শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৯

সূরা আল-মারইয়াম

আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘সূরা আল-মারইয়াম’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ‘ইসলাম বিভাগ প্রধান’ ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান।

মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের প্রাক্কালে এই সূরাটি নাযিল হয়।

ঐতিহাসিক পটভূমি:
সুদীর্ঘ ৪০টা বছর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সমাজে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবন-যাপন করেছেন। উন্নত নৈতিক চরিত্র ও আচার-আচরণের কারণে সর্বজনপ্রিয় একজন ব্যক্তি হিসেবে সমাজে তাঁর অবস্থান তৈরি হয়েছিল। তিনি ছিলেন আল-আমিন ও আস-সাদিক। অথচ যখনই তিনি মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন তখনই মানুষ প্রথমে তাঁকে উপেক্ষা করতে থাকে এবং পরবর্তীতে ঠাট্টা-বিদ্রুপ, লোভ-লালসা, ভয়-ভীতি প্রদান শুরু করে দেয় এবং নবুয়্যতের পাঁচ বছরের মধ্যেই তাঁর ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু হয়ে যায়। বিশেষ করে যারা একটু দরিদ্র ও দাসশ্রেণির ছিল তাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা ছিল বড় তীব্র।

হাতের নাগালের মধ্যে পেলেই মারপিট করা, আটকে রাখা, অভুক্ত রাখা, তাদের কাছ থেকে কাজ করিয়ে নিয়ে পারিশ্রমিক না দেয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়া নানাবিধ উপায়ে নিপীড়ন করতো। জুলুম-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন হযরত খাব্বাব (রা.) খানায়ে কাবায় বিশ্রামরত রসূল (সা.)-এর কাছে আল্লাহর সাহায্যের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন-‘জুলুম-নির্যাতন আর কি দেখলে? অতীতকালে যারাই ঈমানের দাবি করেছে তাদের কাউকে করাতে দ্বিখ-িত করা হয়েছে, আবার লোহার চিরুণী দিয়ে কারো শরীর থেকে গোশ্ত পৃথক করা হয়েছে; তারপরও তারা ঈমানহারা হননি।

সেদিন খুব নিকটে যেদিন একজন ষোড়শী সান’আ থেকে হাজরামাউত একাকী হেঁটে যাবে তাকে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করতে হবে না’। মু’মিনদের প্রকাশ্যে চলাফেরা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে রসূল (সা.) তাদেরকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করার পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, সেখানকার বাদশা নাজ্জাশী অত্যন্ত সৎ ও দরদী মানুষ এবং মানুষের প্রতি তিনি কখনও জুলুম করেন না।

প্রথমে ১১ জন নারী-পুরুষ হিজরত করেন। তাঁরা হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লে কাফিররা তাঁদেরকে ধাওয়া করে; কিন্তু নদীর তীরে পৌঁছার পূর্বেই সাহাবীদের নৌকা ছেড়ে দেয়। বিভিন্ন পর্যায়ে ১০১ জন নারী ও পুরুষ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন এবং এই মুহাজিরদের নেতৃত্ব দেন হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা.)। আবিসিনিয়ায় হিজরতের পর মাত্র ৪০ জন নারী-পুরুষ সে সময়ে মক্কায় রয়ে যান।

মুসলমানদের এভাবে চলে যাওয়াতে মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দ আরো অস্থির হয়ে পড়ে, কারণ হিজরতকারীদের সাথে প্রত্যেক বংশের কারো ভাই-বোন, কারো ছেলে-মেয়ে-জামাই বা আত্মীয়-স্বজন ছিল। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ দু’জন ঝানু কূটনীতিককে (আবু জেহেলের বৈপিত্রেয় ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আবী বারী’আহ ও আমর ইবনে আস) প্রচুর উপঢৌকনসহ বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে প্রেরণ করে।

এই দুই কূটনীতিক প্রথমে নাজ্জাশীর সভাসদদের প্রচুর উপঢৌকনের মাধ্যমে তাদের পক্ষে নেন; তারপর উপঢৌকনসহ উপস্থিত হয় নাজ্জাশীর দরবারে এবং সেখানে উপস্থিত হয়ে মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের ধর্মত্যাগী ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদেরকে ফেরত দানের জন্য আবেদন জানায়। সভাসদরাও তাদের সাথে একমত হয়ে ফেরত দানের জন্য বাদশাহর প্রতি অনুরোধ করেন।

জবাবে বাদশা বলেন যে অভিযুক্তদের কথা না শুনে আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না, কারণ আমি জালিম নই। বাদশাহর পক্ষ থেকে মুহাজিরদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলে তাঁরা পরস্পর পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন যে রসূল (সা.) তাঁদেরকে যা শিখিয়েছেন সেখানে তাঁরা তাই বলবেন।

বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হলে বাদশাহ তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করেন- তোমরা কেন তোমাদের স্বজাতির ধর্ম পরিত্যাগ করলে, আবার আমার ধর্মও গ্রহণ করলে না বা অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ না করে নতুন ধর্মমত গ্রহণ করলে? জবাবে হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা.) আরবের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থার বর্ণনা প্রদান করেন এবং সমাজে দুষ্কৃতির একটি চিত্র উপস্থাপন করার সাথে সাথে রসূল (সা.)-এর চরিত্র ও তাঁর শিক্ষা-দীক্ষাও পেশ করেন।

এর ফলে আরবের কুরাইশদের সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন এবং এর প্রেক্ষিতে তাঁর দেশে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় আসার কথা ব্যক্ত করেন। বাদশাহ তাঁদের নবীর ওপর যে কালাম নাযিল হয় তা তাঁকে শোনানোর জন্য বললে হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা.) সূরা মরিয়ম পাঠ করে শোনান। তাতে বাদশাহ মুগ্ধ হয়ে পড়েন এবং তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়ে।

তারপর কুরাইশ প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে হযরত ইসা (আ.) সম্পর্কে তাদের আকিদা ভালো নয়। বাদশাহ জানতে চাইলে মুহাজিররা বলেন যে হযরত ইসা (আ.) আল্লাহর বান্দাহ ও রসূল এবং কুমারি মরিয়ম (আ.)-এর পুত্র। তাতে বাদশাহ বলেন তাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলা হয়েছে এবং তিনি এর থেকে সামান্যতম বেশি কিছু নন। এরপর তিনি উপঢৌকনাদিসহ কুরাইশ প্রতিনিধি দলকে ফেরত পাঠান এবং মুহাজিরদের বলে দেন যে যতদিন খুশি তাঁরা তাঁর দেশে থাকতে পারবেন।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026