সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৫৩

কুইন মেকার

/ ২১
প্রকাশ কাল: বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৩

তাহমিমা আনাম |

বাংলাদেশ পুনরুত্থানের দেশ। এখানে একজন স্বৈরাচারের পতন ঘটানো যায়। তার সম্মানহানি করা যায়। জেল দেয়া যায়। কিন্তু তিনি আবার ফিরে আসেন। দু’দশকেরও বেশি সময় আগে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়েছিল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। এখন তাকে বলা হচ্ছে ‘কুইন মেকার’। সামপ্রতিক রাজনৈতিক কৌশলের কারণে জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে দু’প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যে জয়-পরাজয় নির্ধারণে তিনি এখন মূল অবস্থানে রয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। ১৯৮৩ সালে সেনা সমর্থিত সরকারের প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় এসেছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়াই ১৯৯০ সালের শেষ পর্যন্ত প্রায় এক দশক তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। তারপর প্রধান দু’বিরোধী দল শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও খালেদা জিয়ার বিএনপির নেতৃত্বে ঘটে গণঅভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থান ক্রমাগত এরশাদকে পদত্যাগ করতে চাপ সৃষ্টি করে। সেনাবাহিনী তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। এরপর পতন হয় এরশাদ সরকারের। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাকে দুর্নীতির অভিযোগে পাঠানো হয় জেলে।

এরপর ২০ বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। আবার দাপট বেড়েছে এরশাদের। এ সময়ে ক্ষমতায় একবার এসেছে বিএনপি। আবার এসেছে আওয়ামী লীগ। যদিও হাসিনা ও খালেদা জিয়া এক সময় দেশে গণতন্ত্র পুনঃস্থাপনে আন্দোলনে সহযোগিতা করেছেন তারাই মধ্যবর্তী এ সময়টাতে একে অন্যের তিক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন। যারা তার পতনের জন্য দায়ী, দীর্ঘদিন বিরোধে লিপ্ত, সেই দু’ নেত্রীর মধ্যে দুর্ভাগ্যক্রমে ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠেছেন তিনি।

গভীরভাবে বিভক্ত এখন বাংলাদেশ। উন্নয়ন, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, যুদ্ধাপরাধের বিচার সহ অনেক বিষয়ে রেকর্ড গড়েছেন শেখ হাসিনা। এটা তার বিজয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়া ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতায় যে অর্জন করেছিলেন এসব ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অর্জন অনেক বেশি। কিন্তু দুর্নীতিতে জড়িত মন্ত্রীদের পক্ষ নেয়ায় এবং বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর নিয়মিত দমন-পীড়ন তার অবস্থানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর থেকে বাংলাদেশে নির্বাচন তদারক করে আসছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিশেষ বিতর্কের বিষয়, শেখ হাসিনা জাতীয় নির্বাচন তদারকের সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন। এর পরিবর্তে তিনি নির্বাচনকালীন একটি বিশেষ মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। এ মন্ত্রিসভা সব দলের জন্য উন্মুক্ত। এতে হাসিনা নিজেকে কর্ণধারে পরিণত করেছেন।

দৃশ্যত খালেদা জিয়ার অবস্থান তার চেয়েও খারাপ। তার শেষ মেয়াদের সময় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে তার নিজ পরিবারের সদস্যরা জড়িত বলে অভিযোগ আছে। জঙ্গি বাংলাভাই সহ ধর্মীয় কট্টরপন্থিদের অপ্রত্যাশিত সহিংসতার মধ্যে তিনি দেশ শাসন করেন। যখন খালেদা জিয়া বিরোধী দলে তখন তিনি একগুঁয়ে অসহযোগী হয়ে উঠেছেন। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর তিনি সংসদ বর্জন করে আসছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করলে জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে বর্জন করার হুমকি দিচ্ছেন। এরই মধ্যে কয়েক দফা হরতাল, বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন তিনি। তাতে দেশ অচল হয়ে পড়ে। তিনি শেখ হাসিনার অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে এরশাদ তার পক্ষ থেকে নতুন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়েছেন। শেখ হাসিনা এ নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্যতা আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন খালেদা জিয়া। এমন সময় এরশাদের এই অংশগ্রহণ হাসিনাকে বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে নিতে পারে। যদি খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তাহলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি হতে পারে দেশে নতুন প্রধান বিরোধী দল। তাতে তার বর্তমান প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।

