শীর্ষবিন্দু নিউজ: মিনায় মুসল্লিদের অবস্থান নেয়ার মধ্য দিয়ে হজ পালনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ন’নি’মাতা লাকা ওয়ালমুল্ক্। অর্থাৎ—‘আমি উপস্থিত, হে আল্লাহ আমি উপস্থিত, তোমার কোনো অংশীদার নাই, সকল প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সকল রাজত্বও তোমার। এই মধুর ধ্বনিতে আজ পালতি হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম মহামিলন পবিত্র হ্জ্ব। পবিত্র জুম্মাবারে প্রায় ২০ লাখ হাজীর তালবিয়া পাঠে মুখরিত হয়ে যাবে আরাফাত ময়দান।
শুক্রবার আরাফাতের ময়দানে জড়ো হবেন মুসল্লিরা, যাকে হজের মূল অনুষ্ঠান বলা হয়। পরদিন সৌদি আরবের ঈদুল আজহার দিন পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে শেষ হবে হজ। এই বছর হজ পালন করছে ১৫০টি দেশের ২০ লাখের বেশি মুসলিম, যার মধ্যে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। এদের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেড় হাজার এবং বেসরকারিভাবে সাড়ে ৯৭ হাজার জন হজে গেছেন। আরাফাত ময়দানে হাজীদের উদ্দেশ্যে খুতবা পাঠ করবেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ আল শেইখ। বাংলাদশেসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আরাফাত ময়দানের হজ্বে অবস্থান, খুতবা এবং নামাজের দৃশ্য একযোগে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
আজ কাবা শরীফের গায়ে পরানো হবে নতুন গিলাফ। প্রতিবছর (৯ জিলহজ্ব) হজ্বের কার্যক্রম শুরু হয়। এই সে আরাফাত ময়দান যেখানে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জাবালে রহমত নামক স্থানে দাঁড়িয়ে বিদায় হজ্বের ভাষণ দিয়েছেন। যা মানবতা, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি স্থাপনে আজো উজ্জলতম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এখান থেকেই ইসলামের সুমহান ঝাণ্ডা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম হজ্ব। এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে বিশ্ববাসীর ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে মনে করা হয়। বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহকে শক্তিশালী করতে হজ্বের ভূমিকা অপরিসীম।
আরব নিউজ জানায়, হজ পালনে আসা মুসল্লিরা মক্কা থেকে বুধবার রাতে পাশের ছোট শহর মিনায় জড়ো হতে শুরু করেন। সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত বিভিন্ন বর্ণ, ভাষা, জাতীয়তার লাখো মুসল্লির কেউ বাসে, কেউ গাড়িতে, কেউবা হেঁটেই মিনার পথে রওনা হন, যাদের সবার মুখে ছিল লাব্বায়েক ধ্বনি। বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে সব মুসল্লি মিনায় অবস্থান নিয়েছেন বলে জানায় সৌদি আরবের সরকারি সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি।
মিনায় তাঁবু খাটিয়ে মুসল্লিরা অবস্থান করছেন। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করে প্রার্থনা করবেন তারা। শুক্রবার সকালে তারা সমবেত হবেন প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানে। সেখানে খুতবা শুনবেন তারা, যা হজের মূল অনুষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। খুতবা শোনার পাশাপাশি দিনভর ইবাদত বন্দেগির পর রাতে মিনার পথে মুজদালিফায় অবস্থান নেবেন মুসল্লিরা, যেখানে পাথর সংগ্রহ করবেন তারা, যা পরে মিনায় জামারাতে প্রতীকী শয়তানকে লক্ষ্য করে ছোড়া হবে।
এদিকে সৌদি নিরাপত্তা বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, অনুমতি না থাকায় হজ করতে ইচ্ছুক ১ লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে মক্কায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এছাড়া ৫১ হাজার ১১২টি গাড়ি মক্কায় প্রবেশের অনুমতি না থাকায় আটকে দিয়েছে হজ পুলিশ। পাশাপাশি ৪০টি ভূয়া হজ সেবা এজেন্সির অপারেটরদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে তারা।
