বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ০৯:২৪

নয়া স্পিকারের ময়না তদন্ত

নয়া স্পিকারের ময়না তদন্ত

এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

কাজী সোহাগ: আশঙ্কা আর নিরাশার মধ্যেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে তাকে নির্বাচন করা হয়। শুরুতে দলের অনেকে তার বিষয়ে দ্বিমত জানিয়েছিলেন। সিনিয়র থেকে শুরু করে জুনিয়র এমপিরাও বলেছিলেন, এটা হবে ভুল সিদ্ধান্ত। স্পিকার হওয়ার জন্য প্রয়োজন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। কোনটিই তার নেই। শেষ পর্যন্ত অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়েই ৩০শে এপ্রিল থেকে শিরিন শারমিন চৌধুরী বসেন স্পিকার পদের হট চেয়ারে। দেশের ইতিহাসের প্রথম নারী ও ১৭তম স্পিকার হিসেবে ৩রা জুন থেকে পরিচালনা করেন পুরো একটি বাজেট অধিবেশন। এ সময় মোকাবিলা করেছেন প্রধান বিরোধী দলকে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করেছেন সরকারদলীয় এমপিদেরও। ৮০ ঘণ্টারও বেশি হট চেয়ারে বসে দায়িত্ব পালন করেছেন ২৪ দিন। এর মধ্যে ২০৬ জন এমপির বক্তব্য শুনেছেন ৬১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। পরিচালনা করেছেন ১০টি আইন পাসের কার্যক্রম। পাশাপাশি কার্যপ্রণালী-বিধির ৭১ বিধিতে ২১৬টি নোটিশের মধ্যে গ্রহণ করেছেন ৯টি। এদিকে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ এডভোকেটের বিদেশ যাওয়ার কারণে দায়িত্ব নেয়ার ৬ দিনের মধ্যে পেয়ে যান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব। সব মিলিয়ে স্পিকারের সার্বিক পারফরমেন্সে আপাতত খুশি সরকারি দলের এমপিরা। তারা এখন টেনশনমুক্ত বলে জানিয়েছেন। আবার অনেকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরিশীলিত, জ্ঞানী আর ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন স্পিকার পেতে যাচ্ছেন বলে উচ্চাশা প্রকাশ করেছেন। একই প্রতিক্রিয়া মহাজোটের শরিক দলের এমপিদেরও। তবে খুশি নয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় বিরোধী জোট। ড. শিরিন শারমিনের ভূমিকায় হতাশ তারা। তাই তীব্র ও কঠোর সমালোচনা করেছেন স্পিকারের। তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, তিনি এখনও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেননি। সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের প্রমাণ রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রীর চোখের ইশারায় ভূমিকা পালন করেছেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আগামীকাল স্পিকারের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে। সেখানে দলের অবস্থান স্পষ্ট করা হবে। দলের অপর এমপি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন স্পিকারের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি ভাল রিডিং পড়তে পারেন। সরকারি দলের পক্ষ থেকে সব কিছু রেডি করে দেয়া হয়, আর উনি দক্ষতার সঙ্গে রিডিং পড়ে যান। সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইশারা পেয়ে। আইন পাসের সময় বিরোধী দলের আনা সংশোধনীর ওপর আলোচনার সুযোগ না দিয়ে গিলোটিন করে দেন। এতে তিনি নিরপেক্ষতার তকমা হারিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি দলের ‘একজন’ হিসেবে স্পিকার সফলতা দেখিয়েছেন। অপরদিকে সরকারদলীয় চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ বলেন, বিরোধী দলকে ভালভাবে মোকাবিলা করে স্পিকার তার দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশবাসী দেখেছে তার যোগ্যতা ও ধৈর্য। তিনি বলেন, বিরোধী দলের এমপিদের অবাধে কথা বলার সুযোগ  দেয়া হয়েছে। অতীতে এ ধরনের ঘটনা খুব কমই দেখা গেছে। এরপরও বিরোধী দল যদি স্পিকারের সমালোচনা করেন কিংবা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাহলে তা হবে দুঃখজনক। আসলে বিরোধী দল আসমানের তারাও গুনতে পারে। নরসিংদী থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় এমপি জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন বলেন, শুরুতে স্পিকারকে নিয়ে আশঙ্কা ও চিন্তিত ছিলাম। পারবেন কি পারবেন না এ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। তবে ২৪ দিনের পারফরমেন্সে তিনি আমাদের এসব আশঙ্কা দূর করেছেন। মেধা, প্রজ্ঞা আর যোগ্যতা দিয়ে আশাতীত সাফল্য দেখিয়েছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন বলেন, স্পিকার নতুন হলেও দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন। যোগ্যতা, মেধা ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে সংসদে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো বিরোধী দলকে সংসদে রাখা। সেটা তিনি ভালভাবেই পেরেছেন। পাশাপাশি বিরোধী দলীয় নেতাসহ সিনিয়র এমপিদের যথাযথ সম্মানের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন। কিছুটা সমালোচনা করে রাশেদ খান মেনন বলেন, তবে সংসদে অশালীন ভাষা ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি স্পিকার। প্রায় একই মন্তব্য জাতীয় পার্টি দলীয় এমপি মুজিবুল হক চুন্নুর। তিনি বলেন, নতুন হিসেবে স্পিকার ভাল করেছেন। তবে এমপিদের অশালীন ভাষা ব্যবহার বন্ধে আরও কঠোর হওয়ার প্রয়োজন ছিল। যদিও তিনি কয়েক নারী এমপি’র মাইক বেশ কয়েকবার বন্ধ করেছেন, পরক্ষণে আবার তাদের মাইক দিয়েছেন। সবশেষে কার্যপ্রণালী বিধির ওপর আনা দু’টি সংশোধনী নোটিশ প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে তা স্থগিত করাটা ঠিক হয়নি। তিনি বিধিমতে তা উপস্থাপন করে কমিটিতে পাঠিয়ে দিতে পারতেন। ওই দিনের ভূমিকা নিয়ে আমার মনে হয় প্রশ্ন থেকেই যাবে। তবে একেবারে অনভিজ্ঞ হিসেবে ২৪টি দিন ভালভাবেই পার করেছেন। স্পিকারের ভূমিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন মহাজোটের অপর শরিক জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল। তিনি বলেন, সংসদ পরিচালনায় তিনি নিরপেক্ষতা ও পারঙ্গমতা দু’টিই দেখিয়েছেন। যত দিন যাবে দেশ একজন পরিশীলিত, জ্ঞানী ও ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন স্পিকার পাবে। প্রথম অধিবেশনে স্পিকার অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে বিরোধী দলকে মোকাবিলা করেছেন। তাদেরকে সংসদে রেখেছেন। যত দিন যাবে বিতর্কের ধরন ও তা মোকাবিলা করা উনি শিখে যাবেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে একজন এমপি হিসেবে আমি স্পিকারের ভূমিকায় সন্তুষ্ট। এদিকে সংসদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পিকারের ভূমিকাকে মোটামুটি প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি সংসদ পরিচালনায় ভারসাম্য বজায় রেখেছেন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, নতুন স্পিকার হওয়ায় তার সামনে ছিল অনেক চ্যালেঞ্জ। অসংসদীয় শব্দ এক্সপাঞ্জ, এমপিদের সতর্ক করা ও মাঝে মধ্যে তাদের মাইক বন্ধ করে দিয়ে নিজের বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। তবে এমপিদের আচরণবিধি খসড়া বিল উনি চাইলেই সংসদে উত্থাপন করা যেতো। এছাড়া, আইন পাসের সময় তড়িঘড়ি গিলোটিন না করে বিরোধীদলীয় এমপিদের সংশোধনীর ওপর বক্তব্য রাখতে দিতে পারতেন। সংসদে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে অনেক সময় ব্যয় হয়। আর এটা ছিল আইন প্রণয়নের কাজ। তিনি বলেন, স্পিকার যদি এগুলো সঠিকভাবে করতে পারতেন তাহলে তার ভূমিকা আরও অর্থবহ হতো। তারপরও সার্বিকভাবে স্পিকার প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে আমরা মনে করি। স্পিকারের রুলিং সংশ্লিষ্টরা জানান, সংসদে অশালীন শব্দ ব্যবহার বন্ধে কিছুটা কঠোর ছিলেন স্পিকার। এ নিয়ে রুলিংও দিয়েছেন। মাইক বন্ধ করেছেন বেশ কয়েক নারী এমপি’র। অনেককে আবার সতর্কও করেছেন। বিধি অনুযায়ী কথা বলার সুযোগ না থাকায় থামিয়ে দিয়েছেন অনেক সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ানকেও। স্পিকারের এসব ভূমিকার প্রশংসা করেছেন সরকারি ও বিরোধীদলীয় এমপিরা। সরকারি দলের নাজমা আক্তার বিরোধীদলীয় নেতাকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর বক্তব্য দেয়ায় তার