গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন ছিল। ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই বলেছেন, খালেদা জিয়া মামলা মোকাবিলা করার ভয়ে লন্ডন গেছেন, শিগগির ফিরছেন না। অন্যদিকে, বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রশ্ন করলেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যেত না।
কেউ বলতেন, তাঁর ফেরার বিষয়ে কিছু জানেন না। কেউ বলতেন, চিকিৎসা শেষ হলেই ফিরে আসবেন। ইতিমধ্যে কয়েক দফা তাঁর দেশে ফেরার তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ত
বে গত বৃহস্পতিবার বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলো, খালেদা জিয়া শনিবার বিকেলে দেশে ফিরছেন। দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন সাংবাদিকদের আরও জানান, দেশের ক্রান্তিকালে এবং বর্তমান সংকটের সময়ে তিনি লন্ডনে চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরে আসছেন।
বিএনপি নেত্রী লন্ডনে যাওয়ার পর দেশে দুই বিদেশি হত্যাসহ অনেকগুলো অঘটন ঘটেছে। আর সরকার প্রায় প্রতিটি অঘটনের সঙ্গে খালেদার ‘হাত’ আবিষ্কার করেছে। এমনকি সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ-ও বলা হয়েছে যে দেশে আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে খালেদা জিয়া বিদেশে বসে মানুষ হত্যা করে চলেছেন।
কিন্তু এর পক্ষে মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তারা কোনো তথ্য–প্রমাণ দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। মাঝখানে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যায় ‘বড় ভাইয়ের’ নাম শোনা গিয়েছিল। কিন্তু ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যায় যে বড় ভাইয়ের নাম এসেছে, তিনি এত ছোট যে রাজনৈতিক মহল সেটি আমলেই নিচ্ছে না এবং সরকারও এটি নিয়ে আর তেমন উচ্চবাচ্য করছে না। যেকোনো মামলা তদন্তের আগেই কাউকে দোষী চিহ্নিত করা হলে সেই মামলার ভবিষ্যৎ যে খুবই অন্ধকার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
জাপানি নাগরিক হত্যার দায়ে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ের দুই বিএনপি কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন পুঁচকে সন্ত্রাসীকে ধরে বলেছে, এরাই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। টেলিভিশনে তঁাদের ছবিও দেখানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই তিনজনের একজন যুবদল ও একজন ছাত্রলীগের কর্মী এবং অন্যজন পেশাদার মাস্তান। বিএনপি তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করার দাবি করেছে। অর্থাৎ এখানেও জুতসই কোনো ‘বড় ভাই’ খুঁজে পায়নি সরকার।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতা যত তীব্র হোক না কেন, স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই মিলেমিশে তাদের চাঁদাবাজি, দখলবাজি করতে দেখা যায়। গত বুধবারের প্রথম আলোয় চট্টগ্রাম থেকে একরামুল হকের পাঠানো খবর ছিল: চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রলীগ নেতা নুরুল হক ওরফে মনির পেট্রলবোমা হামলা মামলারও আসামি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরদিন পলিটেকনিক এলাকায় একটি লেগুনা গাড়িতে পেট্রলবোমা হামলায় চালক নিহত হন। এ ছাড়া নুরুল হকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিরও একাধিক মামলা রয়েছে।
এত দিন বলা হতো, পেট্রলবোমা কেবল জামায়াত-বিএনপির নেতা-কর্মীরাই মেরেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও তাঁদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছেন। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় সম্প্রতি একজন রাজনৈতিক কর্মীর নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটল, সেখানেও বিএনপি বা জামায়াতের কেউ ছিলেন না। বিরোধটা ছিল ক্ষমতাসীন জোটের বড় শরিক আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছোট শরিক জাসদের।
সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ‘এই সংকটের সময়ে’ বিএনপি নেত্রীর দেশে ফিরে আসা নিশ্চয়ই স্বস্তিদায়ক ঘটনা। কিন্তু তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলীয় নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে, সেই ভরসা কম। তাঁর লন্ডনে যাওয়ার আগেই বিএনপি জাতীয় ঐক্যের কথা বললেও সর্বদলীয় বৈঠকের বার্তাটি দেশবাসী জেনেছে খালেদা জিয়ার লন্ডনে যাওয়ার পর। অনেকে ভেবেছিলেন, সত্যিই বিএনপি তার রাজনৈতিক পথ ও মত পরিবর্তন করতে পারে।
বিএনপির শুভানুধ্যায়ী তো বটেই, দলের অনেক ডাকসাইটে নেতাও ব্যক্তিগত আলোচনায় বলে আসছিলেন, বিএনপিকে বাস্তবতা বুঝতে হবে। প্রয়োজনে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতে হবে। কেননা, একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিষ্ঠিত বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দী হতে পারে না।
এমনকি কৌশলগতভাবে তারেক রহমান কিছুদিন রাজনৈতিকভাবে ছুটিতে থাকবেন বলেও আভাস দিয়েছিলেন কেউ কেউ। বাইরের আস্থা হারানো বন্ধুদের আস্থা অর্জনের এটাই নাকি উত্তম পথ।
বিএনপি নেত্রী লন্ডনে থাকতে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন, একটি জাতীয় ঐক্য, অন্যটি সর্বদলীয় বৈঠক। আমরা ধরে নিতে পারি যে জাতীয় ঐক্যের জন্যই সর্বদলীয় বৈঠকের কথা বলেছেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে সেই বৈঠক সরাসরি নাকচ করে দেওয়ার কোনো যুক্তি ছিল না বলে মনে করি।
