যুক্তরাজ্য ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছেন। এর আওতায় ভারতে পাঠানো হুইস্কি থেকে শুরু করে ভারতীয় খাবার ও মশলাসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো হবে।
এই চুক্তিতে ভারত যুক্তরাজ্যের বাজারে বিনা শুল্কে তৈরি পোশাক রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের বাজারে ভারতীয় পোশাক, হোম টেক্সটাইল ও পাদুকা প্রবেশে এখন ৮-১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। আজকের চুক্তির পর এই শুল্ক বাতিল করা হবে।
ফলে এখন থেকে বিনা শুল্কে এসব পণ্য রাপ্তানি করবে ভারত। যা ব্রিটিশ ক্রেতাদের জন্য এগুলোর দাম কমাবে। এতে ভারতের তিরুপুর, সুরাট ও লুধিয়ানার মতো পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট অঞ্চলের রপ্তানিকারকেরা উপকৃত হবেন।
দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলা আলোচনার পর অবশেষে আজ বৃহস্পতিবার ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাজ্য সফরকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে বার্ষিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সোনা ও হীরার গয়না, ইমিটেশন গয়না শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করবে, যা ভারতের ছোট ছোট উদ্যোক্তা ও বড় ব্র্যান্ডগুলোকে উৎসাহিত করবে। চামড়ার পণ্যও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
খাদ্যপণ্য ও কৃষিপণ্যের মধ্যে বাসমতী চাল, চিংড়ি, চা ও মসলা (হলুদ, গোলমরিচ, এলাচ) যুক্তরাজ্যে এগুলোর দাম কমবে, যা ভারতীয় কৃষক ও রপ্তানিকারকদের জন্য উপকারী হবে।
কেয়ার স্টারমার এবং নরেন্দ্র মোদি লন্ডনের বাইরে ব্রিটিশ নেতার সরকারি বাসভবন চেকার্সে দেখা করেন। সেখানে যুক্তরাজ্য ও ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস এবং পীযূষ গোয়েল আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে সই করেন।
এ সময় স্টারমার বলেন, ২০২০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার পর এটি ব্রিটেনের ‘সবচেয়ে বড় এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ বাণিজ্য চুক্তি।
মোদি বলেন, ‘আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক দিন।’
চুক্তির পাশাপাশি দুই দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ এবং দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৬ বিলিয়ন পাউন্ড (৮ বিলিয়ন ডলার) বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি ঘোষণা করেছে এবং প্রতিরক্ষা, অভিবাসন, জলবায়ু এবং স্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, এই চুক্তির ফলে ব্রিটিশ পণ্যের ওপর ভারতের গড় শুল্ক ১৫% থেকে কমিয়ে ৩% করা হবে।
হুইস্কি এবং জিনের ওপর আমদানি কর অর্ধেক করে ১৫০% থেকে কমিয়ে ৭৫% করা হবে এবং চুক্তির দশম বছরের মধ্যে তা ৪০% এ নেমে আসবে। একটি কোটার অধীনে মোটরগাড়ি শুল্ক ১০০% এর বেশি থেকে কমিয়ে ১০% করা হবে।
ব্রিটেন বলেছে, এই চুক্তির ফলে ২০৪০ সাল থেকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বার্ষিক ২৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড ($৩৫ বিলিয়ন) বৃদ্ধি পাবে এবং ব্রিটিশ অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড ($৬.৮ বিলিয়ন) যোগ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মে মাসে বলেছিল, চুক্তির অধীনে ৯৯% ভারতীয় রপ্তানিতে কোনো আমদানি শুল্ক থাকবে না – এটি পোশাক, জুতা এবং খাদ্যসহ পণ্যের ওপর প্রযোজ্য।
২০২২ সালে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ওপর আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। এটিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ করার পর একটি মূল লক্ষ্য হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। জনসন সেই বছরের অক্টোবরের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আলোচনা স্থগিত হওয়ার আগে উভয় দেশ ১৩ দফা আলোচনা করেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। যুক্তরাজ্যের প্রায় ২০ লাখ মানুষের ‘মূল’ ভারতে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ব্রিটেন দেশটিতে একটি ঔপনিবেশিক শক্তি ছিল।
স্টারমার বলেন, ব্রিটেন এবং ভারতের ‘ইতিহাস, পারিবারিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অনন্য বন্ধন রয়েছে এবং আমরা আমাদের সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে চাই, যাতে এটি আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আধুনিক এবং দীর্ঘমেয়াদীভাবে কেন্দ্রীভূত হয়।
Leave a Reply