বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৫

অটিজম নিয়ে নাটক আশালতা দর্শকের কাছে পেয়েছে স্ট্যান্ডিং অভেশন

অটিজম নিয়ে নাটক আশালতা দর্শকের কাছে পেয়েছে স্ট্যান্ডিং অভেশন

নিলুফা ইয়াসমীন হাসান, লন্ডন: টাওয়ার হ্যামলেটসের উদ্যোগে গত পহেলা নভেম্বর শুরু হয়েছে মাসব্যাপী ‘সিজন অব বাংলা ড্রামা’। এবারের থীম হলো ‘হোপ’ বা ‘আশা’। গত ৯ই নভেম্বর পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে মঞ্চস্থ হয়েছে ট্রিওআর্টস এর প্রযোজনায় অটিজম নিয়ে দর্শকনন্দিত সমাজ সচেতন নাটক ‘আশালতা’। অভিনয় শিল্পীরা সকলেই নিজেদের চরিত্র দারুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। নাটক শেষে হলভর্তি দশক দাঁড়িয়ে অভিবাদন (স্ট্যান্ডিং অভেশন) জানিয়েছেন।

সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও অসামান্য প্রতিভার অধিকারী স্যার আইজ্যাক নিউটন এই দুই মহাবিজ্ঞানী অটিজম সমস্যায় ভুগছিলেন। আশালতা নাটকে তুলে ধরা হয়েছে সুযোগ পেলে অটিজম শিশুও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারে।

নাটক মানুষের আত্মিক উন্নয়ন এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে নাটক হলো অন্যতম। এখনকার ডিজিটাল যুগেও কার্যত অপ্রতিদ্বন্দী নাটক।
বাংলা সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়ে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো পূর্ব লন্ডনে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী নাট্যোৎসব। এবারের প্রতিবাদ্য বিষয় হলো Hope (আশা)। আশা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারেনা। এবারের নাটকগুলো দর্শকদের অন্ধকার থেকে আলোতে আসবার আশার বাণী শোনাচ্ছে।

ট্রিওআর্টস এর প্রযোজনায় ‘আশালতা’ মঞ্চস্থ হয়েছে পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে। ট্রিওআর্টস লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠন, গত পাঁচ বছর ধরেই তারা কাজ করে চলেছে। প্রতি বছর তাদের নতুন নাটক নিয়ে দর্শকদের মাঝে উপস্থিত হয়, এবছরেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি।

ট্রিওআর্টস এর প্রযোজনা ‘আশালতা’ লিখেছেন শায়লা শারমিন এবং নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় ছিলেন রুবাইয়াৎ শারমিন ঝরা। এবারের নাট্যোৎসবের বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘আশা’। ‘আশালতা’ নাটকের প্রধান দুটি চরিত্র কেয়ারার আশা এবং একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু সামীর – আর এ দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঝরা ও ঈহান। তাঁদের দু’জনের সম্পর্কের মাধ্যমে শায়লা শারমিন দেখাতে চেয়েছেন মানুষ কিভাবে পরগাছার মতো একে অপরের উপর অবলম্বন করে বেঁচে থাকে এবং অসহায় মানুষও সুযোগ পেলে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে।

এ নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ব্রিটেনে অবস্থানরত একটি ব্রিটিশ বাংলাদেশী পরিবারের একজন অসহায় মা (মেহবুবা লিথি) প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে তাঁর বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুটিকে নিয়ে। কিন্তু এই সামাজিক অবস্থা ভেঙ্গে কেয়ারার এর সহযোগিতায় শিশুটি পিয়ানো বাদক হিসেবে প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়। নাটকে দেখানো হয়েছে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা ও পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ পেলে একজন অটিস্টিক শিশুও হয়ে উঠতে পারে সমাজ ও দেশের সম্পদ। অন্য দশটা শিশুর মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে সক্ষম হয়।

নির্দেশক রুবাইয়াৎ শারমিন ঝরা ‘আশালতা’ নাটক নিয়ে বলেন, “আমাদের কমিউনিটিতে এ ধরনের অসহায় মানুষগুলো যে এখনও পুরোপুরিভাবে গ্রহণযোগ্য নয় তা ফুটিয়ে তোলাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য।”

