবং লতিফ সিদ্দিকীকে ধন্যবাদ, দেশবাসীকে বোকা বানিয়ে সুকৌশলে বিষয়টি স্যলিউশন করার জন্য।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026