মাইক বন্ধ করে দেন। তিনি সংসদ সদস্য রানু ও পাপিয়াকে ‘বিউটি কুইন’ উল্লেখ করে বক্তব্য রাখলে স্পিকার থামিয়ে দিয়ে বলেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য রাখবেন না। ওই সংসদ সদস্য বক্তব্য দিতে গিয়ে ‘তারেক রহমান মদ খেয়ে এক নারীর শ্লীলতাহানি করেছিল’ বলে উল্লেখ করলে স্পিকার তাকে সতর্ক করেন। একই ভাবে বিরোধী দলের কয়েক নারী এমপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কটাক্ষ করলে একাধিকবার মাইক বন্ধ করেন স্পিকার। এ প্রসঙ্গে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চোখের ইশারায় স্পিকার আমাদের মাইক বন্ধ করেছেন। সরকার দলীয় নারী এমপিরা আমাদের নেতা-নেত্রীকে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। তাদের মাইক বন্ধ করা হয়নি। তিনি বলেন, স্পিকারকে নিরপেক্ষ হতে বাধা দিচ্ছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তাকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে দিচ্ছেন না। স্পিকার কি পারবেন প্রধানমন্ত্রীর অশালীন বক্তব্যের সময় তার মাইক বন্ধ করে দিতে? যেদিন তিনি পারবেন সেদিনই বুঝবো স্পিকার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এদিকে সংসদ সচিবালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন হওয়ায় তিনি অনেক কিছু সামাল দিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন সচিবালয়ের বেশ কয়েক কর্মকর্তা। তারা বলেন, সচিবালয়ের একটি সিন্ডিকেট সব সময় তৎপর থাকে। তারা নিয়ন্ত্রণ করেন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, পদাবনতি ও বদলি। স্পিকারকে ঘিরে বলয় তৈরি করে রাখেন তারা। সাবেক স্পিকারের আমলে যারা সক্রিয় ছিলেন তারা এখনও তৎপর বলে দাবি তাদের। সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন স্পিকারের কাছে সংসদ সচিবালয়ের হাজার কর্মকর্র্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা অনেক। রাজনৈতিক দল ও মতের ঊর্ধ্বে রয়েছেন এমন কমকর্তা-কর্মচারীরা তাদের মেধার যোগ্য মূল্যায়ন পাবেন বলে প্রত্যাশা করেছিলেন। গত তিন মাসে তারা স্পিকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমে হতাশ হয়েছেন। সচিবালয়ের আইন শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় সংসদ সচিবালয়ে নিয়োগ ও বদলির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমাদের ধারণা ছিল এবার হয়তো তা বন্ধ হবে। মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সংরক্ষিত মহিলা কোটায় সংসদে সংসদ সদস্য হন শিরিন শারমিন। পরে তিনি মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলে শিরিন শারমিনকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক করা হয়। বিরোধী দল না থাকায় স্পিকার পদে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। ফলে সংসদে মাত্র ৬ মিনিটের মধ্যেই স্পিকার পদে নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হয়। এরপর আনুষ্ঠানিক ভাবে শপথ গ্রহণ করে স্পিকার পদের দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন ড. শিরিন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, বিশ্বের শক্তিশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। দেশের প্রথম নারী স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী ১৯৬৬ সালের ৬ই অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রফিকুল্লাহ চৌধুরী (মরহুম) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে তার সচিব ছিলেন। মা নাইয়ার সুলতানা পেশায় অধ্যাপক ছিলেন। স্বামী সৈয়দ ইশতিয়াক হোসাইন ওষুধ বিশেষজ্ঞ। তিনি দুই সন্তানের জননী। ড. শিরিনের  পৈতৃক বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি মানবাধিকার ও সংবিধান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে আইন পেশায় নিয়োজিত থাকেন। ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার তিনি অন্যতম আইনজীবী ছিলেন।


এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © 2021 shirshobindu.com