নাটকে সামীরের ভূমিকায় দারুন অভিনয় করেছে ঈহান শাহীদ রৌদ্র, আরো যারা অভিনয় করেছেন তাঁরা হলেন মা- মেহবুবা লিথি, আবীর- আযান চৌধুরী, সোনিয়া – কাজী ফারহানা আকতার, তামান্না – রুমি হক, পিয়ানো শিক্ষক – সাদেক আহমাদ চৌধুরী এবং কেয়ারার – রুবাইয়াৎ শারমিন ঝরা। এখানে উল্লেখ্য যে আবীর, সোনিয়া এবং তামান্নার এটি প্রথম মঞ্চ নাটক। এছাড়াও আবহ সঙ্গীতে ছিলেন আয়হাম শাহীদ, সার্বিক সহযোগিতায় সাদেক আহমেদ চৌধুরী, অপু চৌধুরী, মেসবাহ শাহীদ, মাসুদ জামান এবং শাহ্‌নূর হোসেন। ট্রিও আর্টস বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ কাজী রুকসানা বেগম, সুদীপ চক্রবর্তী, নাঈম হাসান সুজা, রোকসানা খান, মুশাহেদ আহমেদ এবং শামীম আহসানের কাছে তাঁদের অব্যাহত সমর্থনের জন্য।

আশালতা নাটক দেখার সময়ে আবেগে অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। দর্শকদের অনেকেই প্রশংসা করে তাঁদের মতামত/প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

নাট্য ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ রশিদ বলেন, ‘ আমার ছেলে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, মানুষ তাঁকে ঝামেলা বলে মনে করে। ছোটবেলায় বন্ধুরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিতো তারপর আস্তে আস্তে সব বন্ধ হয়ে যায়। আমি এই নাটকে সামীর চরিত্রের মাধ্যমে আমার ছেলের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছি। এ নাটক আরও তুলে ধরেছে যে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুরা আমাদের সমাজেরই অংশ, তাঁদের অবহেলা করা উচিৎ নয়। আমি এই নাটক থেকে কিছু মূল্যবান তথ্য পেয়েছি যা আমি আমার ছেলের জন্য কাজে লাগাতে পারবো।’

সংগঠক মোহাম্মদ আজিজ বলেন, ‘ লন্ডনে এযাবৎ যত বাংলা মঞ্চ নাটক দেখেছি তার মধ্যে অন্যতম ছিল নাটক ‘আশালতা’। অতি সাধারণ ধারণা নিয়ে যে মানবিক গুণাবলী সমন্বয়ে সম্পূর্ণ সময় দর্শকদেরে বিস্ময়কর অনুভূতির মধ্যে শেষ অবদি পর্যন্ত গ্যালারিতে অপলক চোখে বসিয়ে রাখার কৃতিত্ব নাট্যকারের ও পরিচালকের মেধা ও পরিশ্রমের ফসল। যে কারনে অবুঝ কমলমতি শিশুর অভিনয়ও দর্শক নন্দিত হয়েছে।’

সংস্কৃতি জন ঊর্মি মাযহার বলেন, ‘ নাটকটি খুব শক্তিশালী এবং খুব আবেগপূর্ণ ছিল। আমরা দর্শকেরা সামিরকে স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিয়ে উৎসাহিত করতে চাই এবং বলতে চাই তুমি দুর্দান্ত এবং তুমি সক্ষম।’ তিনি আরও বলেন, ‘ এটি মনে রাখার মতো একটা সন্ধ্যা ছিল। আমি সামিরের অভিনয় দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েছি । এতো সুন্দর সে অটিস্টিক ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছে যা আমাকে আমির খানের ‘তারে জমিন পার’-সিনামার অটিস্টিক ছেলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। অনেক শুভকামনা সামীর ও আশালতা দলের জন্যে।’

