সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৮

বিশ্ব ভাবনায় ফাঁসি ও মানবাধিকার

বিশ্ব ভাবনায় ফাঁসি ও মানবাধিকার

সেই ১৯৯৩ সালের কথা, সবেমাত্র এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসেছি।তখনকার বহুলআলোচিত ঘটনা শারমিন রীমা হত্যায় মুনির হোসেনের ফাঁসি।সব আইনী প্রক্রিয়া শেষে হত্যাকান্ডের চার বছর তিন মাসের মাথায় ১৯৯৩ সালের ২৭ জুলাই মুনিরের ফাঁসি কার্যকর হয়।

ঘটনাটি এতই আলোড়িত হয় যে, শিশু থেকে ৮০ বছরের বুড়াবুড়ির মুখেও এই ফাঁসির কথা শোনা যেত।মনিরকে নিয়ে প্রতিদিনই নানা ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হত।এতে অনেক পত্রপত্রিকার কাটতিও বেড়ে গিয়েছিল।

এরপর আরো বেশ কয়েকটি ফাঁসি কার্যকর হয়।যেমনটি যুবলীগ নেতা খালেদ হোসেনকে হত্যায় ২০০৪ সালের ১০ মে ফাঁসি হয় এরশাদ শিকদারের।২০০৭ সালের মার্চ ৩০ শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ ছয় শীর্ষ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়।

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি কার্যকর হয় বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনি ফারুক রহমান ও সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ ও এ কে এম মহিউদ্দিনের ফাঁসি।এর আগে অবশ্য ১৯৮৭ সালে সালেহাকে হত্যার দায়ে ডা. ইকবালের ফাঁসিও কম আলোচিত ছিল না।এসব ফাঁসির ঘটনার পূর্বাপর পরিস্থিতি ও আলোচনা-সমালোচনা কমবেশি স্মরণে আছে।

তবে যতদূর স্মরণে পড়ে তাতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় কার্যকরের ন্যায় ওই সব ফাঁসির আলোচনার ব্যাপকতা এতটা ছিল না।ওই ফাঁসির পক্ষে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেলেও বিপক্ষে কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি।দণ্ডপ্রাপ্ত পরিবারের সদস্যদেরও নয়।এমনকি আন্তর্জাতিক মহল থেকেও তেমন জোরালো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর তেমনটি হয়নি।ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

যেমনি দণ্ডপ্রাপ্তদের পরিবার, প্রতিপক্ষ বিরোধী জোট-দলের বিচারপ্রক্রিয়া ও দণ্ডকার্যকর নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে।আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে মানবাধিকারের বিষয়টি সামনে এনে দুই নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায় স্থগিতের আহবান জানানো হলেও তা কার্যকরণ হয়নি।ফলে গেল দুই দিন ধরে পক্ষ-বিপক্ষে চলছে নানা বিতর্ক।তাই আজকে এ বিষয়ে আলোচনা বেশ প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করছি।

মানবতাবিরোধী অপরাধ ছাড়াও বাংলাদেশে যেসব আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে—বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন, ২০০০, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০২ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪।এসব আইনে বর্তমানে বাংলাদেশের কারাগারে এক হাজারেরও বেশি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন৷শুধু বিডিআর বিদ্রোহ মামলার রায়েই ১৫৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।যদিও এক মামলায় এত বেশি সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ঘটনা বিশ্বে নজিরবিহীন।

অবশ্য বহুকাল আগে থেকেই বিশ্বে মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালু থাকলেও বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে এর বিপক্ষে জোরালো যুক্তিতর্ক উঠতে থাকে।বিশেষত মৃত্যুদণ্ড বিলোপের জন্য বিভিন্ন দেশে প্রভাবশালী কিছু সংগঠন গড়ে ওঠে।যেমন- বৃটেনে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, যাদের প্রধান লক্ষ্যই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ।

কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেও যুক্তি কম নয়।মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে যুক্তি হলো-এর ফলে অপরাধের সংখ্যা কমে যায়, এটা পুলিশ ও সরকারি উকিলের সহায়ক হয়।যেমনটি বলা যায়- মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করে বিনিময়ে জীবন রক্ষার ডিল করতে পারে, দণ্ডিত অপরাধী আর কোনো দিনই যে অপরাধের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে না সেটা মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করে, শিশু হত্যা, সিরিয়াল খুন এবং নির্যাতনমূলক হত্যার মতো নৃশংস অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডই হচ্ছে ন্যায়সঙ্গত শাস্তি।

তবে মৃত্যুদণ্ড বিরোধীরা যুক্তি দেন যে, হত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সবাই যে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড চান, তা নয়।যেমন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর হত্যাকারীকে সোনিয়া গান্ধী মাফ করে দিয়েছিলেন।সাধারণত সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা ও বিত্তশালীরা বিভিন্নভাবে মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যায়।কিন্তু সংখ্যালঘিষ্ঠ ও গরীবরা মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়।মৃত্যুদণ্ড সহিংসতার কালচারকে উৎসাহিত করে।ফলে দেশে সহিংসতা বেড়ে যায়।মৃত্যুদণ্ড মানুষের মৌলিক অধিকার লংঘন করে।

মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার পেছনে আরো যুক্তির মধ্যে রয়েছে-১।নানা স্তরে সাক্ষ্য, জিজ্ঞাসাবাদ, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পরই একজনকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়।কিন্তু এরপরও প্রশ্ন থেকে যায় সে বিচারও কি ভুলত্রুটিমুক্ত? প্রশ্নাতীতভাবে এর উত্তর হবে, না।তাহলে নির্দোষ ব্যক্তির ফাঁসি হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকে। তাহলে যার জীবন নেয়া হলো, তার জীবন কি ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব?

২। দোষী ব্যক্তি যেন আর অপরাধ করতে না পারে সেজন্য তাকে শাস্তি দেয়া হয়। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তার দণ্ডও হয়ে থাকে।কিন্তু দোষী ব্যক্তিকে যদি মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়, তাহলে সে তো আর অপরাধ করতে পারছে না।তাহলে কেন মৃত্যুদণ্ড?

৩। খুনের শাস্তি আরেকটি ‘খুন’ দিয়ে হতে পারে না।এটাকে কোনোভাবেই ন্যায়বিচার বলা যায় না।প্রতিশোধ বলা যেতে পারে।

৪। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সংবিধানেও জীবনের অধিকারের কথা বলা হয়েছে।তার সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখা সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বর্তমান বিশ্বে ৫৮টি দেশে মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত।৯৮টি রাষ্ট্র আইন করে এবং ৩৫টি রাষ্ট্র আইন না করেও দীর্ঘদিন থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেনা। তবে উদ্বেগজনক হলো—বিশ্বে যত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, তার ৯০ শতাংশই এশিয়ায়।এমন কি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সুদান, ইরান এবং সৌদি আরবে ১৮ বছরের কম বয়সীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।কী ভয়ঙ্কর!চীনে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

২০১২ সালে এ সংখ্যা চার হাজারেরও অধিক।প্রাচীন এবং মধ্যযুগে প্রায় সব দেশেই প্রকাশ্যেই ফাঁসি দেয়ার রীতি থাকলেও বর্তমানে ইরান, সৌদি আরব এবং সোমালিয়াসহ বেশ কিছু রাষ্ট্র ছাড়া অন্য সব দেশে তা বন্ধ করা হয়েছে।

এটা সবাই জানি, সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেন তখনকার আদালত।অপরাধ- তিনি যুবসমাজকে ধ্বংস করছেন।তখন তার বয়স ৬৩।তিনি যদি আরো দীর্ঘ জীবন পেতেন, তাহলে পৃথিবী আরো কত কী পেত, সেটা ভাবাই যায় না!মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে এভাবে কত ক্ষতি হয়ে গেল পৃথিবীর, কে তার হিসাব রাখে?

