সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০১

পুজোয় এবার হীরা আর সোনার লড়াই

পুজোয় এবার হীরা আর সোনার লড়াই

নাকতলা উদয়ন ক্লাবের পূজামণ্ডপ। ছবি: ভাস্কর মুখার্জিঅমর সাহা, কলকাতা থেকে: নাকতলা উদয়ন ক্লাবের পূজামণ্ডপ। ছবি: ভাস্কর মুখার্জিএকদিকে পূর্ব কলকাতা, অন্যদিকে দক্ষিণ কলকাতা। শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। লড়াই এবার সোনা আর হীরার। চলছে টেক্কা দেওয়ার পালা। কে কাকে হারাতে পারে?

হ্যাঁ, কলকাতায় এবার দৃষ্টি এই পূর্ব ও দক্ষিণ কলকাতার দুটি পুজো মণ্ডপের দিকে। পূর্ব কলকাতার শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব এবার দেবী দুর্গাকে সাজাচ্ছে ১০ কোটি রুপির হীরার গয়না দিয়ে। আর দক্ষিণ কলকাতার একডালিয়া এভারগ্রিন ক্লাব দুর্গাকে সাজাচ্ছে সোয়া চার কোটি রুপির সোনার গয়না দিয়ে। বাদ যাচ্ছেন না দেবী দুর্গার পুত্র গণেশ, কার্তিক, কন্যা লক্ষ্মী ও সরস্বতীও।

শ্রীভূমি দেবী দুর্গা থেকে লক্ষ্মী-সরস্বতী সবার মাথার মুকুট থেকে সীতাহার, নেকলেস, কানের দুল, হাতের চুরি সবই তৈরি করছে হীরার গহনা দিয়ে। আর একডালিয়া তৈরি করেছে ১৭ কেজি সোনা দিয়ে। গত বছর শ্রীভূমি দেবী দুর্গাকে সাজিয়েছিল ১২ কেজি সোনার গহনা দিয়ে। এবার সাজাচ্ছে হীরার গহনা দিয়ে। কলকাতার একটি দামি জুয়েলার্স এই গয়না বানিয়ে দিয়েছিল শ্রীভূমি ক্লাবকে। সেই জুয়েলার্সই এবার একডালিয়া ক্লাবকে তৈরি করে দিয়েছে

সোনার গহনা। শ্রীভূমি ক্লাবের নেতৃত্বে আছেন বিধায়ক সুজয় বসু আর একডালিয়া ক্লাবের নেতৃত্বে মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়। শ্রীভূমি ক্লাবের পুজো এবার ৪৩ বছরে পা দিয়েছে। আর একডালিয়া ক্লাবের পুজো এবার পা দিয়েছে ৭২ বছরে। সত্যি কথা কি, কলকাতায় এবার শুধু এই হীরা আর সোনার লড়াইয়ে থেমে যায়নি শারদীয় দুর্গোৎসব। এবারও চলছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী পুজোয় সনাতনী আর আধুনিকতার লড়াই। চলছে থিমের লড়াই। কে কাকে টেক্কা দিতে পারে তার প্রতিযোগিতা। মোটকথা, এবারও কলকাতা ডুবে আছে থিমের লড়াইয়ে। খিদিরপুরের ভেনাস ক্লাবের দুর্গা প্রতিমা। ছবি: ভাস্কর মুখার্জিখিদিরপুরের ভেনাস ক্লাবের দুর্গা প্রতিমা। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

দক্ষিণ কলকাতার ৬৬ পল্লি সার্বজনীন দুর্গা উৎসব কমিটি এবার মণ্ডপ তৈরি করেছে শিক্ষার উপকরণ সেই পেনসিল, চক, শ্লেট, প্যাস্টেল দিয়ে। জলের আস্তরণের মতো মণ্ডপ তৈরি করেছে বাদামতলা আষাঢ় সংঘ। আর এটি তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৮ হাজার স্বচ্ছ টিউব। আর এই দক্ষিণ কলকাতার সংঘশ্রী ক্লাবের পুজো মণ্ডপ তৈরি হয়েছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছের ঘেরাটোপে। থিম করা হয়েছে সুন্দরবন ও বাঘ সংরক্ষণ। এখানে দুর্গা দেবী অধিষ্ঠিত বনবিবি রূপে। আর সুরের যন্ত্র দিয়ে পিয়ানোর আদলে এবার মণ্ডপ তৈরি করেছে সমাজসেবী সংঘ। মণ্ডপের সামনে রাখা হয়েছে ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি বিরাট এক সরোদ। থাকছে এখানে ভায়োলিন, বীণা, একতারাসহ ধামসার মতো প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রের বিশালাকার মডেল।

কলকাতার সিকদার বাগান সার্বজনীন এবার পুজোর মণ্ডপ তৈরি করেছে ব্যাঙের ছাতার আদলে। হোসেনপুর সার্বজনীন মন্দির নির্মাণ করেছে নানা পাখির শিল্পকর্ম নিয়ে। ব্যবহার করা হয়েছে তাল ও অন্যান্য গাছগাছালি। মলপল্লির মণ্ডপ নির্মাণ করা হয়েছে ইটভাটার আদলে। নির্মাণ করা হয়েছে বিরাট এক চুল্লিও। চুল্লির চারদিকে সাজানো হয়েছে ইট। আর করবাগানে মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে ধনলক্ষ্মী, রাজলক্ষ্মী, মহালক্ষ্মী, গজলক্ষ্মী, ধান্যলক্ষ্মী, বিদ্যালক্ষ্মী, সান্ত্বনা লক্ষ্মী এবং ঐশ্বর্যলক্ষ্মী এই আট রূপকে সঙ্গী করে।

