শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে একটি ভয়াবহ এবং নৃশংস ঘটনার হচ্ছে বিডিআর পিলখানায় সেনা হত্যাযজ্ঞ। অথচ এই ঘটনাটি নিয়ে ছেলে খেলা শুরু করেছেন শেখ হাসিনা। ঘটনা পরম্পরা বিশ্লেষনে এটি স্পষ্ট, বিডিআর হত্যাকান্ডের সাথে শেখ হাসিনা ও তার পুত্র এবং ২১ আগষ্ট হত্যাকান্ডের সাথে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী ওলামা লীগ জড়িত বলেও অভিযোগ করেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপার্সন তারেক রহমান।
১৯ জুন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৮০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৮ জানুয়ারী লন্ডনে যুক্তরাজ্য বিএনপি এক আলোচনা সভায় তিনি এ অভিযোগ করেন। সভায় তারেক রহমান বলেন, বিডিআর হত্যাকান্ডের এত বছর পর শেখ হাসিনা বলেছেন, বিডিআর পিলখানার ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান জড়িত।
এমন তথ্য যদি তার কাছে থেকে থাকে তাহলে সেই তথ্য কি শেখ হাসিনা পিলখানা হত্যাযজ্ঞ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন? তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানিয়ে থাকলে তিনি কি এসব অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিলেন? তাহলে বিচার হলো কিসের ভিত্তিতে?
পিলখানা হত্যাযজ্ঞ মামলায় বিডিআরের শতশত লোকের দন্ডাদেশ জেল ফাঁসি কি তাহলে কি ত্রুটিপুর্ণ কিংবা অসম্পূর্ণ তদন্তের ভিত্তিতে হয়েছে? তারেক রহমান প্রশ্ন করেন, দেশের ইতিহাসে এতবড় একটি নৃশংস ঘটনার তদন্ত আওয়ামী লীগ দলীয় পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দকে দিয়ে কেন করানো হলো ?
তারেক রহমান বলেন, ততকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন বলেছেন, বিডিআর পিলখানায় সেনা হত্যাযজ্ঞ চলার সময় তিনি গনভবনে গিয়ে দেখেন শেখ হাসিনা তার কয়েক মন্ত্রীসহ চা খাচ্ছেন। জেনালের মঈন কি মিথ্যা বলেছেন?
মিথ্যা হলে জেনারেল মঈনের কি বিচার হয়েছে?
পিলখানা হত্যাযজ্ঞের সময় সেনাবাহিনী প্রস্তুত থাকলেও বিডিআর পিলখানায় তাদেরকে কেন ঢোকার অনুমতি দেননি শেখ হাসিনা?
আওয়ামী লীগে এত সিনিয়র নেতা থাকা স্বত্তেও জঙ্গি আব্দুর রহমানের শ্যালক মীর্জা আজম এবং নানকের মতো জুনিয়র নেতাদের কেন পিলখানায় পাঠানো হলো? কোন যুক্তিতে?
কেন শেখ হাসিনা সময় ক্ষেপন করছিলেন? এত সংখ্যক সেনা অফিসার হত্যার পরও রাতের বেলা বিডিআর পিলখানায় চারপাশে কেন পাহারা বসানো হয়নি?
কেন হত্যাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হলো?
সেনাবাহিনীতে জঙ্গি রয়েছে এবং তাদের দমন করতে হবে, ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে একটি বিদেশী ম্যাগাজিনে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হওয়ার মাত্র তিনমাসের মাথায় সেনা কর্মকর্তা নিধনযজ্ঞের সঙ্গে ওই আর্টিক্যালের কোন যোগসূত্র আছে কিনা সেটি কি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হয়েছিলো?
