বসনিয়া হার্জেগোভিনার সেব্রেনিৎসায় মুসলমানদের উপর বর্বর সার্ব বাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যার ২৫তম বার্ষিকী পালিত হয়েছে আজ ১১ জুলাই ২০২০। প্রতি বছর এই দিন এলে সেব্রেনিৎসার পোটোচারি কবরস্থান ও সেব্রেনিৎসা মেমোরিয়াল সেন্টারে আয়োজিত হয় শোকানুষ্ঠান, দেশটির রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সামরিক ব্যক্তিত্ব, বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, জাতিসংঘ প্রতিনিধিসহ নিহতদের পরিবারবর্গসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত থাকেন।
দিনটিকে স্মরণীয় রাখার জন্য অসহায় ও নিরাশ বসনিয়ার নির্যাতিত লোকদের শান্তিলাভে তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্রিটেনেও পালন করা হয় বার্ষিকী অনুষ্টান। কর্ডোবা ফাউন্ডেশন, বসনিয়ার হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এবং লন্ডন মুসলিম সেন্টার বিভিন্নভাবে অনুষ্টান করে নিহতদের পরিবারবর্গসহ অন্যান্য বিদেশি কূটনীতিকদের নিয়ে।
বসনিয়া হার্জেগোভিনার সেব্রেনিৎসায় মুসলমানদের উপর বর্বর গণহত্যার প্রতিবাদে ও তাদের বেদনা, যন্ত্রণা সকল অশান্তির অবসানের প্রত্যয়ে কর্ডোবা ফাউন্ডেশন বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে থাকে। তারা শুধু বসনিয়াতে স্রেব্রেনিকা গণহত্যা নয় অন্যান্য গণহত্যার প্রতিবাদে প্রচার, গবেষণা, প্রকাশনা, প্রতিনিধিদল আদান প্রদানসহ বিভিন্ন কাজ করে থাকে। এ ফাউন্ডেশনটি স্রেব্রেনিকার গণহত্যা এবং নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে প্রতিবছর।
এই গণহত্যাটিকে প্রথমে ইউরোপীয় সরকারগুলিও স্বীকৃতি দেয়নি। তারা সেরব্রেনিকাতে প্রতিবছর ১১ জুলাই স্মরণ অনুষ্ঠানে কোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে প্রেরণ করত না।
তবে স্রেব্রেনিকার একটি সাহসী জনগোষ্ঠী, বসনিয়ার প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতি ডাঃ মোস্তফা সেরিক, কর্ডোবা ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি বসনিয়ার হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এবং লন্ডন মুসলিম সেন্টারের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রেসার প্রয়োগের কারনে ইউরোপীয় সংসদ ২০০৯ সালের ১৫ ই জানুয়ারীর রেজুলেশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাহী কর্তৃপক্ষকে ১১ ই জুলাই স্রেব্রেনিকার গণহত্যার স্মরণ ও শোক দিবস হিসাবে স্মরণ করার জন্য আহ্বান জানানো হয়।
এই পদক্ষেপটি বসনিয়ান মুসলমানদের মনে শান্তি দিয়েছিল। যারা নৃশংস গণহত্যার সময় এবং তার পরেও নির্জন ও একাকী বোধ করেছিল। তারা সহানুভূতি ও ভালোবাসা বিনিময়ে আজ অনেকাংশ শান্তিতে আছেন।
বসনিয়া হার্জেগোভিনার সেব্রেনিৎসায় মুসলমানদের উপর বর্বর সার্ব বাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে এক ভিডিও বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস এক বলেছেন, সেব্রেনিৎসা গণহত্যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপের মাটিতে সবচেয়ে নৃশংসতম অপরাধ।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা হলো ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। অতীতে এটি যুগোস্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রের একটি অংশ ছিল।
১৯৯২ এর মে-তে, জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় কমিউনিটি (ইওরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বসুরি) বসনিয়ার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দু’দিন পর, বসনীয় সার্ব বাহিনীগুলো মিলোসেভিচ ও সার্ব-আধিপত্যশীল যুগোশ্লাভ সেনাবাহিনীর মদদে বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে বোমাবর্ষণ করার মাধ্যমে তাদের যুদ্ধাভিযান শুরু করল।
