বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪১

খাদ্য যখন ইয়েমেনিদের হত্যায় মারণাস্ত্র

খাদ্য যখন ইয়েমেনিদের হত্যায় মারণাস্ত্র

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: দুর্ভিক্ষ মানেই খরায় ধূ-ধূ জমি, ফসলহীনতা ও মানুষের অস্থিচর্মসার শরীর। দুর্ভিক্ষের কথা শুনলেই চোখে ভাসে অনাহারে মরতে বসা মানুষ, তাদের জীবন বাঁচাতে ত্রাণকর্মীদের ছুটোছুটি কিংবা খাবার পৌঁছে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টার কথা। এখন এই ধরনের দুর্ভিক্ষের চিত্র ইতিহাসে পরিণত হয়েছে, বিংশ শতাব্দীতে এমন দুর্ভিক্ষ দেখা যেত। এখনও দুর্ভিক্ষ রয়েছে, কিন্তু তা ভিন্ন চেহারায় হাজির হচ্ছে।

জাতিসংঘ বলছে, ইয়েমেনের ৮ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষ থেকে মাত্র ‘এক পা দূরে’ রয়েছে। মানবসৃষ্ট কারণেই এই দুর্ভিক্ষ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে খাবার আমদানির মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ ঠেকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা ছিল। তবে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের অবরোধ সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

আর মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, খাদ্যকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কারণেই সেখানে দুর্ভিক্ষ কড়া নাড়ছে। আমদানি করে খাবারের অভাব মেটানোর সুযোগ থাকলেও যুদ্ধরত দুই পক্ষ তাতে বাধা তৈরি করছে। ফলে সেখানে প্রতিদিন অনাহারে প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরা।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে এরইমধ্যে সহস্রতম দিন অতিক্রম করেছে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে ইয়েমেনের বেশ কিছু অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। থমকে গেছে মৌলিক সেবা। অনেক পরিবার বিশুদ্ধ খাবার পানিও পাচ্ছে না।

অক্সফামের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের মোট চাহিদার প্রায় ৯০ ভাগই আমদানি করতে হয়। এর ৮০ ভাগই আসে আল হুদায়দাহ ও সালিফ বন্দর দিয়ে। ইয়েমেনের দুই-তৃতীয়াংশ জনগণই এসব বন্দরের আশেপাশের এলাকায় বাস করে। ২০১৬ সালে এই বন্দর দিয়েই প্রায় ৮৫ ভাগ গম আমদানি হয়েছিল। কিন্তু রিয়াদে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এক মাস আগে উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে অবরোধ জারি করে সৌদি জোট। সম্প্রতি অন্তত ছয়টি জাহাজ আল হুদায়দাহ ও সালিফ বন্দরে নোঙর ফেলার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত ফিরে গেছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা জাহাজ ভেড়াতে না পেরে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রতিদিন প্রতি জাহাজ বাবদ তাদেরকে গুণতে হচ্ছে ১০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি। তার ওপর হুদায়দাহ বন্দরে আরেকটি হামলা আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, যদি আল হুদায়দাহ বন্দর অকার্যকর হয়ে পড়ে তবে ইয়েমেনে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সরবরাহের কোনও বিকল্প ব্যবস্থা নেই।

অক্সফাম জানায়, সৌদি অবরোধের কারণে নভেম্বরের শুরু থেকে ইয়েমেনে চাহিদার মাত্র এক ভাগ খাদ্য আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে সেই খাবারটুকুও কিনতে পাচ্ছেন না ইয়েমেনিরা। নভেম্বরের শুরুর দিক থেকে খাবারের দাম ২৮ গুণ বেড়ে গেছে। জ্বালানি স্বল্পতার কারণে শহরগুলোতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কমে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কলেরার প্রাদুর্ভাবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইয়েমেন। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। ডিপথেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অন্তত ১০ লাখ শিশু ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

অক্সফামের গ্রেট ব্রিটেন প্রধান মার্ক গোল্ডরিং বলেন, ‘এক হাজার দিন ধরে ইয়েমেনে প্রচুর সংখ্যক আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তার ওপর আমরা এখন একটি অবরোধ দেখতে পাচ্ছি যেখানে গণমানুষের অনাহারকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জনগণের কাছে মৌলিক খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ পৌঁছাতে না দেওয়াটা কখনও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সহ্য করা উচিত নয়। এটা শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও মানবিকতার বোধ বর্জিত একটি কৌশল।’

সিএনএন’র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, ইয়েমেনে লড়াইরত দুই পক্ষই খাবারকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে প্রাথমিকভাবে এই সংকট তৈরি হয়েছে ইয়েমেনে আকাশপথ, স্থলপথ ও সমুদ্রপথে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের আরোপিত অবরোধের কারণে।

সৌদি জোটের দাবি, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের কাছে ইরানি অস্ত্র সরবরাহ ঠেকানোর জন্য এই অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকাই হুথিরা নিয়ন্ত্রণ করছে।

ত্রাণ সংস্থাগুলোকে উদ্ধৃত করে সিএনএন জানায়, ওই অবরোধের কারণে ইয়েমেনে জরুরি খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি সরবরাহের পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। যুদ্ধরত বিভিন্ন পক্ষের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো পার হয়ে আসতে প্রচুর মাশুল গুণতে হচ্ছে।

সরেজমিন ঘুরে সিএনএন’র প্রতিবেদক পরিস্থিতির বর্ণনায় বলেছেন, গাড়ি চালিয়ে আসার পথে কিছু বাজার পড়বে যেখানে তাজা ফলমূল আছে, অথচ তা কেউ কিনতে পারে না। সেখান থেকে মাত্র আধা মাইল দূরে দূরত্বেই শুরা অনাহারে মারা যাচ্ছে।

অক্সফামের দাবি, যুদ্ধরত সব পক্ষকেই এই তীব্র পর্যায়ের মানবিক সংকটের দায় নিতে হবে। সব পক্ষই আন্তর্জাতিক মানবিকতাবিষয়ক আইন ও মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের জন্যও দায়ী বলে মনে করছে সংস্থাটি।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026