বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৬:৫৭

দেশজুড়ে আতঙ্ক

জনপদ থেকে জনপদ। গ্রাম থেকে শহর। আতঙ্ক সর্বত্র। গুলি আর বোমার শব্দে কেঁপে উঠছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় শুরু হয়েছে
যৌথবাহিনীর অভিযান। যদিও এ অভিযানের মধ্যেই সাতক্ষীরায় গতকালও আওয়ামী লীগের এক নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত ২২ দিনে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ১১৫ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ১৪ জন। অগ্নিদগ্ধ ৮৩ জন শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকেই চিকিৎসা নিয়েছেন। অর্ধশত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুমের ঘটনাও ঘটেছে। পেট্রল বোমা আর ককটেল বিস্ফোরণ এখন নিয়মিত ঘটনা। পুলিশের ওপর হামলা এবং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মীদের বাড়িতে ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে চরম আতঙ্ক। মানুষের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ।

বাংলাদেশে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল বিএনপি অভিযোগ করেছে, সরকার হিটলিস্ট করে বিরোধী নেতাদের হত্যা করছে।

সরকার হিটলিস্ট তৈরি করে হত্যা করছে বিরোধী নেতাদের: বিএনপি

সরকার হিটলিস্ট তৈরি করে বিরোধী নেতাকর্মীদের হত্যা করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, সরকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে আন্দোলনকে দমানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- তার প্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে হামলা হচ্ছে। যৌথ বাহিনী নামিয়ে সরকার হিটলিস্ট তৈরি করে বিরোধী নেতাকর্মীদের হত্যা শুরু করেছে। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পরও যৌথবাহিনী দিয়ে জেলায় জেলায় ১৮ দলীয় জোটের নেতাদের হত্যা-গুম করার দায় থেকে নির্বাচন কমিশন রেহাই পেতে পারে না। আজ্ঞাবাহী নির্বাচন কমিশনকে ভবিষ্যতে অবশ্যই এসব ঘটনার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, সোমবার রাতে পুলিশ ও র‌্যাবের একটি দল লক্ষ্মীপুর সদর বিএনপি নেতা আবদুল মান্নান ও যুবদল নেতা খোরশেদ আলম সুমনকে শহরের বটতলী খালেরপাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া বিল্লাল নামে এক কর্মীকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে তার সন্ধান মেলেনি। গ্রেপ্তারের নামে পুলিশ ও র‌্যাব পরিচয়ে একটি সংস্থা বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি হামলা, লুটপাট ও নেতাদের আটক করছে। পরে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এমন গুমের কারণে লক্ষ্মীপুরের মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

এছাড়া সোমবার যশোর সদর পৌর ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ হোসেনকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। এভাবে গতকয়েক দিনে লক্ষ্মীপুর, জয়পুরহাট, সাতক্ষীরা, নীলফামারী, নোয়াখালী, লালমনিরহাট ও যশোরে আমাদের ২৫ জনের মতো নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। অবরোধের প্রথম দিন সারা দেশে ৩ জন নিহত ও ২৫১ জন আহত হয়েছে। নজরুল ইসলাম খান বলেন, সোমবার রাতে বিএনপি’র সাবেক তথ্য সম্পাদক এহসানুল কবিরকে তার বাসা থেকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে। তার স্ত্রী জানিয়েছেন কবির কোথায় আছেন তা তিনি এখনও জানেন না। অবিলম্বে হত্যা, গুম, নির্যাতন বন্ধ করে চলমান রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, সরকার এই তামাশার নির্বাচনে বানরের পিঠা ভাগের মতো সংসদীয় আসনগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। দেশের ৯ কোটি ভোটারদের মধ্যে ইতিমধ্যে ৫২ শতাংশ ভোটারদের ভোটদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কারন ভোট প্রার্থনা করার মত তাদের নৈতিক মনোবল আর অবশিষ্ট ছিল না এবং বাকী ১৪৬টি আসনেও তারা আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে পিঠা ভাগাভাগি করার নির্লজ্জ কৌশল নিয়ে জনমতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, যে নির্বাচনে সরকারি দল এবং সম্ভাব্য বিরোধী দলের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল আসন ভাগাভাগি করে দেয় সেই নির্বাচন অবশ্যই একটি পাতানো নির্বাচন। এমন নির্বাচন জনগণের প্রত্যাশিত নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়। তাই এই নির্বাচনী নাটক অবিলম্বে বন্ধ করুন। নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা আগেই বলেছি দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে কে কোথায় প্রার্থী থাকবেন, তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতবেন নাকি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি বনে যাবেন- এসবই আগে ভাগে সরকার নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এ ধরনের ভাগাভাগির কথা প্রধানমন্ত্রী নিজেই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। এ ধরনের তামাশার নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করা বিরোধী দলগুলোর দায়িত্ব এবং এ ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার অবশ্যই জনগণের অনির্বাচিত সরকার। তাই নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ‘দশম জাতীয় সংসদ নিয়ে আলোচনার আর কোন অবকাশ নেই- একাদশ সংসদের বিষয় নিয়ে সংলাপ হতে পারে’- যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন নজরুল ইসলাম খান।

