আজ শুক্রবার। পবিত্র জুমাবার। আজকের বিষয় ‘পবিত্র কুরআনে মুহাম্মদ (সা.) এর রিসালত’। শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইমাম মাওলানা নুরুর রাহমান।
পবিত্র কুরআনে মুহাম্মদ (সা.) এর রিসালত
মানব জাতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে যুগে যুগে এ ধরাধামে অসংখ্য মহামানবের আগমন ঘটেছে। তারা মহান আল্লাহর বাণী লাভে ধন্য হয়ে মানুষকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। এসব মহা মানব আল্লাহ তা‘আলার একান্ত বান্দারূপে রিসালাত লাভে ধন্য হয়েছেন।
রিসালাত কোনো শিক্ষা, যোগ্যতা বা অর্জনযোগ্য বিষয়ের নাম নয়। দক্ষতা, মেধা বা প্রতিভা দিয়ে এটি লাভ করা যায় না। চর্চা, অধ্যবসায়, অনুশীলন ও সাধনা দ্বারা দুনিয়ার অনেক কিছু অর্জন সম্ভব হলেও নবুওয়াত ও রিসালাত অর্জন সম্ভব নয়। এটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তা‘আলার মনোনয়ন। মহান আল্লাহর পয়গাম মানব জাতির কাছে বহন করে আনা এবং তা প্রচার করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ নবী-রাসূল মনোনীত করেন। এ মর্মে কুরআনে এসেছে:
﴿ٱللَّهُ يَصۡطَفِي مِنَ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ رُسُلٗا وَمِنَ ٱلنَّاسِ﴾ [الحج: ٧٥] ‘‘আল্লাহ ফিরিশতার ও মানবকুল থেকে রাসূল মনোনীত করে থাকেন।’’ [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৭৫]
এ আয়াতে যে সত্যটি ফুটে উঠেছে তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤﴾ [النجم: ٣، ٤]
‘‘প্রত্যাদেশকৃত ওহী ভিন্ন তিনি মন থেকে কোনো কথা বলেন না।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪]
তাঁর রিসালাত ছিল পূর্ণাঙ্গ, অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, সুপরিকল্পিত ও সুনিপুণ কর্মকৌশলে ভরপুর। তিনি বিশ্বের বুকে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ দা‘ঈ। বিজয়ী বীর, সফল রাষ্ট্রনায়ক, কৃতী পুরুষ, মহামনীষী, বিজ্ঞানী ও সংস্কারক হিসাবে সমাদৃত। জন্মের পূর্ব থেকেই তিনি অনন্য ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।
রিসালাতের পরিচয়:
রিসালাত আরবী শব্দ, যার মূল ধাতু হলো (ر س ل) রা, সিন, লাম। সাধারণ অর্থে যা কিছু প্রেরণ করা হয় তাকেই আমরা রিসালাত বলে জানি। যেমন কোনো চিঠি প্রেরণ। এটি একবচন, বহুবচনে الرسالات বা رسائل ব্যবহৃত হয়। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে রিসালাতের শাব্দিক অর্থ হলো: বার্তাবহন বা দৌত্যকার্য। সম্বোধন বা খিতাব, কিতাব, লিখিত ছহীফা, লিখিত বিষয়বস্তু বা মাকতুব। বক্তব্য যা কোনো ব্যক্তি অন্যের নিকট প্রাপ্ত হয়ে বহন করে নিয়ে আসে, চাই সেটা লিখিত হোক অথবা অলিখিত প্রভৃতি। ইংরেজীতে একে Message, letter, Note, dispatch, communication বলা হয়।
ইসলামী শরী‘আতের পরিভাষায় আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন স্বীয় বান্দাদের হিদায়াত লাভের নিমিত্তে তাদের মধ্যে মনোনীত বান্দার মাধ্যমে যে বাণী পাঠিয়েছেন তাকেই রিসালাত বলে। আর যারা এর বাহক তারা হলেন রাসূল। মহান আল্লাহ্ একান্ত স্বীয় ইচ্ছায়ই তাদের মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। এ সম্পর্কে কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَإِنَّهُمۡ عِندَنَا لَمِنَ ٱلۡمُصۡطَفَيۡنَ ٱلۡأَخۡيَارِ ٤٧﴾ [ص: ٤٧]
‘‘অবশ্যই তারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।’’[সূরা ছোয়াদ, আয়াত: ৪৭]
অতএব, আল্লাহ তা‘আলা যাঁদেরকে মনোনীত করেন তাঁদের মধ্যে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ও গুণাবলী জন্মগত ও স্বভাবগতভাবেই সৃষ্টি করে দেন। মক্কার কাফিররা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালাতের অস্বীকৃতি জানাতে চাইলে অত্যন্ত দীপ্ত কণ্ঠে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন: ﴿ٱللَّهُ أَعۡلَمُ حَيۡثُ يَجۡعَلُ رِسَالَتَهُ﴾ [الانعام: ١٢٤]
“আর আল্লাহ তাঁর রিসালাতের ভার কার ওপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভালো জানেন।’’ [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২৪]
সুতরাং এটি কোনো অর্জনীয় বিষয় নয়। বরং মহান আল্লাহ প্রদত্ত মানবজাতির প্রতি এক সীমাহীন নি‘আমত। সুতরাং মহান রাব্বুল ‘আলামীনের তরফ থেকে জগতবাসী বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন জীবের নিকট বার্তা পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমকে বলা হয় রিসালাত। এই দৌত্যকার্য সম্পন্ন করার কাজে দু-শ্রেণির লোক নিয়োজিত রয়েছেন। তারা হলেন- ফিরিশতা ও মানুষ, যাদেরকে রাসূল বা দূত হিসেবে অভিহিত করা হয়।
আদিকাল হতেই আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জাতির প্রতিই তাদের হিদায়াতের জন্য সতর্ককারী রাসূল পাঠিয়েছেন। এ মর্মে আল-কুরআনে এসেছে: ﴿وَإِن مِّنۡ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٞ﴾ [فاطر: ٢٤] ‘‘আর এমন কোনো জাতি নেই যাদের কাছে সতর্ককারী বা ভীতি প্রদর্শক প্রেরিত হয় নি।’’ [সূরা ফাতির , আয়াত: ২৪] অন্যত্রে এসেছে: ﴿وَلِكُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولٞ﴾ [يونس: ٤٧] ‘‘আর প্রত্যেক উম্মতের জন্যই রয়েছে রাসূল।’’ [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৪৭]

Leave a Reply