সঙ্গীত শিল্পী লুসি রহমান বলেন, ‘এটি একটি বিস্ময়কর নাটক ছিল, পুংখানুপুংখভাবে উপভোগ করেছি। বিশেষ করে দুই ভাই – ক্ষুদে দু’ শিল্পীর অভিনয় আমাদের মুগ্ধ করেছে। মা এবং কেয়ারারের অভিনয়ও ভালো হয়েছে। শুভ কামনা রইলো আগামীর জন্যে।’

রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী ডঃ ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ নাটকটি পুরোপুরিভাবে উপভোগ করেছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর ভূমিকায় অভিনয়রত ঈহান শাহীদ রৌদ্র এর অভিনয়।’

বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক উপ মহাপরিচালক বলেন, ‘আমি নাটকটি দেখতে পারিনি তবে ছবি ও ভিভিও দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আমাদের বাংলাদেশ টেলিভিশনের নৃত্য এবং অভিনয় শিল্পী ঝরার অনবদ্য সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞ বিদেশের মাটিতে এদেশের সংস্কৃতিকে ধারণ করা এবং প্রচারে নিরলস প্রচেষ্টা দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ভীষণ ভাবে গর্বিত। অনেক ভালবাসা দোয়া আর শুভ কামনা রইল।’

বাংলাদেশ লোক নাট্যদল (টিএসসি) এর কঞ্জুস নাটকের সাবেক পরিচালক ঈমামুল হক কিসলু বলেন, ‘ ঝরাকে অভিনন্দন। গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়ে বৃহত্তর সম্প্রদায় সচেতনতা তৈরিতে থিয়েটার ব্যবহার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ।’

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাবীব রহমান বলেন, ‘আশালতা নাটক দেখার সময়ে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।’

ট্রিও আর্টস এর কর্ণধার রুবাইয়াৎ শারমিন ঝরা ‘আশালতা’ নাটকের নেপথ্যের কাহিনী তুলে ধরে বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য সমাজের অবহেলিত দিক গুলো নিয়ে কাজ করা। তাই প্রতিবারের মতো এবারও আমরা এমন কিছু নিয়ে ভাবছিলাম যেটি একটু ভিন্ন হতে হবে । যখন আমরা জানতে পারি যে ‘সিজন অব বাংলা ড্রামার’ ২০২৪ এর থিম ‘আশা’ তখন আমি বাংলাদেশে অবস্থিত ট্রিও আর্টস এর ডিরেক্টর নাঈম হাসান সুজা এবং লেখিকা ও উপন্যাসিক ফারিদা আহমেদ নিকু’র সাথে কথা বলি এবং লোক নাট্যদল টিএসসি’র নাট্যকার শামীম আহসানকে একটি স্ক্রিপ্ট লেখার জন্যে অনুরোধ করি। তিনি বেশ কয়েক মাস পরে আমাকে ‘আশালতা’ নামে একটি স্ক্রিপ্ট পাঠান যা আমার মনে আশার সঞ্চার করে। পরে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর মেহবুবা লিথি’র সাথে কথা বলে কেয়ারারদের নিয়ে গল্প লেখার কথা ভাবি। তারপর ট্রিও আর্টস এর লেখিকা শায়লা শারমিনকে অটিসম বা ডিমেন্সিয়া’র সাথে কেয়ারারের ভূমিকা নিয়ে লিখতে অনুরোধ করলে শায়লা শারমিন অটিসম নিয়ে লিখতে সম্মতি জানায় কারন সে ‘লুসি’ নামের একটি অটিস্টিক বাচ্চার অনুষ্ঠান দেখে আবেগপূর্ণ হয়েছিলো। আর এভাবেই ‘আশালতা’র জন্ম হয়। আশালতা টিম এর সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ তাঁদের মূল্যবান সময় এবং সহযোগিতার জন্যে, বিশেষ করে সামির (ঈহান) ও আবীর (আযান) এবং তাঁদের পরিবারের কাছে। দর্শকদের উৎসাহ পেলে ভবিষ্যতেও আরও ভালো কাজ করতে পারবেন বলে আশা রাখেন তিনি।
আগামী ২৪শে নভেম্বর ‘ঘুর্ণি’ নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে শেষ হবে মাসব্যাপী নাট্যোৎসব।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026