তিনি বলেন, যোগাযোগ মন্ত্রী সরকারের পক্ষ থেকে নাকি দলের পক্ষ থেকে নাকি উভয় পক্ষ থেকে নাকি শুধুই নিজের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য দিয়েছেন আমরা জানি না। কিন্তু আমরা সবাই এটা জানি যে, তার বক্তব্যের সঙ্গে সরকারের অন্য মন্ত্রী ও নেতাদের বক্তব্যের কোন মিল নেই। এমন গরমিল আর গোঁজামিল দিয়েই চলছে এই সরকার। সরকার ও সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এমন বিভ্রান্তিকর ও আজগুবি বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি। নজরুল ইসলাম বলেন, সরকার সংবিধান রক্ষার মোড়কে একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলনের চিরস্থায়ী পথ সুগম করার স্বপ্নে দেশে যে গৃহযুদ্ধের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে- তা এক ভয়াবহ অশনি সংকেত। তামাশার এই নির্বাচনের স্বীকৃতি দেশে-বিদেশে কোন মহলেই মিলবে না। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টে ও যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসে বাংলাদেশ নিয়ে যে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশকে নিয়ে শুনানির কথা আমরা শুনছি- তা বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক।
সরকারের দমনপীড়নে সুযোগ নিচ্ছে অন্যরা

সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমনপীড়ন করায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যরা হস্তক্ষেপের সুযোগ পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাসের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। পাকিস্তানি হাইকমিশনারকে তলব করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার জন-আন্দোলন দমাতে গিয়ে জনগণকে বিভক্ত করে দেশ বিভক্ত করেছে। তাই অন্য দেশ এ ধরনের প্রস্তাব পাস করতে পারছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ জানানো সরকারের দায়িত্ব। সরকারের আরও আগেই এর প্রতিবাদ জানানো উচিত ছিল। সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা সবসময়ই বলে আসছি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিএনপি চায়। কিন্তু সেটা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। তবে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে না। তারা করছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। যুদ্ধাপরাধ আর মানবতাবিরোধী অপরাধ এক নয়। তিনি বলেন, সরকারের মানবতাবিরোধী বিচারের কিছু কিছু বিষয় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রশ্ন তুলেছে।

সাতক্ষীরায় যৌথবাহিনীর অভিযানের মধ্যেই আওয়ামী লীগ নেতা খুন, বুলডোজার দিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের বাড়ি ভাঙচুর
নূর ইসলাম, সাতক্ষীরা থেকে জানান, যৌথ বাহিনীর অভিযান চললেও সাতক্ষীরা পরিস্থিতি থমথমে। গতকাল অভিযানচলাকালেই আওয়ামী লীগ নেতা ইউপি চেয়ারম্যানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সহায়তায় বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। চলছে লুটপাট-অগ্নিসংযোগ। আতঙ্কে পুরো জেলার মানুষ। এদিকে অবরোধ এবং হরতাল চলাকালে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জেলাজুড়ে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিনকে (৬৫) কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বিকাল ৪টায় কালীগঞ্জের চৌমুহনী বাজারে হরতাল চলাকালে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী মোসলেমকে কুপিয়ে হত্যা করে। তার বাড়ি উপজেলার চাচাই গ্রামে। কালীগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করে বলেন, সকাল থেকে বিষ্ণুপুর এলাকায় যৌথবাহিনী অভিযান পরিচালনা করছিল। এ অভিযানে সহযোগিতা করছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মোসলেম উদ্দীন। যৌথবাহিনীর অভিযান শেষে সেখান থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথে হরতাল সমর্থকরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করেছে। খবর পেয়ে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর ঘটনাস্থলে যান এবং এ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আটক ও শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। এদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে সন্ধ্যায় কালীগঞ্জ বাজারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। মোসলেম উদ্দিনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পুলিশ মর্গে পাঠিয়েছে। এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

