বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১

জঙ্গী থেকে আইএস: নতুন বিতর্কে বাংলাদেশ

জঙ্গী থেকে আইএস: নতুন বিতর্কে বাংলাদেশ

আইএস- ইসলামিক স্টেট বা ‘দ্য ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট-আইএসআইএল (আরবদের কাছে দায়েশ)। বর্তামানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সম্পদশালী জঙ্গী গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তির্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করলেও পুরো বিশ্বের জন্য এখন বিপদজনক। ‘খেলাফত কায়েম’র ঘোষণা দিয়ে ‘নতুন বিশ্ব মানচিত্র’ তৈরি করেছে তারা।

খেলাফত’ ও ‘মানচিত্র’ ইসলামি শাসনের স্বর্ণযুগের ঐতিহ্যের সাথে সামনযশ্য হওয়ায় মুসলিম উম্মাহর কাছে ‘আবেগী আবেদন’ তৈরি করেছে। যার প্রভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মানুরাগী মুসলিম যুবকরা আইএসে যোগ দিচ্ছে। তথাকথিত ইসলামিক রাষ্ট্রের ধারণায় সক্রমিত হয়ে আনুগত্য করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক উগ্র গোষ্ঠীগুলো

ফলে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশে নতুন রূপে সংগঠিত হয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লড়াইয়ে নেমেছে। প্রতিনিয়ত হামলা হচ্ছে এবং দায় স্বীকার করা হচ্ছে। মার্কিন প্রশসান আইএসকে বিশ্বের ক্যান্সার ঘোষণা করলেও তাদের বিরুদ্ধেই এই দানব তৈরি অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে দৃষ্টিপাত করার প্রয়াস থাকবে।

বাংলাদে আইএসের অস্তিত্ব এবং কর্মতৎপরতা আছে কি নেই, তা নিয়ে চলছে বিতর্ক। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে কিছু দিন আগেও আইএসকর্মী আটক এবং তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী বেশ ঘটা করে প্রচার করতে দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন জোটের এমপি-মন্ত্রী-নেতারাও আইএস নিয়ে নানা কথা বলেছেন। তারা তীর্যক বাক্যবানে বিএনপি-জামায়াতকেই আক্রমণ করেছেন এবং জঙ্গী আখ্যা দিয়ে আইএসের সাথে সম্পর্কিত করেছেন

অথচ এখন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে দেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এই সুরে তাল মিলিয়েছে। সরকার ও ক্ষমতাসীনদের পরস্পর বিপরীতমূখী দুটি অবস্থানকে জঙ্গিবাদ নিয়ে দুই ধরনের নীতি। এখন প্রশ্ন হলো কোনটা সঠিক?

এর উত্তর খুজতে ফিরতে হবে দশক পেছনে। ২০০১ সালে আমেরিকার টুইনটাওয়ার হামলার পর বিশ্ব ব্যবস্থা নতুন মোড় নেয়। এই পরবির্তনের পেছনে সাম্রাজ্য ও সম্প্রসারণবাদী মার্কিন প্রশাসনের বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারের নতুন কর্মকৌশল। এ জন্য পশ্চিমা মিডিয়ার মাধ্যমে যেসব পরিভাষা রপ্তানী করা হয় তার মধ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা ‘জঙ্গীবাদ’ অন্যতম। তারা উপরে হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য উপরে সন্ত্রাস বা জঙ্গীবাদ দমনের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে তাদের মদদ দিয়েছে। বিশ্বের অন্তত ৮০টির বেশি দেশের ১৫ হাজারের বেশি ‘যোদ্ধা’ রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা।

বাংলাদেশেও আমদানীকৃত এই পরিভাষাটি ব্যাপকতা পায় ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একযোগে দেশের ৬৩টি জেলায় ৪০০ স্থানে বোমা হামলার পর। বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর সেই হামলা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও ব্যাপক আলোচিত হয়। ১৭ই আগস্টের পর চালানো হামলায় বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ ৩৩ জন মারা যান এবং আহত হন ৪ শতাধিক ব্যক্তি।