একবিংশ শতাব্দীতে এ ধরনের অপরাধের জন্য আর মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় না সত্যি, কিন্তু অন্যান্য অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেয়ার হার এখনো অনেক বেশি।মূলত হত্যা, নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ধর্ষণ, মাদক পাচার এ ধরনের অপরাধের কারণেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়ে থাকে।

আমরা জানি, মানবসমাজের আদিযুগ থেকেই মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত ছিল।তুচ্ছ কিছু চুরির কারণেও ইংল্যান্ডের মতো দেশে বছরে শত শত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো।অষ্টম হেনরির সময় ৭২ হাজার চোরকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল।সেদিন আর নেই।মানুষ সভ্য হয়েছে।এ সভ্যতার আলোয় পৃথিবীর অনেক দেশেই মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত হচ্ছে।যেসব দেশে এখনো হয়নি, সেখানেও মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার জন্য আন্দোলন চলছে।যদিও বাংলাদেশে এমনটি দেখা যাচ্ছে না।

তার একটি কারণ হতে পারে, এখানকার মানবাধিকার ব্যাপারীদের সাহস নেই, না হয়-তারা পক্ষপাত দোষেদুষ্ট।অন্যদিকে এখানে আইনের শাসন তেমন নেই এবং সব অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা যায় না।অপরাধী ব্যক্তি যদি প্রভাবশালী-বিত্তশালী হয়ে থাকে, তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া আরো কঠিন।ফলে সেখানে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করা খুব কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে দেশীয় মানবাধিকার ব্যাপারীরা নীরব। মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তকরণের কথা কোনো মানবাধিকার সংস্থা কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে বলছে, তেমনটি দেখা যায় না।তাই বলে বাংলার সব বনী আদম মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে, তা ঠিক নয়।বাংলাদেশে যারা মৃত্যুদণ্ডবিরোধী আন্দোলন করবেন ভাবছেন, তাদের অনুপ্রেরণা হতে পারে ইংল্যান্ড।

প্রায় দেড়শ বছর আন্দোলনের পর ১৯৬৫ সালে Death Penalty (abolition) Act-এর মাধ্যমেই ব্রিটেন থেকে বিলোপ হয় মৃত্যুদণ্ড।ভেনিজুয়েলা প্রথম দেশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করে ১৮৬৩ সালে।প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে পর্তুগাল বিলুপ্ত করে ১৮৬৭ সালে।কানাডা বিলুপ্ত করে ১৯৭৬ সালে, ফ্রান্স ১৯৮১ সালে, অস্ট্রেলিয়া ১৯৭৩ সালে।

অবশ্য বিশ্বব্যাপী ৭০টি মানবাধিকার সংস্থা সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে কাজ করছে।লন্ডন ভিত্তিক এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্যতম।মৃত্যুদণ্ড রহিত করতে সর্বদা সোচ্চার।বাংলাদেশে অব্যাহত মৃত্যুদণ্ডাদেশে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে সংস্থাটি।একই সাথে ফাঁসির ওপর স্থগিতাদেশ আরোপের জোর আহ্বান জানিয়ে আসছে সংস্থাটি।

এ্যামনেস্টির দেয়া তথ্য মতে, “এখন পর্যন্ত ১৪০টি দেশ মৃত্যুদণ্ড আইনগতভাবে কিংবা প্রথাগতভাবে বাতিল করেছে। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৭৩টি সদস্য রাষ্ট্র মৃত্যুদন্ডমুক্ত ছিল।উপরোল্লেখিত আলোচনা ও তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

এক্ষেত্রে বলা যায়, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪০টি দেশ মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।ফলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করার যে দাবি উঠেছে তা সরকারের বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখা উচিত।

শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকেই সামনে রেখে নয়, সার্বিকভাবেই এটি বিবেচনার দাবি রাখে।সবশেষে বলবো, মানবাধিকার সমুন্নত রাখাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।এক্ষেত্রে কোন রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে যেমনটি সেখানকার শাসকরা সমালোচনার সম্মুখীন হন, তেমনি রাষ্ট্রকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে।ফলে যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকুন না কেন, তাদেরকে মানবাধিকার সমুন্নত রেখেই হাঁটতে হবে।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান:, গবেষক ও কলাম লেখক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026