হরতাল পালিত: জামায়াতের ডাকে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। হরতালের সমর্থনে ফজরের নামাজের পরপরই নেতাকর্মীরা জেলা ও উপজেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে পিকেটিং করে। জেলা শহরের বাইরে বিভিন্ন ফিডার রোডগুলোতে হরতালের সমর্থনে বিদ্যুতের খাম্বা, গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধ করে। অন্যদিকে সকাল ৮টায় শহরের কেষ্ট ময়রার মোড়ে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলার তালা, আশাশুনি, দেবহাটা, কালীগঞ্জ, শ্যামনগর, কলারোয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে হরতালকারী জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে গত রাতে জেলার জামায়াত অধ্যুষিত সদর উপজেলার আগড়দাঁড়ি, কাথন্ডা, সাতানী, কদমতলা, বৈকারী, ঝিকড়া, বেলনগর, শিকড়ী, দেবহাটার হিজলা, সাতবাজার, জিয়ানগর, পাকিস্তানপাড়া, বেলঘাট, কলারোয়ার কাকডাঙ্গা, মৌতলা, বকশীবাজার, বিরানীতলা, লক্ষ্মীকুন্ডু, তালার ১৮ মাইল, বেজীতলা, পদ্মেরচরাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি’র যৌথবাহিনী। তবে গতকালের এ অভিযানে কোন প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও অভিযান চলাকালে বিক্ষুব্ধ জনতা জামায়াত শিবিরের বেশ কিছু বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে এভাবে জ্বালাও-পোড়াও ও লুটপাট ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায় তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এসব অভিযানের নেতৃত্ব দেন পুলিশের অতিরিক্ত সুপার জয়দেব চৌধুরী, ৩৮ বিজিবির সিও লে. কর্নেল ইমাম, টুআইসি মেজর আজিজ ও ৩ জন এএসপি। জেলার সদর ছাড়াও জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত বিভিন্ন উপজেলায় গতরাতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের নেতৃত্বদানকারীদের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যৌথবাহিনী যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ও জনজীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এমন সব কর্মকাণ্ড যাতে কেউ করতে না পারে এ জন্য রাতভর বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান চালায়। তবে যেহেতু গতকাল রাতের অভিযানে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বড় ধরনের কোন বাধা আসেনি, সেহেতু কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

তবে বিভিন্ন এলাকায় মামলার আসামি জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের আটক করতে গেলে কিছুটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। কৌশলে তা দমন করতে সক্ষম হয় যৌথবাহিনীর সদস্যরা। এদিকে রাতভর চলা এ অভিযানে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জামায়াত-শিবিরের ১৫ নেতাকর্মীকে আটক করেছে যৌথবাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া জেলা জামায়াতের আমীর সাবেক এমপি মাওলানা আবদুল খালেককে ধরতে দ্বিতীয় দফায় গত রাতে আগড়দাঁড়িতে তার বাড়িতে অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় যৌথবাহিনীর সদস্যরা বেশ কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এতে রফিকুল ইসলাম আলেয়া বেগম, জোসনা বেগম, সাজ্জাদ হোসেন, মোবারক আলীসহ কমপক্ষে ৫-৭ জন গুলিবিদ্ধ হয়। এদের মধ্যে ৩ জনকে পুলিশ আটক করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় যৌথবাহিনীর নির্দেশে দ্বিতীয় দফায় মাওলানা আবদুল খালেকের বাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়।

এদিকে জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান অভিযোগ করেছেন, যৌথবাহিনীর উপস্থিতিতে সদর উপজেলা পশ্চিম জামায়াতের আমীর আবদুল গফ্‌ফারের বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে একদল সন্ত্রাসী। তারা ধারণা করছেন, পুলিশের ইঙ্গিতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এসব বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করছে।