জেএমবির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখী করতে সক্ষম হয় ততকালীন সরকার। পরে কয়েকজনের ফাঁসিও কার্যকর করা হয়। এছাড়া এর আগে পরে আরো কিছু হামলা এবং এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর থেকে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতাদের বদৌলতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি আপামর জনসাভারণের কাছে পৌছে ‘জঙ্গিবাদ’ লেভেলে। সাথে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বাম রাজনীতিকরা পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি করেছেন ঢের। তারপর ২০০৬ সালে ২৮ অক্টোবরের রাজপথে আন্দোলনের নামে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের লগি-বৈঠার জঙ্গীবাদী তান্ডব এবং তার ফসল হিসেবে বহুল আলোচিত-সমালোচিত ওয়ান-ইলেভেনের জন্মকথাও সবারই জানা।

২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট সরকার রাষ্ট্রক্ষমতাসীন হলে জঙ্গীবাদ শব্দটি বাণিজ্যিক রূপ পায় বলে অনেকেরই ধারণা। মন্ত্রী-এমপি-নেতারা এই পরিভাষাটিকে প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াতের সাথে সম্পর্কিত করে এতো বেশি ব্যবহার করেছেন যে, সব মানুষের কর্ণকুহরে গেথে যায়। দেশে কিছু ঘটলেই তা ঢালাওভাবে চাপিয়ে দেয়া হে বিরোধীদের ওপর।

এবার আইএস বিতর্কে- বাংলাদেশী বংশদ্ভুত ব্রিটিশ নাগরিকদের আইএসে যোগদানের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মাঝে মধ্যে প্রকাশিত হয়। গত অগাস্টে ইউটিউবে প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, পাঁচজন আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদির কাছে জিহাদের শপথ নিচ্ছেন। ওই ভিডিওর সঙ্গে ইংরেজি ক্যাপশনে তাদের বাংলাদেশি বলে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের নাগরিকদের সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রথম জানায় প্রতিবেশি ভারত।

টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর জানায়, ভারতের হায়দ্রাবাদ থেকে বাংলাদেশে আসার পথে আইএসের চার সমর্থককে আটক করেছে কলকাতা পুলিশ। পুলিশ জানায় আটক ওই চার যুবক আইএসে যোগ দিতে বাংলাদেশ হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে চেয়েছিলেন। গ্রেফতারকৃত চার তরুণই ভারতের হায়দ্রাবাদের নাগরিক। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে এই জঙ্গী গোষ্ঠীর কর্মতৎপরতার খবর বের হয় ২০১৪ সালে।

সেবছর ১৯ সেপ্টেম্বর টঙ্গীর তুরাগের আশুলিয়া থেকে মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একাংশের ভারপ্রাপ্ত আমীর আদ্দুল্লাহ আল তাসনীমসহ ৭ সদস্যকে আটক করে পুলিশ। ডিবির যুগ্ম কমিশনার সংবাদ ব্রিফিংয়ে দাবি করে, ‘তাসনীমসহ গ্রেফতাার হওয়া এসব জঙ্গির ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের কথিত সশস্ত্র জিহাদে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। তাঁরা পাসপোর্টও তৈরি করেছিলেন’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২০ সেপ্টেম্বর)।

২৪ সেপ্টেম্বর সগুনবাগিচা ও রমনাা থেকে আসিফ আদনান (২৬) ও ফজলে এলাহী তানজিল (২৪) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা ইসলামিক স্টেটে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছিল বলে গোয়েন্দা পুলিশের দাবি। ২৬ সেপ্টেম্বর পুরানা পল্টন থেকে হিফজুর রহমান তরুণ গ্রেপ্তার হয়।

ব্রিফিংয়ে যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘সে নিজের ফেসবুকে আইএসআইএস বাংলাদেশ নামের একটি পেইজ খুলে জঙ্গি সংগঠন আইএসের জন্য কথিত জেহাদি সংগ্রহকারী হিসেবে কাজ করছিল বলে গোয়েন্দারা অনলাইন মনিটরিংয়ে দেখেছেন’ (দৈনিক যায়যায়দিন, ২৭ সেপ্টম্বর)। ২৭ সেপ্টেম্বর আইএসের কর্মী সন্দেহে পুলিশ আরো এক ব্যক্তিকে আটক করে।

২৮ সেপ্টেম্বর সামিউন রহমান ইবনে হামদান নামের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিককে আটক করা হয়। পর দিন সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে ডিবি। ঢাকা পুলিশ ব্রিফিং করে জানায়, সামিউন সিরিয়ায় নুসরা ব্রিগেডের সদস্য হয়ে আইএস-এর কথিত জিহাদে অংশ নিয়েছিলেন। আইএস-এর জিহাদে অংশ নিতে বৃটেন থেকে এক বন্ধুসহ তুরস্ক হয়ে সিরিয়ার যান।

সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সিরিয়ায় অবস্থান করে কথিত জিহাদে অংশ নেন তিনি। পরে আইএস ও নুসরা ব্রিগেডের সদস্য সংগ্রহ করতে মৌরতানিয়া ও মরক্কোতে যান বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই বৃটিশ নাগরিক। তার পাসপোর্ট থেকে বিভিন্ন দেশে অবস্থানের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। একই উদ্দেশ্যে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন জানিয়ে মনিরুল জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আসেন সামিউন। তার আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের উগ্র ধর্মীয় মানসিকতার কিছু তরুণের সঙ্গে সম্পর্ক হয় তার।

‘পিস’ টিভির ফেসবুক ফ্যান পেজের মাধ্যমে বাংলাদেশী নাগরিক আসিফ আদনান ও জুলকারনাইনের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। আসিফ আদনানের সঙ্গে কথা বলেই দেশে আসেন সামিউন। সামিউনের মাধ্যমে পরিচয় হয় কথিত জেএমবি সদস্য ফজলে এলাহি তানজিলের সঙ্গে। তাদের মাধ্যমে এই চক্রে সম্পৃক্ত হয় সেকান্দার আলী নকি, তাসনিম ওরফে নাহিদ, জাবের, আবু নায়না, আবদুল করিম ও আবদুল্লাহ। ঢাকায় তাদের নিয়ে বৈঠক করেন সামিউন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ঈদের পর সিরিয়ায় কথিত জিহাদে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল তাদের।

এদিকে বৃটিশ টেলিগ্রাফ সেদিন রাতে তাদের অনলাইনে বাংলাদেশে গ্রেপ্তারকৃত সামিউনকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। টেলিগ্রাফের দক্ষিণ এশীয় সম্পাদক ডিন নেলসন এবং ঢাকা থেকে ডেভিড বার্গম্যান এবং বিল গার্ডনার ও মুক্তাদির রশীদের যৌথ প্রতিবেদনের শুরুতেই ২৪ বছর বয়সী সামিউনকে একজন বৃটিশ মুসলিম কনভার্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, সন্দেহভাজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃটিশ জঙ্গি সামিউন রহমান ইসলাম ধর্মে আদৌ অনুরাগী ছিলেন না। কোন একটি ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে তিনি জেলে গিয়েছিলেন। আর সেখানে বসে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষালাভ করেন (দৈনিক মানবজমিন, ৩০ সেপ্টেম্বর)।

২০১৫ সালেও এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। চলতি বছর ১৯ জানুয়ারি আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যাত্রাবাড়ী ও খিলক্ষেত থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সাখাওয়াতুল কবির, আনোয়ার হোসেন বাতেন, রবিউল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম। গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার জানান, তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ ও জিহাদি লিফলেটও জব্দ করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, এই চারজনের মধ্যে সাখাওয়াত বাংলাদেশে আইএস এর ‘প্রধান সমন্বয়ক’। বাকি তিনজন তার সহযোগী। বাংলাদেশে সাখাওয়াতকে সংগঠনের সমন্বয়কের দায়িত্ব দিয়েছে। সাখাওয়াত পাকিস্তান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেছেন। শেখ নাজমুল আলম আরও জানান, আটক সাখাওয়াত তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বাংলাদেশ থেকে সদস্য সংগ্রহ করত (বিডিনিউজটুয়োন্টফোরডটকম)।

২৫ মে উত্তরা ও লালমাটিয়ায় আইএসের দুই সমন্বয়কারীকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আমিনুল ইসলাম কোকাকোলো কোম্পানির আইটি বিভাগের প্রধান ছিলেন। ডিএমপির সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) জানান, আমিনুল বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীনের (জেএমবি) আঞ্চলিক সমন্বয়কের পদে রয়েছেন। আইএসের প্রতিনিধি হিসেবে এ দেশে অর্থ, অস্ত্র ও সদস্য সংগ্রহ করে আসছিলেন তিনি। সাকিবও এ সংগঠনের সদস্য। দু’জন উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ।

তাদের লক্ষ্য ছিল, আইএসের নির্দেশিত তথাকথিত খিলাফত প্রতিষ্ঠা। এজন্য আমিনুল অর্থ, অস্ত্র ও বিস্পোরক দ্রব্য সংগ্রহ করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি আরও বলেন, ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক আইএসের কথিত জিহাদে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে আমিনুল ২০ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন। যারা ইরাক ও সিরিয়ার কথিত জিহাদে অংশ নিতে ইচ্ছুক ( দৈনিক সমকাল, ২৬ মে)।

