মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৪

দমন-পীড়নের আশঙ্কায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কর্মীরা

দমন-পীড়নের আশঙ্কায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কর্মীরা

শীর্ষবিন্দু নিউজ: গণমাধ্যমের ওপর কর্তৃপক্ষ আরও বেশি মাত্রায় বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশী সংবাদকর্মীরা। বিরোধী দলের অবস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ইতিমধ্যে দু’টি টিভি চ্যানেল এবং দু’টি দৈনিক পত্রিকা অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও ক্ষমতাসীন দল ২য় মেয়াদে সরকার গঠন করার পর ঘোষণা দিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু গণমাধ্যম চর্চা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুতই বেসরকারি চ্যানেলগুলোর জন্য জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। সমালোচকরা বলছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য এটা অশনিসঙ্কেত।

দৈনিক নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির বলেন, যখনই কোন সরকার গণমাধ্যম নীতিমালার কথা বলে তখন তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের সুবিধামতো মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের কথাই বলছে। ১৬ই জানুয়ারি দৈনিক ইনকিলাব অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। ‘সাতক্ষীরায় যৌথবাহিনীর অভিযানে ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতা’- শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ করার পর তাদের ছাপাখানা সিলগালা করে দেয়া হয়। পত্রিকাটির অনলাইন শুধুমাত্র চালু আছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ইনকিলাবের চার সাংবাদিককে আটক করা হয়। এর মধ্যে রয়েছেন ওই প্রতিবেদনের প্রধান প্রতিবেদক আহমেদ আতিক।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রকাশের কারণে ইনকিলাবের ছাপাখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদন ছাপানোর যে মামলা আদালতে চলছে তাতে ইনকিলাব কর্তৃপক্ষ জয়ী হলে ছাপাখানা পুনরায় চালু হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।  ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশ ও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্ন করার চেষ্টা করেছে- এই মর্মে সরকার মামলা করেছে। ২০শে জানুয়ারি আদালত আটক আহমেদ আতিকের দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ইনকিলাবের বার্তা সম্পাদক রবিউল্লাহ রবি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রতিবেদক রফিক মোহাম্মদকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।

ইনকিলাবের আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ গাজী বলেন, ওই প্রতিবেদনের সূত্রসমূহ আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আতিককে গ্রেপ্তার এবং প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সত্ত্বেও  পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া অযৌক্তিক। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, পত্রিকাটির প্রিন্ট এডিশন বন্ধ করার পিছনে সরকার কোন বৈধ যুক্তি প্রদর্শন করেনি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি’র প্রেসিডেন্ট শাহেদ চৌধুরী প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

একই সঙ্গে তিনি একথাও বলেন, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার না করে সরকার আনুষ্ঠানিক প্রত্যুত্তরের মাধ্যমে সংবাদটি প্রকাশের প্রতিবাদ করতে পারতো- যে চর্চাটি সাধারণত চলে আসছে। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা আশঙ্কা করছেন, ইনকিলাবের ভাগ্য দৈনিক আমার দেশ-এর মতোই হতে পারে। বিরোধী দলের সমর্থক দৈনিক আমার দেশ ২০১৩’র এপ্রিলে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করে দেয়া হয়। আটক করা হয় পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে, যিনি ক্ষমতাসীন দলের একজন সমালোচক। গণমাধ্যমের ওপর প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- এই মর্মে ২০১৩ সালের ৭ই আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করলেও সরকার এখনও পর্যন্ত এর জবাব দেয়নি। আর ওই রুল জারি করার পর এখনও কোন শুনানি হয়নি বলে জানান দৈনিক আমার দেশ-এর আইনজীবী। ২০১৩’র ৬ই মে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ উস্কে দেয়া এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে বন্ধ করে দেয়া হয় দিগন্ত এবং ইসলামিক টেলিভিশন চ্যানেল দু’টির সমপ্রচার। উভয় চ্যানেল ওইদিন হেফাজতের সমাবেশ কভার করার চেষ্টা করেছিল।

ইসলামিক টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস ইস্কান্দার আল-জাজিরাকে জানান, তদন্ত কাজ সহজ করার জন্য আমরা আমাদের চ্যানেলে ও অন্যান্য সরকার-সমর্থক টিভি চ্যানেলগুলোর ২৪ ঘণ্টার ফুটেজ দাখিল করেছি। এছাড়াও সংবাদ প্রচার বন্ধ রেখে অন্যান্য সমপ্রচার চালু করার অনুমতি দেয়ার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানালেও তা মঞ্জুর হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এইসব মিডিয়া হাউজগুলোর ভবিষ্যৎ কি? আল-জাজিরার এমন প্রশ্নে তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, তারা এখনও সন্দেহভাজনদের মধ্যে রয়েছেন। তাদের সমপ্রচার ও সংবাদ প্রকাশের পেছনে অন্য কোন অভিসন্ধি ছিল কিনা তা নির্ণয় করতে এখনও তদন্ত চলছে। তদন্ত কাজ শেষ হলেই তাদের বিষয় নিষ্পত্তি হবে।

রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে ওই চার মিডিয়া হাউজ বন্ধ করা হয়েছে বিরোধী দলের এমন অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ইনকিলাব ইতিমধ্যে তাদের প্রতিবেদনের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছে। এদিকে অনেক সংবাদকর্মী বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদকর্মীরা জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালার খসড়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। সমপ্রচারের বিষয়ে প্রস্তাবিত নীতিমালার মধ্যে লাইসেন্সিং এবং বিজ্ঞাপনের বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।

এছাড়াও কোন ধরনের অনুষ্ঠান অনুপযুক্ত প্রতীয়মান হবে সে বিষয়ে একটি অনুচ্ছেদ রয়েছে। নীতিমালার অনেকগুলো ধারায় অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেশকিছু সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, যেগুলো কোনভাবেই অতিক্রম করা যাবে না। এছাড়াও নীতিমালায়, সমপ্রচার লাইসেন্স সংক্রান্ত যাবতীয় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার রয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের। আল-জাজিরাকে ইনু বলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই এ আইন পাস করা হবে।

নূরুল কবিরের মতে, এ নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো ভিন্নমতের বাকরোধ করা। আজকের পদাধিকারীরা যখন দু’টি টিভি চ্যানেল এবং দু’টি সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছে; সেটা বিবেচনা করে এটা সহজেই বলা যায়, তারা নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এটাকে স্বাধীন মতো প্রকাশের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মাস কমিউিনিকেশন এবং জার্নালিজম’ বিভাগের এসোসিয়েট প্রফেসর ফাহমিদুল হক ইনকিলাবের প্রতিবেদনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত আখ্যা দিলেও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে মিডিয়া হাউজগুলো একচেটিয়া বন্ধ করে দেয়াটা অশুভ লক্ষণ। যে নীতিমালা সরকারকে লাইসেন্স বাতিল অথবা সরকারী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা বন্ধ করার অধিকার দেয়, সেটা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা লঙ্ঘন।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026