টিভি শোতে প্রচারিত বাংলাদেশিদের নিয়ে ‘আপত্তিকর মন্তব্যে’র একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ব্রিটেনের লেবার নেতা শীর্ষ স্যার কিয়ার স্টারমার। তার বক্তব্যের পুরোটা প্রকাশ করা হয়নি দাবি করে তিনি বলেন আমার বক্তব্যের ‘এডিটেড ভার্সন’ ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে।
স্যার কিয়ার স্টারমারের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে গত ২৬শে জুন লেবার পার্টিকে চিঠি দেয় লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন। এ তথ্য নিশ্চিত করেন হাইকমিশনের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা।
স্যার কিয়ার স্টারমারকে পাঠানো একই চিঠিতে লন্ডনস্থ বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বলেছেন, তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ প্রবাসী অনেক বিশিষ্ট নেতার সাথে যোগাযোগ করেছেন যারা শুধুমাত্র আপনার মন্তব্যে দুঃখিত হননি, উদ্বেগও উত্থাপন করেছে। হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ কখনই শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় ছিল না যেখানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছোট নৌকার আগমন ঘটে।
যদিও চিঠিটি ৪ জুলাই সাধারণ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য স্টারমারের এই প্রচেষ্টা। এই সপ্তাহের শুরুতে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসা লোকদের সম্পর্কে বিশেষভাবে কথা বলতে গিয়ে, লেবার নেতা দ্য সান সংবাদপত্রকে বলেছেন: আমি নিশ্চিত করব যে আমরা প্লেন ছেড়েছি… যে দেশগুলি থেকে মানুষ এসেছিল সেখানে ফিরে গেছে। এরপর তিনি বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
স্টারমার তার এই মন্তব্যের পর বাংলাদেশী কমিউনিটির সদস্যদের পাশাপাশি লেবার পার্টির সদস্যদের ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। স্টেপনি গ্রিন কাউন্সিলর সাবিনা আখতার এ প্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেছেন।
স্টারমার পরে আইটিভি নিউজকে বলেছেন, তিনি মন্তব্যের সাথে কোন উদ্বেগ বা অপরাধের কারণ হতে চাননি। আমি শুধু বলছিলাম যে যতদূর আশ্রয় প্রত্যাবর্তন সম্পর্কিত, বাংলাদেশ একটি নিরাপদ দেশ, তিনি যোগ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা স্টারমারের দেয়া এই উত্তরের সাথে দ্য সান এ দেয়া সাক্ষাৎকারের কোন মিল খুঁজে পাচ্ছেন না।
হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম স্বাক্ষরিত ওই চিঠির জবাবে লেবার নেতা স্যার কিয়ার স্টারমার তার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশিদের ক্ষু্ব্দ প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশদের সঙ্গে লেবার পার্টি এবং নিজের সম্পর্কের বিবরণ তুলে ধরেন।
২৯শে জুন পাঠানো ফিরতি চিঠিতে স্যার কিয়ার স্টারমার এ সময় তিনি তার বক্তব্য নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির বিষয়টি নিরসনেরও চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহের শুরুতে দ্য সানকে দেয়ার সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশিদের বিষয়ে প্রচারিত আমার একটি মন্তব্য বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের অনেককে হতাশ করেছে। এই চিঠিতে আমি তা স্পষ্ট করার সুযোগটি নিতে চাই। এটি আমার বক্তব্যের একটি সম্পাদিত সংস্করণ, যা ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে।
অবৈধ অভিবাসন সীমিত করার বিষয়ে লেবার পার্টির নীতি সম্পর্কে তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। জবাবে আমি উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নামটি নিয়েছি। কারণ আমাদের দুই দেশের সরকারের মধ্যে এমন একটি কার্যকর অংশীদারিত্ব রয়েছে, যেখানে ব্রিটেনে থাকার অধিকার হারিয়েছেন এমন অভিবাসীদের নিরাপদে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
চিঠিতে কিয়ার স্টারমার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকদের ব্যাপক প্রশংসা করেন। তিনি ব্রিটেনে বাংলাদেশ কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বহু বছর ধরে বাংলাদেশ কমিউনিটির সঙ্গে লেবার পার্টির ঐতিহাসিক ও অর্থবহ সম্পর্ক রয়েছে। লন্ডনের পূর্ব প্রান্ত থেকে বার্মিংহাম ও ওল্ডহাম পর্যন্ত বাংলাদেশ কমিউনিটির অনেক অবদান রয়েছে।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে এবং অসংখ্য কারি পুরষ্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করে স্যার কিয়ার স্টারমার লিখেন- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টগুলোতে অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। এ জন্য আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। তাছাড়া আমার নির্বাচনী এলাকায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে।
২০১৬ সালে ঢাকা সফর ও লন্ডন প্রবাসী অধ্যুষিত বাংলাদেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় জেলা সিলেট সফরের কথা স্মরণ করে স্যার কিয়ার স্টারমার তার চিঠিতে বলেন, আজ আমার বাংলাদেশ সফরের কথা মনে পড়ছে। আমি সব সময় বাংলাদেশ এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটির বন্ধু এবং সমর্থক ছিলাম এবং আছি। ভবিষ্যতেও এই বন্ধুত্ব ও সমর্থন অব্যাহত রাখবো।
স্যার কিয়ার স্টারমারকে পাঠানো প্রতিবাদ পত্রে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বলেছিলেন, আপনার খুব ব্যস্ত নির্বাচনী প্রচারণার এই সময়ে একটি সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লিখছি।
যা ২৪শে জুন ২০২৪ তারিখে দ্য সান-এর নির্বাচনী শোডাউনে আপনার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল। যেখানে আপনি রুয়ান্ডা আইন সম্পর্কিত একটি প্রশ্নের উত্তরে জবাবে বলেন, আশ্রয় এবং অভিবাসন বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে লোকদের (অবৈধ অভিবাসী) টোরিদের অধীনে তাদের নিজ দেশে সরানো হচ্ছে না।
তারপর থেকে আমার সঙ্গে যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশি অনেক বিশিষ্ট নেতার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে যারা শুধু আপনার মন্তব্যে দুঃখিত হননি বরং যুক্তরাজ্যে প্রবাসী কমিউনিটির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য, ভোটে প্রায় ২০ পয়েন্ট এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও, লেবার পার্টি ব্রিটিশ মুসলমানদের সমর্থন ফিরে পাওয়ার জন্য লড়াই করছে, যাদের মধ্যে অনেকেই গাজা সম্পর্কে তাদের অবস্থান সম্পর্কে পার্টির দ্বারা অশ্রুত বোধ করেন। মে মাসে স্থানীয় নির্বাচনের পরে আইটিভি নিউজের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকাগুলিতে লেবার ৩৩ শতাংশ ভোট হার হারিয়েছে।
হোম অফিসের পরিসংখ্যান মতে, যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী ব্যক্তিদের উৎসের শীর্ষ দেশগুলি হল- আফগানিস্তান, ইরান এবং ভারত। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়া গত বছরে, আফগানিস্তান থেকে আসা ৭৫০০ আশ্রয়প্রার্থী ছিল, যেখানে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা অনেক কম।
Leave a Reply