এরকম প্রশ্ন রেখে তারেক রহমান বলেন, পিলখানায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি টের পেয়ে কোন হত্যাকান্ড ঘটার আগেই শেখ হাসিনা এবং সেনা প্রধানের কাছে বিডিআরের ডিজি ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন। এরপরও বিডিআরের ডিজিকে বাঁচানো গেলোনা। খোদ রাজধানীতে দিনভর খুজে খুজে নৃশংস কায়দায় সেনা কর্মকর্তাদের একর পর হত্যা করা হলো।
অথচ এই ব্যর্থতা স্বীকার না করে এখন এতদিন পর লন্ডন থেকে তারেক রহমান তার মায়ের কাছে কয়টা ফোন করেছে এইসব অবান্তর প্রশ্ন তুলে জনগনের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা যাবে না। পিলখানা হত্যাযজ্ঞ, ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজত কর্মীদের হত্যাকান্ড কোন হত্যাকান্ডেরই শেখ হাসিনা দায় এড়াতে পারবেনা। তারেক রহমান বলেন, পিলখানা হত্যাযজ্ঞ নিয়ে এ ধরণের ছেলেখেলার জন্য শেখ হাসিনাকে ভবিষ্যতে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
সভায় তারেক রহমান অভিযোগ করে বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলার সঙ্গেও শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী ওলামা লীগ জড়িত। তিনি বলেন, সে সময় প্রশ্াসন আওয়ামী লীগের সমাবেশের অনুমতি দিয়েছিলো মুক্তাঙ্গনে। কিন্তু সমাবেশের মাত্র ঘন্টা দেড়েক আগে প্রশ্াসনকে না জানিয়েই কি কারণে শেখ হাসিনা সমাবেশের ভেন্যু পরিবর্তন করলেন এটি একটি গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন।
তারেক রহমান বলেন, ২১ আগষ্ট ঘটনায় এখন শেখ হাসিনা বিএনপিকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন। অথচ দেখা যায়, গত ১১ বছরে এখন পর্যন্ত ২১ আগষ্ট হামলা মামলার তদন্ত করা হয়েছে তিন দফা। এই মামলায় বিএনপি আমলে গ্রেফতার করা হয়েছিলো মুফতি হান্নানকে। এরপর মঈন-ফখরুদ্দিনের সময় এই মামলার দ্বিতীয় দফা তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়ে ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম চলার সময় পর্যন্ত ৬৪ জনের সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হয়।
এ পর্যায়ে শেখ হাসিনা বিচার কার্যক্রম বন্ধ রেখে মাঝপথেই নতুন করে তৃতীয় দফা তদন্তের জন্য এই মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেন বিতর্কিত দলীয় পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দকে। কাহহার আকন্দ ২০১১ সালের ৩ জুলাই আদালতে সম্পুরক চার্জশীট দাখিল করেন। তারেক রহমান বলেন, শেখ হাসিনার ইচ্ছানুযায়ী চার্জশীটে তাঁর (তারেক রহমান) নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারেক রহমান বলেন, প্রথম দুই তদন্তে তাঁর নাম না থাকলেও কাহহার আকন্দ নির্যাতন করে মুফতি হান্নানের মুখ দিয়ে তার নাম বের করে চার্জশীটে অন্তর্ভুক্ত করেন।
তারেক রহমান বলেন, পরবর্তীতে পুনরায় বিচার শুরু হওয়ার পর মুফতি হান্নান কোর্টে বলেন, তিনি তারেক রহমানের নাম বলেননি। তাকে নির্যাতন করে এই নাম বলানো হয়েছে। তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে চান। তারেক রহমান বলেন, ২১ আগষ্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে হামলায় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করা হলেও আওয়ামী ওলামা লীগ নিজেরাই স্বিকার করেছেন যে তাদের অভ্যন্তরীন কোন্দলের জের ধরে ২১ আগষ্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে হামলা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, আওয়ামী ওলামা লীগের এক অংশের সভাপতি মাওলানা ইলিয়াস হোসাইন বিন হিলালী ২০১৪ সালের ১১ নভেম্বরে গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, আওয়ামী ওলামা লীগের অপর অংশের নেতা মাওলানা বোখারীর নেতৃত্বে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়েছে। মাওলানা হিলালী হামলার বিস্তারিত জানতে তিনি মাওলানা বোখারীকে গ্রেফতারের দাবী জানান।