আবার উত্তর কলকাতায় পলতার শ্রীপল্লি সার্বজনীন মণ্ডপ তৈরি করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাসভবন হোয়াইট হাউসের আদলে। গয়েশপুর যোগাযোগ সংঘ মণ্ডপ তৈরি করেছে বরফের কৈলাস ধামের আদলে। ভারতের জাতীয় ফুল পদ্মফুলের আদলে মণ্ডপ তৈরি করেছে দক্ষিণ কলকাতার ৯৫ পল্লি। ৪০ ফুট উঁচু একটি পিলসুজ পিলসুজের আদলে মণ্ডপ তৈরি করেছে হরিদেবপুর সার্বজনীন। এরই মাঝে দেবী দুর্গা অধিষ্ঠিত। রং ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেছে দমদম পার্ক তরুণ দল। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি ৩০ ফুট লম্বা একটি ময়ূর দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে মন্দিরের দ্বারে। রামায়ণের কাহিনি নিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেছে কলকাতার হাতিবাগান সার্বজনীন।

একডালিয়া এভারগ্রিন মণ্ডপ তৈরি করেছে ইসকনের মন্দিরের আদলে। বাঁশি দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেছে গড়িয়ার আমরা ক’জন ক্লাব। ফাইবারের দুর্গা প্রতিমা এবং জলের ঢেউকে ভাবনা করে মন্দির তৈরি করেছে নাকতলা উদয়ন সংঘ। তারের জাল ও গুনা দিয়ে মন্দির তৈরি করেছে রায়পুর সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি। সুতোর রিল দিয়ে পুজো মণ্ডপ তৈরি করেছে টালিগঞ্জ আদি বারোয়ারি দুর্গোৎসব কমিটি। কলকাতার সন্তোষমিত্র স্কোয়ার সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি মণ্ডপ তৈরি করেছে মিসরের সভ্যতাকে ঘিরে। থাকছে পিরামিড। গতবার তারা মণ্ডপ তৈরি করেছিল রোমের মনুমেন্ট আর রোম সংস্কৃতি নিয়ে।

কানাডা-আমেরিকার নায়াগ্রা জলপ্রপাতের দৃশ্য এবার দেখা যাবে কলকাতার গাঙ্গুলিবাগানের রবীন্দ্রপল্লির পুজো মণ্ডপে। পানির বোতলে ফুল বন্দী করে মণ্ডপ নির্মাণ করেছে দমদম পার্ক তরুণ সংঘ পুজো কমিটি। নারী মুক্তিকে ভাবনা করে মণ্ডপ তৈরি করেছে অ্যাভিনিউ সাউথের পল্লিমঙ্গল পুজো কমিটি। জাদুশিল্পকে ভাবনা করে মণ্ডপ তৈরি করেছে আহিরিটোলা যুবকবৃন্দ। সাঁওতাল বিদ্রোহের আদলে মণ্ডপ তৈরি করেছে পাইকপাড়ার ১৩ নম্বর সার্বজনীন পুজো কমিটি।

আতশবাজির আদলে মণ্ডপ নির্মাণ করেছে কলকাতার কাশীবোস লেনের পুজো কমিটি। চাকাকে মডেল করে মণ্ডপ নির্মাণ করেছে হরিদেবপুর স্পোর্টিং ক্লাব। লালবাগান সার্বজনীন পুজো মণ্ডপ নির্মাণ করেছে কোদাল, বেলচা, কড়াই, ওলন, তুলি, হাতুড়ি, ছেনির মডেল দিয়ে। ৮০ লাখ বোতাম দিয়ে মন্দির নির্মাণ করেছে হরিদেবপুর নিউ স্পোর্টিং ক্লাব । ১৫০টি দেশের পয়সার মডেল দিয়ে মন্দির নির্মাণ করেছে পুটিয়ারি পল্লি উন্নয়ন সমিতি। আর খিদিরপুরের ভেনাস ক্লাবের মণ্ডপ নির্মাণ হয়েছে অকালবোধনকে ভাবনা করে।

অন্যদিকে উপজাতিদের জীবন নিয়ে মণ্ডপ বানিয়েছে বেহালা ক্লাব। কাঁচের গ্লাস দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেছে কালীঘাট মিলন সংঘ। কন্যাকুমারীর বিবেকানন্দ রকের আদলে মণ্ডপ তৈরি করেছে নিউ আলীপুর সার্বজনীন কমিটি। এভাবেই গোটা কলকাতা আর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে মণ্ডপ আর দেবী দুর্গা নির্মিত হয়েছে নানা ভাবনা আর চিন্তা নিয়ে। সত্যি কথা কি, কলকাতার ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোয় থিম বা ভাবনার লড়াইয়ে এবারও এতটুকু খামতি নেই। এবারও পাড়ায়-পাড়ায় চলেছে মণ্ডপ আর দুর্গা প্রতিমা নির্মাণে থিমের লড়াই। বৈচিত্র্যের লড়াই।

সূত্র: প্রথম আলো

 




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026