পরবর্তী কয়েক বছরে, সার্ব-আধিপত্যশীল যুগোশ্লাভ সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট বসনীয় সার্ব বাহিনীসমূহ বসনিয়াক (বসনিয়ান মুসলিম) ও ক্রোয়েশীয় বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়ায় সার্ব বাহিনীর হামলায় দুই লাখের বেশি বসনীয় নিহত ও প্রায় বিশ লাখ শরণার্থী হয়। তবে সেব্রেনিৎসার গণহত্যাকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে নৃশংস ও ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। সার্বিয়া এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইলেও একে গণহত্যা বলে উল্লেখ করতে রাজি নয় তারা।
১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন সেব্রেনিৎসার কোথাও না কোথাও এই গণহারে হত্যার ঘটনা ঘটেতে থাকে।হত্যার শিকার ব্যক্তিদেরকে মৃত্যুর আগে নিজেদের কবর খনন করতে সার্বীয় বাহিনী বাধ্য করে। সার্ব বাহিনী সেখানে জাতিসংঘের ডাচ শান্তিরক্ষীদের সামনেই ৮ হাজার ৩৭২ জন বসনীয় মুসলমানকে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়। সে গণহত্যার ২৫ বছর পর এখনও সেখানে শনাক্ত হয় গণকবর, মেলে গণহত্যার শিকার মানুষদের দেহাবশেষ।
১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই সার্বীয় বাহিনী বসনিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সেব্রেনিৎসা এলাকা দখল করে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও এবং জাতিসংঘের ডাচ শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতিতেই সেব্রেনিৎসায় চালানো হয় নারকীয় গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান। সেখানে অবস্থানরত ডাচ শান্তিরক্ষী বাহিনীগুলোর একটি ব্যাটেলিয়নের চোখের সামনে বসনিয়াক বেসামরিক ব্যক্তিদেরকে আলাদা করে ফেললো তারা। তারপর নারী ও কন্যা শিশুদেরকে বাসে তুলে বসনীয়-নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পাঠিয়ে দিল।
এই নারীদের কেউ কেউ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ণের শিকার হন। পেছনে রয়ে গিয়েছিল যে পুরুষ ও ছেলে শিশুরা, তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে মেরে ফেলা হয়, বা বাসে করে বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। স্রেব্রেনিচাস্থ সার্ব বাহিনীগুলোর হাতে সেদিন ৭,০০০-৮,০০০ পুরুষ ও ছেলেশিশু খুন হয়।
সেব্রেনিৎসা দখলের প্রথমদিন থেকেই সার্বীয় বাহিনী স্থানীয় বসনীয় জনগোষ্ঠীর সকল পুরুষকে আলাদা করে নেয়। পরে তাদেরকে গণহারে হত্যা করে। এই গণহত্যা চলার সময় জাতিসংঘ নীরবতা পালন করলেও পরে একে ‘জাতিগত শুদ্ধি অভিযান’ বলে স্বীকৃতি দেয়।
মুসলমানদের উপর বসনিয়ায় যে ভয়াবহ জাতিগত নিধন চলছিল এর এক পর্যায়ে নানা নাটকের পর জাতিসংঘ সেখানে শান্তিরক্ষী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেব্রেনিৎসায় মুসলমানদের উপর নির্যাতন ও গণহত্যার বিভিন্ন প্রমাণ, ভিডিওচিত্র ধ্বংস ও লোপাট করে সেখানে জাতিসংঘের নিযুক্ত ডাচ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। এভাবেই খোদ জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে যাবতীয় প্রমাণ লোপাট করা হয়।
২০১১ সালে সেব্রেনিৎসা গণহত্যার ১৬তম বার্ষিকীকিতে পোটোচারি কবরস্থানে তাদের ‘যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিময়’ অনুষ্টানে তাদের সহানুভূতি, ভালোবাসা ও সমবেদনা জানাতে লন্ডন থেকে আমরা দুইগ্রুপে ২৫/৩০জনের একটি পর্যবেক্ষণ দল উপস্থিত ছিলাম। স্বচক্ষে অনেক কিছু দেখার ও জানার সুযোগ হয়েছে এই একাডেমীক সফরের মাধ্যমে।
