সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৭

বন্দুকের নলের মুখেও ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন মুগাবে

বন্দুকের নলের মুখেও ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন মুগাবে

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: চারদিক থেকে বন্দুকের নল তাক করা। নিজের দলে বিদ্রোহ। প্রায় চার দশক আগলে রাখা ক্ষমতার মসনদ থর থর করে কাঁপছে। সেনাবাহিনীর গৃহবন্দিত্বের শিকলে বাঁধা ভবিষ্যৎ।

কিন্তু কিছুতেই দমছেন না জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে। রোববার রাতে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের পাশে নিয়ে বসে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন তিনি।

জোর গুঞ্জন ছিলো, ওই ভাষণেই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন। নিজের দল জানু-পিএফ তাকে বহিষ্কার করার পর প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করা ছাড়া মুগাবের সামনে আর কোনো পথই খোলা ছিলো না- এমনটিই ভেবেছিলেন সবাই।

তবে অবাক করে দিয়ে ক্ষমতায় অবিচল থাকার ঘোষণা দিলেন রবার্ট মুগাবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। মুগাবের এ বক্তব্যে ভাষণকক্ষে নেমে আসে পিনপতন নিরবতা। তার নিশ্চিত পতন জেনে উল্লাসরত বিরোধীদের মুখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে।

মুগাবের এই বক্তব্য রীতিমত চমক জাগানিয়া। কারণ, দুটি বিশেষ সুত্রমতে, সরকারের একজন পদস্থ সদস্য এবং সেনাবাহিনীর সাথে স¤পৃক্ত এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, মুগাবে পদত্যাগ করছেন। কিন্তু নিজের ভাষণে পদত্যাগের কোন প্রসঙ্গই টানেন নি তিনি।

উল্টো বলেছেন, এ সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ রাষ্ট্রের প্রতি আমার মুখ্য ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় নয়। আমিই রাষ্ট্রপ্রধান। সামনের মাসে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে আমিই সভাপতিত্ব করছি। এ সময় বিরোধীদলের নেতা মরগান চ্যাঙ্গিরাইয়ের চেহারা হয় দেখার মতো।

তিনি সম্ভবত নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রয়টার্সকে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, আমি হতভম্ব। হতভম্ব সম্ভবত পুরো জাতিই। তিনি (মুগাবে) সবাইকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। আমার মনে হচ্ছে মুগাবে পাগল হয়ে গেছেন। তাকে উৎখাত করার সময় চলে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নেতা ক্রিস মাতসভাঙ্গা বলেন, মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় সংসদ অধিবেশনে মুগাবের পদত্যাগ না করার নিন্দা জানানো হবে। বুধবার এর প্রতিবাদে গণবিক্ষোভ করা হবে। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, মুগাবে সম্ভবত বর্তমান পরিস্থিতি অবগত নন।

কয়েকদিনে জিম্বাবুয়ের রাজনৈতিক পটে যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা সম্ভবত বুঝতে পারছেন না তিনি। নিজের ভাষণের এক পর্যায়ে ৯৩ বছর বয়সী মুগাবে খেই হারিয়ে আবোল তাবোল বকেছেন বলেও মন্তব্য করেন ক্রিস।

তবে, মুগাবের শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ না করার কারণে তৈরি হয়েছে নানান জল্পনা-কল্পনা। একদিকে বলা হচ্ছে, জানু-পিএফ দল মুগাবেকে দল থেকে বহিষ্কার করার বিষয়ে তাকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয় নি। অন্যদিকে বলা হচ্ছে, ভাষণ দিতে গিয়ে খেই হারিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যান মুগাবে।

অন্তরালের কারণ যাই হোক, পদত্যাগের ঘোষণা না দিয়ে একটি বড় ধরনের বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন রবার্ট মুগাবে। উল্লেখ্য, রবার্ট মুগাবের ভাইপো পাট্রিক ঝুয়াও আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় রয়টার্সকে একটি বার্তা দিয়েছেন। তাতে বলা হয়, মুগাবে এবং তার স্ত্রী সত্য ও ন্যায়ের জন্যে প্রয়োজনে জীবন দিতেও রাজি আছেন। তারা কোনো ষড়যন্ত্রে ভীত নন।

তারা পিছু হটবেন না। প্রসঙ্গত, রবার্ট মুগাবের স্ত্রী গ্রেসি মুগাবেকেও বিচারের সম্মুখীন করা হবে বলে উল্লেখ করেছে জানু-পিএফ দলের মুখপাত্র। তার বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, ঘৃণা এবং বিদ্বেষ ছড়িয়ে সংঘাত তৈরি করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, মুগাবেকে উৎখাতের পরিকল্পনাকারীদের উদ্দেশ্য করে সম্প্রতি তার ছেলে চাতুঙ্গা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, আপনারা একজন বিপ্লবী এবং মহান নেতাকে পদচ্যুত করতে পারেন না।

কিন্তু মুগাবের এমন দৃঢ় অবস্থান সত্ত্বেও তার চার দশকের শাসন ব্যবস্থার কার্যত ইতি ঘটেছে বলে মনে করেন স্কুল অব অরিযেন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের প্রফেসর স্টিফেন চ্যান। তিনি বলেন, মুগাবে যদি এ সপ্তাহ ক্ষমতায় টিকে থাকেন তাহলে বিস্মিত হবো আমি। তিনি এখন আর দলীয় সভাপতি নন। তাই তিনি কংগ্রেসে ভাষণ রাখতে পারেন না।

সামনে যে সব ঝুঁকি আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক পরিম-লে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপকে গ্রহণযোগ্য হিসেবেই বিবেচনা করছে জিম্বাবুয়ের জনগণ। সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে সেনা অভ্যুথান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

এটিকে বরঞ্চ প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পালাবদলের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীর নেয়া একটি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে ভাবা হচ্ছে। তবে, রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর এ হস্তক্ষেপকে খুব ভালোভাবে নিতে পারছেন না অনেক বর্ষীয়ান রাজনিতিবিদও। এ নিয়ে অস্বস্তি আছে মুগাবের বিরোধী শিবিরেও।

অনেকেই মনে করছেন, সেনাবাহিনীর এক সময়কার মদতপুষ্ট সরকার প্রধান (মুগাবে)কে সরিয়ে তারা পরবর্তীতে নিজেদের অনুগত কাউকেই ক্ষমতায় বসাবে। ফলে দেশটিতে সেনা সমর্থিত সরকারের প্রভাব বজায় থাকবেই। পূর্ণ গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনের ক্ষেত্রে এটি একটি অন্তরায়।

এর ফলে জনসমর্থিত নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা না গিয়ে তা যায় সেনাসমর্থিত নেতৃত্বের হাতে। যা রাজনীতির অন্য একটি অশনি সঙ্কেত। এ প্রসঙ্গে জিম্বাবুয়ের শিক্ষামন্ত্রী ডেভিড কলতার্ট বলেন, সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো, মুগাবেকে সরিয়ে তারা (সেনাবাহিনী) নিজেদের পছন্দের কাউকেই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে বসাবে।

এখানে সত্যিকারের জনকল্যাণকামী কিংবা যোগ্যদের বিবেচনা করা হবে না। বিবেচনা করা হবে সেনাবাহিনীর স্বার্থ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা মুগাবে পরবর্তী একটি নতুন জিম্বাবুয়েকে দেখতে চায়।

উল্লেখ্য, শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র রবার্ট মুগাবের নেতৃত্বের পক্ষপাতী ছিলো না। দেশটি নানা সময় মুগাবের সমালোচনা করে এসেছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026