বিএনপি নেতার বাড়িতে বুলডোজার: যৌথবাহিনীর অভিযানে গতকাল সকাল ১০টায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আগরদাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আনারুলের কদমতলা এলাকায় অবস্থিত দোতলা বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তারা বুলডোজার দিয়ে তার বসতবাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় সাংবাদিকরা ছবি তুলতে চাইলে যৌথবাহিনীর সদস্যরা সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয় এবং অপমান করে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে।

এ ছাড়া সোমবার গভীর রাতে পাটকেলঘাটা থানা পুলিশ ও যৌথবাহিনীর অভিযানে আটক হয়েছে দুই সহোদর। এ সময় তালা উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক গাজী সুজায়েত আলী, সহ-সেক্রেটারি অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা রেজাউল করিম, এড. বাসারাতুল্লাহ আওরঙ্গী বাবলাসহ কয়েকজন জামায়াত নেতার বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জামায়াত নেতাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ: সোমবার সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা জেলা শাখার আমীর সাবেক এমপি অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল খালেক, সদর আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল গফফারের বাড়িঘর ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবার ও স্থানীয়রা। সন্ধায় জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম ও জেলা সদরের সাতানি ভাঁদড়া গ্রামে সদর পশ্চিম জামায়াতের আমীরের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। তাদের বাড়িতে না পেয়ে যৌথবাহিনীর নির্দেশে একদল উত্তেজিত জনতা তাদের বসতবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াত নেতারা। রাতে অভিযান চালানো হয় জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ আবদুল খালেকের শহরের খলিল নগর বাড়িতে। এ সময় বাড়িতে তাকে না পেয়ে বুলডোজার দিয়ে তার দোতলা ভবনটি গুঁড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এতে ভবনটি এক পাশে হেলে পড়ে। পরে জামায়াতের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে বুলডোজার এলাকা ছাড়ে।

শ্যামনগরে আটক ৬: আমাদের শ্যামনগর প্রতিনিধি জাহিদ সুমন জানান, গত সোমবার দিনগত রাত ২টার দিকে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি’র যৌথ বিশেষ অভিযানে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের ৬ জন আটক হয়েছে। সূত্র জানায়, অবরোধের নামে রাস্তায় গাছ কাটা, অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে এদের আটক করা হয়। ৩৪ বিজিবি’র সিও লে. কর্নেল আনোয়ারুল আলমের নেতৃত্বে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি’র যৌথ অভিযান পরিচালনা করে উপজেলার খানপুর ও শ্রীফলাকাটি গ্রাম থেকে ৬ জনকে আটক করে। আটক ব্যক্তিরা হচ্ছে খানপুর গ্রামের গহর আলী চৌকিদরের পুত্র আরশাদ আলী (৪৮), আকছেদুর রহমানের পুত্র আনিছুর রহমান (৩১), আ. মালেকের পুত্র আকতার হোসেন (২২), আরশাদ আলীর পুত্র আবদুল হামিদ (৪৭) এবং শ্রীফলকাঠী গ্রামের আদম আলী গাজীর পুত্র আবদুল জলিল (২৮), জেহের আলী মোল্যার পুত্র মহাসিন আলী (৩৫)। অবরোধের কারণে আটককৃতদের শ্যামনগর থানা হাজতে রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও মোটরসাইকেল চুরি মামলায় একজনকে আটক করা হয়েছে। ৩৪ বিজিবি’র টুআইসি মেজর মেহেদি বলেন, বিভিন্ন মামলার তালিকাভুক্ত আসামিসহ নাশকতা সৃষ্টিকারীদের আটক করতে এ ধরনের যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সাংবাদিক লাঞ্ছিত: এদিকে ১৮ দলের ডাকা ৭২ ঘণ্টার অবরোধ ও মঙ্গলবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল শেষে গতকাল বিকালে সাতক্ষীরা শহরের কদমতলা মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ১৮ দলের নেতাকর্মীরা। পরে পুলিশ এসে ধাওয়া করলে অবরোধকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় পুলিশি ধাওয়া ও অবরোধকারীদেও পাল্টা হামলার ছবি তুলতে গেলে পুলিশ দৈনিক প্রবাহের সাংবাদিক শহিদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয় এবং দৈনিক গ্রামের কাগজের সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি এস এম রেজাউল ইসলামকেও অপদস্ত করে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করে ।