৩১ মে পুলিশ আবদুল্লাহ আল গালিব নামের এক ব্যক্তিকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে দাবি করা হয় আইএসের একজন নিয়োগকর্তা। ডিবি জানায় গালিবকে বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। ৯ জুন ফিদা মুনতাসির নামের এক ব্যক্তিকে আটকের কথা জানায় পুলিশ। পুলিশ দাবি করে, মুনতাসির স্বীকার করেছেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে তিনি আইএসে নিয়োগ দেন। একই মাসের ২১ তারিখ পুলিশ দাবি করে ফাইয়াজ খান নামের এক আইএস কর্মী আটক হয়েছেন।

সর্বশেষ গত ৩ অক্টোবর ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ৩ ও পরদিন ৫ মোট ৮ জনকে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের সদস্য সন্দেহে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত আইএস সদস্য হিসেবে অন্তত ২৩ জনকে আটক করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তা দেশের গণমাধ্যমে গুরত্বের সাথে ছবিসহ প্রকাশিতও হয়েছে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেল্লা এবং ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। এরপর জঙ্গিগোষ্ঠি আইএস দুটি ঘটনারই দায় স্বীকার করেছে বলে খবর দেয় ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ’ নামের একটি জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গুরুত্বের সাথে প্রচার করে, দু’টি হত্যারই দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট। এর মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশ সফর বাতিল করে।

পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ সতর্কতা জারি করে এবং নিজ দেশের নাগরিকদের চলাফেরায় বিধি-নিষেধ আরোপ করে। বাংলাদেশ সফর বাতিল করেন পোশাক ক্রেতাদের একটি অংশ। বায়ার্স ফোরামের মিটিং স্থগিত হয়ে যায়। বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি দেশ কিছুদিন ধরেই সতর্ক বার্তা আপডেট করছে। এতে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে চলে আসে, পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে পড়ে।

পরে ঢাকায় গত ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার হোসনী দালানে মধ্যরাতে আশুরার তাজিয়া সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় দুইজন নিহত ও বহু আহত হন। আইএস এই হামলারও দায় স্বীকার করেছে বলে ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ’ দাবি করে। এর আগে এএসআই ইব্রাহিম হত্যাকান্ড ঘটে। ফলে দেশে ও বিদেশে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

সম্প্রতি টাইমস অফ ইন্ডিয়া দাবি করে, বাংলাদেশে দুই বিদেশি হত্যার সঙ্গে আইএস জড়িত নয়৷ সংবাদমাধ্যমটি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে এই দাবি করে।পরে সরকারের তরফ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা যৌথভাবে ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের সার্বিক পরিস্থিতি জানান৷ তাঁরা দুই বিদেশি হত্যা এবং জঙ্গি বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়।

সরকারের ভাষ্য, এসব ঘটনার সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতা বা দায় স্বীকারের দাবির কোনো ভিত্তি গোয়েন্দারা খুঁজে পায়নি। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সরকারকে চাপে ফেলতে পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত রিটা কাৎস পরিচালিত বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা সার্চ ফর ইন্টারনাশনাল টেরোরিস্ট এনসিটিজ (সাইট) বিদেশি কোনো গোয়েন্দা সংস্থার বেসরকারি মুখপাত্র হিসেবে এ সব প্রোপাগ্যান্ডা চালাচ্ছে।

জাতিসংঘ সম্মেলন থেকে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে একই কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

দেশে আইএস না থাকলে যাদের আইএস পরিচয়ে এত দিন আটক করা হয়েছে তাদের পরিচয় কি সাংবাদিকরা তা জানতে চাইলে মন্ত্রী জানান, এদের সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত অপরাধ পর্যালোচনা ত্রৈমাসিক সভায় মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকও অভিন্ন সুরে কথা বলেছেন।

তবে বাংলাদেশের জঙ্গি বিষয়ক গবেষক এবং মানবাধিকার কর্মী নূর খান জার্মানির বাংলা বিভাগ ডয়েটে ভেলেকে বলেন, বাংলাদেশে যে আইএস-এর তৎপরতা আছে, তা প্রমাণিত। বাংলাদেশের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা গত দেড় বছরে আইস সদস্য বলে অনেককে আটক করেছে। এছাড়া সংবাদমাধ্যমেও তারা এ সংক্রান্ত খবর, তথ্য এবং ফটোগ্রাফ প্রচার করেছে। এমনকি বাংলাদেশি নাগরিকদের সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগদানের তথ্যও আমরা জানি। সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে পুলিশের বক্তব্যসহ খবর প্রচার হয়েছে৷