আমাদের গ্রুপে ছিলেন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সপ্তাহিক জনমতের সাবেক সম্পাদক নবাব উদ্দিন, ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের ডাইরেক্টর দিলোয়ার হোসেন খান, বিশিষ্ট জাজ বেলায়েত হোসেন, ব্যারিস্টার নাজির আহমেদ, কাউন্সিলর জামাল উদ্দিন, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি মোহাম্মদ জুবায়ের, সাপ্তাহিক দেশ’র সম্পাদক তাইসির মাহমুদ, সাংবাদিক মতিউর চৌধুরি ও মো: আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল।
সেব্রেনিৎসা মেমোরিয়াল সেন্টারে আয়োজিত শোকানুষ্ঠান ছাড়াও আরো অনেগুলি অনুষ্টান ও প্রদর্শনীয় স্থান আমরা ভ্রমণ করি। বসনিয়ার প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতি ডাঃ মোস্তফা সেরিকের আমন্ত্রিত আমন্ত্রণে বসনিয়ার অন্যান্য সরকারী ও গুরুত্বপূর্ণ সাইট ঘুরে ফিরে দেখানো হয়। আমাদের এই একাডেমীক সফরে বসনিয়ার নির্যাতিত মানুষের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। তাদের মনে অনেক আশারালো জাগে, এর ধারাবাহিকতায় বসনিয়ানদের অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
২০১২ সালের ১১ জুলাই শোক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুঃসহ সে ঘটনাকে স্মরণ করছে বসনীয়রা। স্বজনদের কান্নাজড়িত বড়ই বেদনাময় কাহিনীচিত্র শুনলাম নিজের উপস্থিতিতে জীবিত বসনীয়নদের মুখ থেকে। উপস্থিত স্বজনরা জানান তাদের বিভিন্ন স্বজনদের শারিরিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ণের ঘটনা।
জারা তুর্কোভিচ নামের একজন এক রাতের বর্ণনা দেন আমাদের। তিনি বলেন, আমরা গভীর ঘুমে যখন আচ্ছন্ন ছিলাম তখন চারজন সার্ব সৈন্য তাদের মধ্য থেকে একজন তরুণীকে তুলে নিয়ে সামান্য দূরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করতে শুরু করে। দুজন সৈন্য দুই পা ধরেছিল, ৩য় জন রেপ করছিল, মেয়েটি যখন প্রচণ্ড কান্নাকাটি আর সাহায্য প্রার্থনা করছিল, কিন্তু হায়নারা থেমে থাকেনি। জারার ১৯ বছর বয়সী বোন ফাতেমাও সেখানেই ছিল, সে ভয়ে তাঁর বোনের ৪ সন্তানকে আঁকড়ে ধরে। ফাতেমা বলেছিল, তিনি ভেবেছিলেন তারা হয়ত একজন মায়ের প্রতি আগ্রহী নাও হতে পারে। কিন্তু ফাতেমাকেও একই কায়দায় ধর্ষণ করে এই হায়নারা।
পূর্ব বসনিয়ায় পটোকারি শহর ছিল জাতিসংঘের বিশেষ নিরাপত্তা এলাকার অন্তর্গত। সেখানেই এই চিনকারা ফ্যাক্টরি। শুধু কি মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রেই এমন ঘটেছে? তা নয় বরং ছেলে শিশুদের উপরও একই রকম নির্যাতন হয়েছে।
এমন বহু ঘটনার কথা জানা গেছে স্বজনদের কাছে থেকে। তারা জানান সার্ব সৈন্যরা বেছে বেছে ১০/১১ বছরের বালকদের নিয়ে যেত তারা যাদের নিয়ে যেত তাদের আর কখনোই ফিরে পাওয়া যায় নি। এই শিশুরাও হায়নাদের লালসার শিকার হয়েছিল। হায়নারা এই শিশুদের হত্যার আগে বলৎকার করতো।
জাতিসংঘের বিশেষ নিরাপত্তা ক্যাম্প চিনকারা ফ্যাক্টরি। সেখানে আশ্রিতদের অভয় দেওয়া হয়েছিল তারা সেখানে নিরাপদ। কিন্তু তাদের সাথে ঘটে উল্টোটা। এই ক্যাম্পে ১২ বছর বয়সী মিনা স্মেইলোভিক আর তাঁর ১৪ বছর বয়সী চাচাত বোন ফাতা স্মেইলোভিক ছিলেন।
তাদের দিকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের পোশাক পরা কিছু সৈন্যের নজর পড়ে। এই দুই বোন আর সাথে নিজামা অরিক নামে আরও এক যুবতীকে তুলে নিয়ে যায় সৈন্যরা। মেয়ে তিনটি কয়েক ঘণ্টা পর ফেরত আসে। তাদের গায়ে কোনও কাপড় ছিল না, দেহজুড়ে আঁচড় আর কামড়ের চিহ্ন ছিল। মাত্র ১২ বছরের মিনা আর ১৪ বছর বয়সী ফাতার লজ্জাস্থান থেকে রক্তপাত হচ্ছিল প্রবলভাবে। এমনকি রক্তাক্ত শরীর ধোয়ার মত পানিও সেখানে ছিল না। যারা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেখানে গিয়েছিল তাদের হাতেই ধর্ষিত হয়েছিল এই মেয়ে তিনটি। এসব নির্যাতনের অহরহ বরগুলো গোপন কিছু না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, নিউইয়র্ক টাইমস এবং দি ইন্ডিপেনডেন্টের রিপোর্টে এগুলো আলোচনায় এসেছিল।
লেখক: মো: আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল, সাংবাদিক, সংগঠক ও সমাজকর্মী।