রেজাউল করিম বিপুল:
আব্দুল কাদের মোল্লা। ১৯৪৮ সালের ২ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার জরিপের ডাঙ্গী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সানাউল্লাহ মোল্লা ওরফে সোনা মোল্লা। মা বাহেরুন নেছা। তিন ভাই ছয় বোনের মধ্যে তৃতীয় কাদের। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বৃহস্পতিবার রাতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। শুক্রবার ভোরে নিজ বাড়ির আঙিনার পশ্চিম পাশে মা-বাবার কবরের কাছেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
সূত্র জানায়, ফাঁসির ২ মাস আগে কাদের মোল্লার সঙ্গে কারাগারে দেখা করেন ছোট ভাষানচর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মাইনউদ্দিন মোল্লা। এসময়, ফাঁসি দেওয়া হলে মা বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করতে ছোটভাইকে অনুরোধ করেন তিনি। বৃহস্পতিবার কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকা থেকে আসা মরদেহটি গ্রহণ করেন ফরিদপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিজয় বসাক এবং জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিবলী নোমান।
পরে রাত সোয়া ৩টার দিকে তার ভাই মাইনুদ্দিন মোল্লার কাছে প্রশাসন লাশটি হস্তান্তর করা হয়। এর আগে রাত পৌনে ৩টা থেকে কাদের মোল্লার বাড়ির উঠানে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে তার আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও গ্রামবাসী অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় আমিরাবাদ চৌরাস্তা বাজার জামে মসজিদের ঈমাম মাওলানা এরশাদ হোসাইন, কাদের মোল্লার বন্ধু হাফেজ মাওলানা আবু তালেব, আরেক বন্ধু দোলোয়ার হোসেন ও ছাত্র মোতালেব হোসেন।
কাদের মোল্লার জীবন ও কাজের ওপর আলোচনা এবং দোয়াপাঠ শেষে রাত ৩টা ৫০ মিনিটে বাড়ির উঠানে রাখা হয় লাশ। সে সময় বড় ভাই ইব্রাহিম মোল্লা, ছোট ভাই মাইনুদ্দিন মোল্লা, বোন, ভাতিজা ও ভাগ্নেকে মরদেহ দেখানো হয়। রাত ৩টা ৫৭ মিনিটে শুরু হয় জানাজা। নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন হাফেজ মাওলানা আবু তালেব। রাত ৪টা ১০ মিনিটে শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মা-বাবার কবরের পাশে দাফন সম্পন্ন করা হয় তাকে। এসময় নিকটাত্মীয় ও দলীয় নেতাকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
শিক্ষা ও যুদ্ধপূর্ব রাজনৈতিক জীবন
পরিবার সূত্র জানায়, স্থানীয় জরিপের ডাঙ্গী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণী পাস করে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন কাদের। এখানে ৮ম শ্রেণীর ছাত্র থাকাবস্থায় ১৯৬১ সালে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৪ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে বিএসসি প্রথম বর্ষে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘে নাম লেখান।
বিএসসি ২য় বর্ষের শেষের দিকে সংগঠনটির কলেজ শাখার সভাপতির দায়িত্ব পান। ১৯৬৮ সালে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিদ্যা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে থাকতেন শহীদুল্লাহ হলে। ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে শহীদুল্লাহ হল ছাত্র সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন।
পেশাগত জীবন
১৯৭৮ সালে ঢাকার রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন কাদের। পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতীবের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশের মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্যে আন্তর্জাতিকমানের একটি ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে গুলশান ১ নম্বর মার্কেটের দক্ষিণ পাশে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন কাদের। যা বর্তমানে মানারাত ইউনিভার্সিটি হিসেবে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানে সশরীরে প্রায় এক বছর কাজ করেন তিনি। একই বছর, ১৯৮০ সালে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধোত্তর রাজনীতি
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাত থেকেই শুরু হয় তার নেতৃত্বে বিহারিদের যোগসাজশে ঢাকার মিরপুরে বাঙালি নিধনযজ্ঞ। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার দখলদার বাহিনী, সহযোগী বাহিনীসহ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধিনায়কের কাছে আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাতেই কাদের মোল্লা পাকিস্তানি সেনা ও বিহারিদের নিয়ে মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ সংঘটিত করেন।
১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফরিদপুরে কাদের মোল্লা গ্রেফতার হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে আবারও প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেন তিনি। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইসলামী ছাত্রসংঘ ইসলামী ছাত্রশিবির নামে প্রতিষ্ঠিত হলে কাদের মোল্লা ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদের সদস্য হন। তিনি ১৯৭৭ সালের মে মাসে জামায়াতে যোগ দেন। যদিও জামায়াত তখনও প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেনি।
এসময় ঢাকা মহানগর জামায়াতের কর্ম পরিষদ সদস্য থেকে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োজিত হন। পরবর্তী সময়ে কাদের মোল্লা জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োজিত হন। ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ সদরপুর-চরভদ্রাসন আসনে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন কাদের। কিন্তু দু’বারই স্বল্প সংখ্যক ভোট পাওয়ায় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
যাবজ্জীবন থেকে ফাঁসি
এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এরপর রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ তারসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সবোর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলনের মুখে সরকার আইন পরিবর্তন করে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ৫ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ।
তবে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে একাত্তরের ‘কসাই কাদের’ নামে কুখ্যাত এই আলবদর কমান্ডারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় ৬ বছর আগে ২০০৭ সালে, দ্বিতীয় মামলা হয় ২০০৮ সালে। সেই দুই মামলায়ই গ্রেফতার হন কাদের মোল্লা এবং মামলা দু’টি ট্রাইব্যুনালের মামলায় রূপান্তরিত হলে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হন তিনি। গ্রেফতার হয়ে ৩ বছর ৫ মাস কারাগারে থাকার পর মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ১০ টা এক মিনিটে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।