রাত পোহালেই শোনা যাচ্ছে মানুষ হত্যার খবর। একদিকে আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হচ্ছে লেখক-বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।অন্যদিকে মানুষ মরছে বন্দুকযুদ্ধে।
এই মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। এটা কোনোমতেই যেন থামছে না।আততায়ীর হাতে খুন যতটা আমাদের উদ্বিগ্ন করে বন্দুকযুদ্ধে মরলে কিন্তু তা করে না।আমরা ধরেই নিয়েছি, এভাবেই রাষ্ট্র মারবে আর মানুষ মরবে!কি চমৎকার! কেউ বন্দুকযুদ্ধে মরলে আমাদের সমাজকে যে উদ্বিগ্ন করে না, তা গেল কয়েক বছরের চিত্র থেকেই প্রমাণিত।
অপরদিকে সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকটা খুনের ঘটনা সমাজকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। ডান-বাম, উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমপন্থী সবাই একযোগে সোচ্চার হয়েছি।অবশ্য এমনটি হবারই কথা। কেননা, এ থেকে রেহাই পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরাও।আর খুনীরা কথিত উগ্র জঙ্গী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে দায় স্বীকার করে থাকছে ধরা-ছুঁয়ার বাইরে।রাষ্ট্র ও সরকার নির্বিকার।এতে সহজেই অনুমেয় পরিস্থিতি কতটা নাজুক।
আর এসব কেন হচ্ছে?
এর জবাবে কিছু লীগ আর বামপন্থী ছাড়া আর সবাই একমত যে বিচারহীনতার কারণেই এমনটি হচ্ছে।আরেকটু নিগঢ়ে গেলে বলতে হয় গণতন্ত্রহীনতার কারণে। অবশ্য এই সংস্কৃতি গোড়া থেকেই শুরু।কেননা, ৯ মাস যুদ্ধে বহু রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর সমগ্র জাতির প্রত্যাশা ছিল একটি জাতীয় সরকারের, জনগণের সেই আকাংখার বাস্তবায়ন না হয়ে হয় দলীয় সরকার।
শুধু তাই নয়, ৭৩’র বিতর্কিত নির্বাচনেও একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা আর নেতাদের ভূল সিদ্ধান্তে সারা দেশে শুরু হয় অরাজক পরিস্থিতি, শুরু হয় সরকারের কঠোর সমালোচনা।তাতে সরকার এবং সমালোচকদের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হতে থাকে।শুধু তা নয়, পরবর্তীতে ৭৫’ এ কায়েম হয় বাকশাল।এসব কথা সবার জানা ফলে সেদিকে যাব না।ওই সময়ে (১৯৭২-৭৫)৩০-৩৬হাজার বিরোধী নেতাকর্মী হত্যার করা হয়।
পরবর্তীতে এর পরিণতিতে কী ঘটে তা অবশ্য সবারই জানা। এবার আসি বর্তমানের কথায়- সাম্প্রতিক ধারাবাহিক খুনের ঘটনা সমাজকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।এটা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক বিরাট অশনিসংকেত। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? এটা কী কোনোভাবেই থামবে না?
আমরা কী সবাই নীরবেই সহ্য করে যাবো?
না, এই সভ্য সমাজে এরূপ অসভ্যতা চলতে পারে না, যে কোনো মূল্যে তা থামাতেই হবে। আর এটা সত্য যে- এই খুনের মহোৎসব মূলত: বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই আমাদের সমাজে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা দিতে উদাসীন।গত কয়েক বছরে সংঘটিত কোনটিরই বিচার হয়নি।এমন কি খুনিদের ধরার ব্যাপারে সে ধরনের আন্তরিকতাও দৃশ্যত হয়নি। প্রতিটি ঘটনার পরপরই সরকার বিএনপি জামায়াতকে জঙ্গি আখ্যায়িত করে ব্যাপক প্রচারণা চালালেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উত্থাপন করে তা প্রমাণ করতেও সক্ষম হয়নি।
এরফলে দেশে এই সঙ্কট এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে।বর্তমানে দেশে এমন এক আতঙ্ক বিরাজ করছে যে, কারো নিরাপত্তা নেই।শুধু লেখকই-প্রকাশকেরাই নয়, হামলার শিকার হচ্ছেন বিদেশিসহ বিভিন্ন পেশার নাগরিকরাও। পুলিশ সদস্যরাও। কোনও ঘটনারই তদন্তে অগ্রগতি নেই। ফলে পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর তা সহজেই অনুমেয়।
কিন্তু এরপরও ক্ষমতাসীনদের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়নি। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যদের বক্তব্যে সবাইকে নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।কেননা, রাষ্ট্র যে নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ তা নোভাবেই স্বীকার করছে না।বরং তদন্ত ছাড়াই এসব জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কাজ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
শাসকগোষ্ঠী যাই বলুক না কেন, রাষ্ট্রের শাসন, আইন ও বিচার বিভাগ ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।সাম্প্রতিককালে প্রকাশ্যে হত্যা-খুন, নির্যাতনের মহোৎসব, গুম-অপহরণ, বিরোধীদের দমন নিপীড়ন, নারী ও শিশু নির্যাতন, দুর্নীতি সন্ত্রাসসহ নানা বিষয় এদেশের সংখ্যারিষ্ঠ জনগণের মনে রাষ্ট্র-সমাজ ও আইনের শাসন নিয়ে বধ্যমূল ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দিয়েছে।
ফলে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র আমাদের সমাজে কতটুকু আছে তা মোটামুটি সব নাগরিকই অবগত ও ভুক্তভোগী। ফলে ব্যর্থতাকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ অপচেষ্টা করা হলে তা আরো বিপরীত হবে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় নেতৃবৃন্দকে হানাহানি বন্ধ করে ঐক্যের মোহনায় দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সংবিধান ও আইনের বিধি বিধান বলে রাষ্ট্র পরিচালনার পথে হাঁটতে হবে।রুখে দাঁড়াতে হবে সন্ত্রাস, অগণতান্ত্রিক চর্চা ও দুর্নীতি-অনিয়ম। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবেই সম্ভব বর্তমান পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ লাভ।
সবশেষে, যে যাই বলি না কেন।দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন না থাকলে অবধারিতভাবে যা হবার তাই হচ্ছে। আরো নৈরাজ্য ও অরাজকতা দেখা দিতে বাধ্য।তাই একথা অনেকটাই সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়- যতদিন দেশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনের শাসনের দিকে না ফিরবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বিচারবহির্ভুত হত্যা বন্ধ না করবে ততদিন
এসব চলতেই থাকবে। বরং তা আরো অসহনীয় হতে পারে।ফলে সরকারের এখন বড় চ্যালেঞ্জ দেশ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা। না হলে জনবিস্ফোরণ অপেক্ষামাণ, তা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না কোনোমতেই।
লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com