সাংবাদিকরা এর কারণ জানতে চাইলে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও দ্বিতীয় দফায় সাংবাদিকদের সঙ্গে চরম অসৌজন্য আচরণ করেন। সকাল ৭টায় শহরের রামচন্দ্রপুর মোড় এলাকায় অবরোধ করে পিকেটিং করে জামায়াত-শিবির। পরে পুলিশ এসে টিয়ারশেল মেরে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সেখানেও পুলিশ ফটো সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এসব বিষয়ে প্রশ্ন করলে এডিশনাল এসপি জয়দেব চৌধুরী বলেন, পুলিশ সদস্যদের মাথা ঠিক নেই। তা ছাড়া জামায়াত-শিবির কর্মীদের তাণ্ডব থামাতে হিমশিম খাচ্ছে। তার মধ্যে আপনাদের না ঢোকাই ভাল।

অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও সহিংসতা বন্ধের আহ্বান এইচআরডব্লিউ’র

মানবজমিন ডেস্ক জানায়, বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রকাশ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র অথবা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করার জন্য নির্দেশ দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে তারা জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি সহ সব রাজনৈতিক দলকে তাদের সমর্থকদের সহিংসতা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাতে বলেছে।

এক প্রতিবেদনে তারা বলেছে, বাংলাদেশে যে সহিংসতা হচ্ছে সে বিষয়ে বিলম্ব না করে, কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা উচিত সরকারের, যাতে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় নেয়া যায়। কয়েক দিনে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে দৃশ্যত নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অপারেশন জোরদার করেছে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা হামলা চালিয়েছে থানায়, সরকারি ভবনে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও হিন্দু সমপ্রদায়ের ওপর। রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা সংঘর্ষের সময় কমপক্ষে ২০ জন বিরোধীদলীয় সদস্যকে হত্যা করেছে। আটক করেছে অনেককে। এ বিষয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড এডামস বলেছেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারী ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা ভয়াবহ হামলায় জড়িত রয়েছে।

এতে ঘটছে হত্যা, ভাঙচুর ও ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। জামায়াতে ইসলাম ও বিরোধী অন্যান্য দল হয়তো প্রতিবাদ করার যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে পারে। তবে তাদের সমর্থকদের সহিংসতাকে বৈধতা দেয়ার জন্য এটা কোন অজুহাত হতে পারে না। এ প্রতিবেদনটি তৈরি করতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সামপ্রতিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের ও আইন প্রয়োগকারীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাতে বেশ কিছু আহত ব্যক্তির সাক্ষাৎকারও তুলে ধরা হয়। ৮ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে গত দু’মাসে বাংলাদেশে কমপক্ষে ১০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক শ’।