হজরত আবদুর রহমান বনি ইয়ামার আদ-দায়লি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আরাফাত ময়দানেই তো হজ্বের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ইমাম শাওকানী (রহ.) এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে, যে ব্যক্তি আরাফাতে অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট দিন এই ময়দানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য লাভ করতে পারবে তার হজ্ব হয়ে যাবে। ইমাম তিরমিযী (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আরাফাত ময়দানে যে অবস্থান করতে পারল না, সে দুর্ভাগা। তার হজ্ব বাতিল হিসেবে গণ্য হবে।
সবার অন্তরে ও মুখে উচ্চারিত হবে মহান আল্লাহর একত্ববাদ ও মহত্বের বানী। দু’দিনের মোহময় পৃথিবীর কথা ভুলে গিয়ে অনন্তকালের চিন্তায় মগ্ন হবেন সাদা পোষাকধারী আলোর পথের যাত্রীরা। মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় ব্যাকুল হয়ে পড়বেন তারা। জীবনের পাপ-কালিমা মুছে পরিপূর্ণ নিষ্পাপ হতে তারা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবেন। যার দোয়া কবুল হবে তিনি হবেন বড়োই ভাগ্যবান।
নবী করিম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি হজ্ব করেছে, তাতে কোনো অশ্লীল আচরণ করেনি ও কোনো পাপে লিপ্ত হয়নি। সে হয়ে যাবে একেবারে নিষ্পাপ, যেদিন তার মাতা তাকে প্রসব করেছিল। (বুখারী ১৪৪৯)। পবিত্র মক্কা নগরী থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে দুই মাইল করে দৈর্ঘ্য ও প্রশস্ত বিশিষ্ট এক বিশাল সমতল মাঠ আরাফাতের ময়দান। শুক্রবার ৯জিলহজ্জ (সৌদি আরব সময়) ফজরের নামাজ মিনায় আদায় করার পর আরাফাত ময়দানে অবস্থান করবেন হাজীরা। এখানে থাকবেন সূর্যাস্ত পর্যন্ত। সূর্যাস্তরে পর যাবেন মুযদালিফায়। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন তারা। পুরো রাত সেখানেই অবস্থান করতে হবে।
শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করবেন এখান থেকেই। মুযদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজীরা যাবেন মিনায়। মিনায় বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দিয়ে মাথার চুল ন্যাড়া করে গোসল করবেন। সেলাইবিহীন দ’টুকরা কাপড় বদল করবেন। এরপর স্বাভাবিক পোশাক পরে মদিনা থেকে মক্কায় গিয়ে পবিত্র কাবা শরীফ সাতবার তাওয়াফ করবেন তারা। কাবার সামনে দুই পাহাড় সাফা ও মারওয়ায় সায়ী (সাতবার দৌঁড়ানো) করবেন। সেখান থেকে তারা আবার মিনায় যাবেন। মিনায় যত দিন থাকবেন, ততদিন বড়, মধ্যম, ছোট মোট ২১টি পাথর শয়তানকে মারবেন। আবার মক্কায় বিদায়ী তাওয়াফ করার পর নিজ নিজ দেশে ফিরে যাবেন মক্কা-মদীনার মেহমানরা।
হজ্ব উপলক্ষে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও প্রয়োজনীয় সকল ধরনের সহযোগিতার ব্যবস্থা করেছে সৌদি সরকারসহ মুসলিম বিশ্বের নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। সকল ধরনের ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে শামিল হতে বিশ্বের প্রায় ১৭২টি দেশের ২৫-৩০ লাখ ধর্ম প্রাণ মুসলমান প্রতিবছর হজ্ব পালনের লক্ষ্যে সৌদি গমন করেন। এ বছর বাংলাদশে থেকে পবিত্র হজ্বে গেছেন ৯৮ হাজাররে বেশি হাজী। তাদের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এক হাজার ৫১০জন এবং বাকীরা গিয়েছেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। এদিকে,পবিত্র হজ্ব পালন করতে এসে এ পর্যন্ত ৩৫ জন বাংলাদেশি ইন্তকোল করেছেন বলে জানা গেছে।
আরব নিউজ জানিয়েছে, এই মুহূর্তে মিনার আবহওয়া খুব চমৎকার। তাছাড়া হজ উপলক্ষে আয়োজকদের প্রস্তুতিও দারুণ। শনিবার সকালে মিনায় ফিরে প্রতীকী শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার পর পশু কোরবানি দেবেন মুসল্লিরা। তারপর মক্কায় গিয়ে কাবা ঘর প্রদক্ষিণ করে হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন তারা, পরিচিত হবেন হাজি হিসেবে।