বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১১:১৩

গ্রামীণ ব্যাংক বিল পাস

গ্রামীণ ব্যাংক বিল পাস

শীর্ষবিন্দু নিউজ: মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সঙ্গে বিএনপির আপত্তির মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক আইন  সংশোধন করেছে সংসদ। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মঙ্গলবার সংসদে গ্রামীণ ব্যাংক বিল তুললে সংসদ সদস্যরা কণ্ঠভোটে তা পাস করেন।

আইন সংশোধনের ফলে এখন থেকে গ্রামীণ ব্যাংককে সরকারের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আর্থিক হিসাব দিতে হবে, যাকে স্বাধীনতা খর্ব বলে আসছেন ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনূস। এছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোনয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্ব বেড়েছে, যাকে ‘বাইরের হস্তক্ষেপ’ দাবি করে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছিল ব্যাংকটির ইউনূস সমর্থক নির্বাচিত পরিচালকরা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনসহ বিলটি সংসদে পাসের জন্য অর্থমন্ত্রী উত্থাপন করলে তা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু। তবে তার প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়। চুন্নু বলেন, এই বিলটি নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। এজন্য মতামত নেয়ার জন্য জনমত যাচাই করা হোক।

এতে আপত্তি জানিয়ে অর্থমন্ত্রী  বলেন, দেশে-বিদেশে এই বিলটি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু যারা কথা বলছেন, তারা জানে না- এই বিলে কী আছে। বিলটির বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সামরিক শাসনামলে নেয়া বিভিন্ন অধ্যাদেশ পরিবর্তন ও বাতিলের কাজ শুরু করে। এরই আওতায় ১৯৮৩ সালের গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ বতিল করে নতুন আইনের প্রস্তাব করা হয়।

তবে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকারের এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেন ইউনূস। তিনি দাবি করেন, সরকার ব্যাংকটি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে। ইউনূসের পক্ষে অবস্থান নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংককে আগের মতো রাখার দাবি জানায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। যুক্তরাষ্ট্রও ইউনূসের পক্ষে অবস্থান নেয়।

চুন্নু নোবেলজয়ী ইউনূসের প্রশংসা করে বলেন, তিনি অনেক আলোচিত ব্যক্তি। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে তাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বিপ্লব করেছেন। নারীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। মুহিত বলেন, ড. ইউনূস জ্ঞানী-গুণী মানুষ। তিনি আমাদের দেশের গর্ব। দেশের জন্য নোবেল নিয়ে এসেছেন। তার এই সাফল্যের পেছনে সরকারের উদ্যোগ ছিল, সৌভাগ্যক্রমে আমারও কিছু ভূমিকা ছিল।

এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনামলে ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ জারির সময় মুহিত ছিলেন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে। এরশাদের দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য চুন্নু প্রস্তাবিত বিলকে ‘অর্থবিল’ আখ্যায়িত করে এর জন্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি নেয়ার দাবি তুললেও তার সংশোধনীগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়।

সংবিধানের ৮১ ও ৮২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অর্থবিল সংসদে উত্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপতির সম্মতির প্রয়োজন হয়। অর্থমন্ত্রী সংবিধানের ৮১ ও ৮২ অনুচ্ছেদ তুলে ধরে বলেন, এটা অর্থবিল, রাষ্ট্রপতির সম্মতির দরকার ছিল। তবে এই বিলে কোনো ট্যাক্স কমানো-বাড়ানো হয়নি। সেজন্য রাষ্ট্রপতির সম্মতির দরকার নেই। বিলে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। তিনি (ইউনূস) আইন করেছিলেন, এমডির বয়স ৬০ বছর হবে। সেই আইন অনুযায়ীই হাই কোর্ট তাকে অনুপযুক্ত ঘোষণা করে। আমাকে যদি বলেন এটা পরিবর্তন করার জন্য, আমি বলব- ৬৫ করা উচিত। কিন্তু সেটা এখন নয়, ঝগড়া-ঝাটির পরে।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংকের বাছাই করা তিন থেকে পাঁচ জনের প্যানেল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনক্রমে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিযুক্ত হবেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের নিয়োগ করা তিন জন এবং ঋণ গ্রহীতা অংশীদারদের দ্বারা নির্বাচিত নয় ব্যক্তির পরিচালক হওয়ার বিধান হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই বোর্ডের পরিচালক হলেও তার ভোটাধিকার থাকবে না।

বয়সের কারণ দেখিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার পর থেকে সরকারের সঙ্গে নোবেলজয়ী ইউনূসের তিক্ত সম্পর্ক চলছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সূচনা হওয়ার পর থেকেই এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন ইউনূস। ২০০৬ সালে তিনি ও গ্রামীণ ব্যাংক দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে শান্তিতে অবদানের জন্য জন্য নোবেল পুরস্কার পান। অবসরের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে ২০১১ সালের মার্চে ইউনূসকে অব্যাহতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে হেরে ইউনূস পদত্যাগ করেন।

সংশোধিত আইনে গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৩৫০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানায় সরকারের অংশীদারিত্ব ২৫ শতাংশই রাখা হয়েছে। ৭৫ শতাংশ থাকছে গ্রামীণ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের কাছে। সরকার সময় সময় পরিশোধিত শেয়ার মূলধন বৃদ্ধি করতে পারবে।

গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার জন্য কেউ মিথ্যা তথ্য দিলে আগে ১ বছর কারাদণ্ড ও দুই হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল। সংশোধিত আইনে জরিমানার মাত্রা বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া এ সংস্থার নাম কেউ বিজ্ঞাপনে বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করলে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল অধ্যাদেশে। সংশোধিত আইনে এই সাজা বাড়িয়ে ১ বছর কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

২০১০ এর ডিসেম্বরে নরওয়ের টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংককে দেয়া বিদেশি অর্থ এক তহবিল থেকে অন্য তহবিলে স্থানান্তরের অভিযোগ ওঠে। এরপর দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় একটি কমিশন গঠন করে সরকার। সম্প্রতি কমিশন তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়, যাতে ব্যাংকের বর্তমান কাঠামো বদলে বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করেছে।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026