১৪ই ডিসেম্বর র‌্যাব সদস্যরা জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্মীপুর জেলা ইউনিটের নায়েবে আমীর ফয়েজ আহমেদ (৬৬)-এর বাড়িতে প্রবেশ করে। তার স্ত্রী মারজিয়া বেগম বলেছেন, তারা ঘরে ঢুকে তার স্বামীকে বাসার ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে তার মাথায় গুলি করে এবং তার দেহ নিচে ফেলে দেয়। ফয়েজ আহমেদকে গুলি করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন র‌্যাব-এর এক মুখপাত্র। তিনি বলেছেন, ফয়েজ আহমেদ পালিয়ে যাওয়ার সময় নিচে পড়ে যান। র‌্যাবের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। তা হলো আটক ব্যক্তি পালিয়ে যাওয়ার সময় অথবা ক্রসফায়ারে পড়ে নিহত হয়েছেন এমন দাবি। বাংলাদেশ সঙ্কটের আরও অবনতি হয়েছে। এটা হয়েছে ১২ই ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়াকে কেন্দ্র করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও লিখেছে, জামায়াত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তাদের অনেক সহকর্মীকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে পুলিশ অসদাচরণ করেছে। ২৬শে নভেম্বরে নোয়াখালীর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন এক ব্যক্তি। তিনি বলেছেন, ওই ঘটনায় পুলিশ এক জামায়াত নেতাকে আটক করে। তার আগে তার পায়ে গুলি করে। এই প্রত্যক্ষদর্শী আরও বলেছেন, তিনি বিক্ষোভ চলাকালে সে স্থান থেকে চলে যাওয়ার সময় তাকে গুলি করা হয়। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিক্ষোভকারীরা যে সহিংসতা করেছে তার পক্ষপাতহীন তদন্ত করতে বাংলাদেশ সরকার বাধ্য। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী অন্যায়ভাবে শক্তি প্রয়োগ করছে কিনা তা-ও তদন্ত করতে তারা বাধ্য। যদি এমন ঘটনায় কেউ দায়ী হয় তাহলে তাকে বিচার করতে সরকার বাধ্য। অতীতে এমন ঘটনায় সরকার কোন পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে এমন প্রামাণ্য তথ্য থাকার পরও সরকার কোন পদক্ষেপ নেয় নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত প্রকাশ্যে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শক্তি ও অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কিত জাতিসংঘের মৌলিক নীতিগুলো অনুসরণ করতে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার প্রতিবেদনে আরও লিখেছে, বিরোধী দলের সদস্য ও তার সমর্থকরা সহিংসতা ঘটিয়েছে এমন অনেক প্রমাণ তাদের কাছে আছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের এক চিকিৎসক হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, তিনি বোমা হামলায় অগ্নিদগ্ধ ৮৩ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন। এর মধ্যে ১৪ জন মারা গেছেন। এক ডজনেরও বেশি রোগী ও তাদের আত্মীয়রা বলেছেন, তারা দেখতে পান নি কে বা কারা বোমা হামলা করেছে। অন্যরা অবশ্য হামলাকারীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের মতে, এ হামলাকারীরা বিরোধী দলের সমর্থক। এতে আরও বলা হয়, নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যদের ওপর জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির ও বিএনপির সমর্থকরা অগণিত হামলা চালিয়েছে। থানায় হামলা করা হয়েছে হাতে তৈরী গ্রেনেড ও পেট্রল বোমা দিয়ে। সড়ক অবরোধে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। রেল গাড়ি লাইনচ্যুত করা হয়েছে। হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। গ্রেনেড ছোড়া হচ্ছে রাজপথে জনতার ভিড়ে। শুধু সাতক্ষীরা জেলায় ক্ষমতাসীন দলের কমপক্ষে ১২ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। সহিংসতায় নিহত হয়েছে শিশুরা-ও।

নিরাপদ নন কেউই: রূপগঞ্জ আগারপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র শান্ত। খালার বাসায় বেড়াতে এসেছিল ঢাকায়। গত শুক্রবার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের মাঝে পড়ে যায় সে। পুলিশের গুলিতে ক্ষত-বিক্ষত হয় ছোট্ট শিশুটি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গুলি আর সহিংস আন্দোলনের প্রেক্ষিতে কেউই আসলে নিরাপদ নয়। গত ২৮শে নভেম্বর শাহবাগে গাড়িতে পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ১৯ জন যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হন এতে। মারা যান চার জন। বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধদের দেখতে গেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গীতা সেন নামের আহত একজন বলেন, আমরা অসুস্থ রাজনীতি চাই না।

শাহবাগ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তবে সবচেয়ে বেশি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে ঢাকাতেই। যদিও রাজধানীতেই বিরোধী জোটের আন্দোলনের তীব্রতা সবচেয়ে কম। ককটেল বিস্ফোরণে অনেক শিশুও আহত হয়। গত ৩রা ডিসেম্বর মিরপুরে লিমা নামের এক শিশু ককটেল বিস্ফোরণে আহত হয়। সামপ্রতিক আন্দোলনে ককটেল বিস্ফোরণে ঠিক কত সংখ্যক মানুষ আহত হয়েছেন তা নিশ্চিত করা না গেলেও কয়েক শ’ মানুষ এতে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অতীতে হরতাল-অবরোধে মানুষ দূরের যাত্রার ক্ষেত্রে ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু গত ২৬শে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিরোধী জোটের সর্বশেষ ধারাবাহিক অবরোধ কর্মসূচিতে রেলপথের যোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন উৎপাটন করা হয়, অগ্নিসংযোগ করা হয় ট্রেনে। বেশ কয়েকটি ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

সূত্র:মানবজমিন




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026