বৈঠকে যদি তাঁরা একমত না-ও হতে পারেন; অন্তত দ্বিমত করার জন্যও বৈঠক করা যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে তো পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে যখন দেখা-সাক্ষাৎ হয়, তখন নিশ্চয়ই তাঁরা চুপচাপ থাকেন না, কথাবার্তা বলেন।
কিন্তু গত বৃহস্পতিবার বিএনপি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সম্পর্কে যেভাবে সাফাই গাইল, তাতে মনে হয় না সর্বদলীয় বৈঠক কিংবা জাতীয় ঐক্য গড়ার ন্যূনতম ইচ্ছা তাদের আছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপন বলেছেন, ‘সাকা চৌধুরী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পারসিকিউশনের শিকার হয়েছেন।
তিনি একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক ছিলেন, তাঁর কমিটমেন্ট ছিল। গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। সাকা চৌধুরী অপরাধী নন, তিনি অপরাধ করেননি। যে সময়ে অপরাধ সংঘটনের কথা বলা হয়েছে, সে সময়ে তিনি দেশে ছিলেন না। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন।’
সাকা চৌধুরী একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক। কিন্তু রিপন সাহেবের নিশ্চয়ই মনে আছে সাদেক হোসেন খোকার বক্তব্যের জবাবে সাকা চৌধুরী কী বলেছিলেন। ‘লেজ কুকুর নাড়াচ্ছে।’ এটি যদি তাঁর নেত্রী সম্পর্কে একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকের ভাষা হয় তাহলে আমরা নাচার।
তিনি দাবি করছেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাকি বিশাল অবদান আছে। তিনি কোন দেশের স্বাধীনতায় অবদান রেখেছেন, নিশ্চয়ই বাংলাদেশ নয়। বিএনপি নেতার এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করতে পারতেন জিয়াউর রহমান নিজে। কেননা, তিনি একাত্তরের মার্চের আগে ও পরে চট্টগ্রামে ছিলেন।
দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কিংবা জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবেও তিনি বলতে পারতেন, চট্টগ্রামে কারা স্বাধীনতার পক্ষে, কারা বিরুদ্ধে ছিলেন। জিয়া নেই। কিন্তু তাঁর সহযোগী রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম আছেন। আছেন চট্টগ্রামের অনেক মুক্তিযোদ্ধা, যাঁরা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গুডহিলে অত্যাচার–নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ কারণে ১৯ সেপ্টেম্বর তাঁর গাড়িতে আক্রমণও করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ ছাড়া ১৩ এপ্রিল নূতনচন্দ্র সিংহকে হত্যায় তিনিই যে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার সাক্ষ্য–প্রমাণও আদালতে পেশ করা হয়েছে।
বিএনপি নেতা যাঁকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে অবদান আছে বলে দাবি করেছেন, তাঁর সম্পর্কে মাননীয় প্রধান বিচারপতির বক্তব্য উদ্ধৃত করছি। তিনি বলেছেন, ‘সার্টিফিকেটে ১৯ সংখ্যাটি বড় আর ৭১ সংখ্যাটি ছোট। ট্রাইব্যুনালে এর আগে দেওয়া ডকুমেন্টের সঙ্গে এগুলোর মিল নেই।
একটা মিথ্যা ধামাচাপা দিতে গিয়ে শতটি মিথ্যা কথা বলেছেন তিনি।…যখন এই বিচার শুরু হলো, তখন পাকিস্তান এই বিচারের বিরোধিতা করেছে। তারা এই বিচারের বিরুদ্ধে রেজল্যুশন পাস করেছে, সেখান থেকে যেসব নথি আসছে, প্রতিটিতে আমাদের সিরিয়াস ডাউট আছে।’ (প্রথম আলো, ১৯ নভেম্বর ২০১৫)
এ ছাড়া সাকা চৌধুরীর পক্ষ থেকে যে সনদ ও প্রশংসাপত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ধরনের লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেটে সেশন লেখা ১৯৭১, আর প্রশংসাপত্রে লেখা ১৯৭০-৭১। প্রশংসাপত্র ও সনদে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের বানান দুভাবে লেখা।
ফলে পুরো বিষয়টিই জালিয়াতি বলে ধরে নেওয়া যায়। আসলে সাকা চৌধুরীর উদ্দেশ্য প্রমাণ করা যে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি দেশে ছিলেন না। তাহলে তিনি গুডহিলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আহত হলেন কী করে? নূতনচন্দ্র সিংহের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাদের কে নিয়ে গেছেন?
এ রকম একজন পাকিস্তানপ্রেমী নেতাকে বিএনপি কীভাবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে অবদান আছে দাবি করে, সেটাই প্রশ্ন। তিনি যে দেশটির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে অবদান রেখেছেন, সেই দেশটি বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তান। পাকিস্তানের কোনো দল এই দাবি করলে আমরা আশ্চর্য হতাম না।
কিন্তু বাংলাদেশের একটি দল, যার প্রতিষ্ঠাতা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা একজন সেক্টর কমান্ডার, সেই দলটি কীভাবে এই দাবি করল? এরপরও বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান বদলাবে যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের সঙ্গে সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করছি।
বিএনপির ভাষায়, দেশের সংকট মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৈঠক বা সংলাপ হওয়া উচিত। আওয়ামী লীগের নেতারা যেভাবে সংলাপ বা বৈঠকের প্রস্তাবকে এককথায় নাকচ করে দিয়েছেন, সেটি কোনোভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। গণতন্ত্র মানলে সংলাপ বৈঠক হতেই হবে। তবে তার আগে দুটি প্রশ্নে এক হতে হবে, যুদ্ধাপরাধীকে সমর্থন করা যাবে না। ধর্মাশ্রয়ী দলের সংস্রব ছাড়তে হবে। বিএনপি নিজেকে বদলাতে পারবে কি?
লেখক: সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।