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে জঙ্গিরা সক্রিয় এবং তাদের যে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আছে- তা আমরা অনেক আগে থেকেই লক্ষ্য করে আসছি৷ তারা ইসলামিক স্টেট, জেএমবি না হরকাতুল জিহাদ- তা মূখ্য নয়৷ প্রধান বিষয় হলো বাংলাদেশে জঙ্গিরা আছে এবং ভালোভাবেই আছে৷

যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জন কারবি জানান, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলায় আইএসের দায় স্বীকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে তার দেশ। হামলার পেছনে দায়ীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে দেশটি।

এদিকে বাংলাদেশে দুই বিদেশি হত্যা ও তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে বোমা হামলার ঘটনায় আইএস-এর দায় স্বীকারের তথ্য সঠিক দাবি করে সরকারকে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ।

মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘এসব হামলার ঘটনায় আইএস-এর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার তীব্রভাবে অস্বীকার করে আসছে। আর আইএস-এর দাবির বিষয়টি আড়ালে রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে সরকার এখন সাইটের সুনাম ক্ষুন্নের চেষ্টা করছে।’

সাইট আরও বলছে, যারা সতর্ক করছে তাদের বিরুদ্ধে না গিয়ে সত্যের মুখোমুখি হয়ে আসল শত্রুদের দিকে মনোযোগ দিলেই বাংলাদেশ সরকার বেশি সুফল পাবে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের অস্বীকার এবং সাইটের সুনাম নষ্টের চেষ্টায় বাস্তবতা বদলানো যাবে না। আর অনলাইনে জিহাদি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে সুনাম সাইট অর্জন করেছে, তা ‘নষ্টের চেষ্টাতেও’ কোনো ফল আসবে না। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফের তা নাক করে দিয়েছেন।

অনেক কিছুর উত্তর মিলবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ও সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর সর্বসা¤্রতিক বক্তব্যে। বাংলাদেশে নিরাপত্তা ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি বলেছেন, তারা কি আইএসের কথা বলে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করতে চায়।

চ্যানেল আইয়ে এক অনুষ্ঠানে ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তো বাংলাদেশের নাগরিক মারা যায়। তাহলে আমাদেরও তো উচিত সেখানে সতর্কতা জারি করা। যুক্তরাজ্যেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। কিছু দূতাবাসকে সতর্ক করে দেয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন এ সাংবাদিক নেতা।

বাংলাদেশে আইএসের আবিষ্কারের পর এক বছর যেতে না যেতেই এখন এক অসহ্যকর বিব্রতকর পরিস্থিতিতে দেশ ও সরকার। আইএস নিয়ে আইনশৃংখলাবাহিনীর এমন ‘অতি উৎসাহী’ ভূমিকায় বিব্রত সরকার। এইসব ঘটনায় দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র চলছে এ কথাটি প্রতিদিনই শোনা যায়। দেশী ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে বিএনপি-জামায়াতের নাম বলা হলেও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের পরিচয় গোপনই থেকে যাচ্ছে।

সহিংসতা ও প্রাণহানি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ‘কম গণতন্ত্র বেশি উন্নয়ন’র যে স্লোগান ক্ষমতাসীনরা দিচ্ছেন তাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাধারণ মানুষ হত্যার রাজনীতি দেখতে চায় না, নির্যাতনের রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা আইনের শাসন দেখতে চায়, সুশাসন দেখতে চায়। রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করতে পারে জঙ্গিরা।

তাই চোরাগলি থেকে রাজনীতিকে আবার রাজপথের ফিরিয়ে আনতে হবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। জনগনকে রাজনীতির ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিতে হবে। রাজনৈতিককর্মীদের মিছিলে-স্লোগানে রাজপথ মুখরিত হলে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তাতে ষড়যন্ত্র বন্ধ হবে, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাও সু সংহত হবে। দেশের এই দুর্যোগময় পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনগণের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন। আজ হোক, কাল হোক জনগণের কাছে তো যেতেই হবে।

লেখক: সাদি মাহফুকবি ও সাংবাদিক

ই-মেইলঃ sadimahfuz@gmail.com




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026