তাই, যখন বাংলাদেশের দু’ শীর্ষ স্থানীয় নেত্রী রাজনীতি নিয়ে কলহে লিপ্ত তখন তার ভিতর দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে এরশাদের সক্ষমতা। বস্তুত, তার অতীত জীবনে যে কলঙ্ক আছে তার অনেকটাই মুছে দিচ্ছে এসব ঘটনা। কখনও কখনও এরশাদের শাসনকে দেখা হয় এমন একজন স্বৈরাচারের শাসন, যা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় আসেন এরশাদ। এর আগে তার পূর্বসূরিকে হত্যা করা হয়। তার পতনের পর গণতান্ত্রিক যে বছরগুলো কেটেছে তাতে দেখা গেছে এত বেশি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নির্যাতন যে, এর সঙ্গে এরশাদের শাসনকাল তুলনা করলে মনে হয় সেটাই অনেকটা ভাল ছিল।

কিন্তু এই ব্যক্তি বাংলাদেশের যে ক্ষতি করেছেন আমাদের নস্টালজিয়া তা দেখে নগণ্য হিসেবে। এরশাদ দুর্নীতিকে ব্যাপক আকারে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছিলেন,  ভবন বিষয়ক প্রকল্পে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন, যাতে তিনি ও তার সহযোগীরা ধনী হয়েছেন। ১৯৮৮ সালে তার সরকার সংবিধান সংশোধন করে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকালীন ধর্মনিরপেক্ষতার যে মূলনীতি ছিল তা অবজ্ঞা করে তিনি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। তার পতন ঘটানো ছিল অনেক কঠিন। এই স্বৈরাচার যদি ফের রাজনীতিতে ফিরতে পারেন তাহলে তার মধ্য দিয়ে সাধারণ ক্ষমার একটি বার্তাই দেয়া হবে।

অন্য কথায় বাংলাদেশের গণতন্ত্রে আরেকটা আঘাত এসেছে। রাজনীতিবিদরা জবাবদিহির বাইরে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিপূর্ণ নয়। হ্যাঁ, বাংলাদেশীরা ভোট দেয়ার অধিকার পেয়েছেন। কিন্তু কার্যত, সেই ভোটের অধিকার তারা প্রয়োগ করেন সংঘাতে লিপ্ত রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে, যারা একে অন্যকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। দু’এক সপ্তাহ আগে, খালেদা জিয়াকে সমঝোতায় আনতে টেলিফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই কথোপকথন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। এটা পড়তে প্যারোডির মতো মনে হয়।

হাসিনা: আমরা ঝগড়া করতে চাই না।
খালেদা জিয়া: আপনি ঝগড়া করছেন।
হাসিনা: আপনি তো একাই কথা বলে চলেছেন। আমাকে কথা বলতেই দিচ্ছেন না।
খালেদা জিয়া: কেন আপনাকে কথা বলতে দেবো? আপনি প্রশ্ন করছেন। আমি জবাব দিচ্ছি।
হাসিনা: আমি তো কথা বলার সুযোগই পাচ্ছি না।

এই তিক্ততার মাঝে এরশাদের মোটেও কথা বলার প্রয়োজন নেই।

তাহমিমা আনাম, লেখক, নৃবিজ্ঞানী। ‘এ গোল্ডেন এজ’ উপন্যাসের লেখিকা।

(২৬শে নভেম্বর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ‘মতামত’ বিভাগে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2021