তারেক রহমান আরো বলেন, ২০১৪ সালের ৬ নভেম্বর কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে রমনা বটমুলে বোমা হামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী মাওলানা আবু বকর সিদ্দিককে গ্রেফতার করে র্যাব । র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে কিভাবে সে নিজেও আওয়ামী ওলামা লীগের নেতৃত্বে ২১ অগস্টের হামলায় অংশ নিয়েছিলো তার বর্ণনা দেয়। অথচ এইসব তথ্য নিয়ে আমলে নেয়া হচ্ছেনা।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে এখন শেখ হাসিনা বিএনপি এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে মিথ্যাচার করছেন। তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেই জিয়াউর রহমান নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের ঘোষনাপত্র গৃহীত হওয়ার আগ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট।
তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা এখন শহীদ জিয়ার ইমেজ বিনষ্টের চক্রান্তে লিপ্ত। তবে জিয়াউর রহমান স্বিকৃতি পেয়েছেন জনগনের আদালতে। দেখা যায়, জনগন যখনই নিরপেক্ষভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছে, ভোট দিয়েছে শহীদ জিয়াউর রহমান এবং তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে। এ কারণেই জনগনই বিএনপির ভরসা এবং এ কারণেই বিএনপির চলমান আন্দোলন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য। গনতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য। তারেক রহমান অভিযোগ করে বলেন, জনগণের আদালতে প্রত্যাখ্যাত আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসররা এখন জিয়াউর রহমানের ইমেজ ক্ষুন্ন করতে আদালতকে ব্যবহার করছে।
তবে তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বিষয় আদালতে নেয়া ঠিক নয়। কারণ এটি আদালত দ্বারা ইতিহাসের গতিপথ নিয়ন্ত্রন করার অপচেষ্টা এবং এটি ঐতিহাসিক কোন ঘটনার নিরপেক্ষ নির্মোহ বর্ণনাকে বাধাগ্রস্থ করে। বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ন বিয়য়ে উল্টোপাল্টা কথা বলার জন্য সভায়, জাতিসংঘের তত্ত¡াবধানে শেখ হাসিনার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান বলেন, গত ১১ জানুয়ারী শেখ হাসিনা এক জনসভায় বলেছেন, আদালত নাকি জিয়াউর রহমানের শাসনামলকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তারেক রহমান বলেন, ২০০০ সালেই দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালত শেখ হাসিনাকেও রংহেডেড ওম্যান বলে আখ্যা দিয়েছিলো।
তারেক রহমান বলেন, শহীদ জিয়া সম্পর্কে অপপ্রচার করা ঠিক নয়। দেশে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল কৃতিমান ব্যক্তিত্ব যাদের জীবন ও কর্ম জাতীয় জীবনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সেইসব গুনীজনদের প্রতি বছর দু‘টি পদক দেয়া হয়। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গৌরবজনক স্বাধীনতা পদক আরেকটি হলো একুশে পদক, এই দুটি পদকও প্রবর্তণ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান বীরোত্তম।
তারেক রহমান বলেন, এর আগে কেন এ ধরণের উদ্যোগ নেয়া হলোনা? তারেক রহমান বলেন, শেখ হাসিনা বিএনপিকে অবৈধ বলেন, কিন্তু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী শেখ মুজিবুর রহমান সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পর ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন জিয়াউর রহমান। আওয়ামী লীগ এবং অন্যদলগুলো যখন জিয়াউর রহমানের কাছে রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন করে জিয়াউর রহমান তখন কয়েকটি মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সেনাপ্রধান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
অপরদিকে, ১৯৭৮ সালের পহলো সপ্টেম্বের বিকেলে ঢাকার রমনা রেস্তোরায় এক সংবাদ সম্মেলনে যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষনা দেন জিয়াউর রহমান তখন জনগনের ভোটে দেশের নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। তাহলে বিএনপি অবৈধ হলে আওয়ামী লীগও অবৈধ। এমনকি জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর কমকর্তা হওয়ার কারণে যদি বিএনপিকে সামরিক ছাউনীতে জন্ম নেয়া দল হিসেবে অপপ্রচার চালানো হয়, তাহলে এটি আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেই আরো বেশী প্রযোজ্য।
তারেক রহমান বলেন, জিয়াউর রহমান যেভাবে বাকশালের অন্ধকার থেকে দেশকে আলোর পথে এনছিলেন, চালু করেছিলেন বহুদলীয় গনতন্ত্র, বর্তমানে একবঅবে বন্দী গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে শহীদ জিয়ার দল বিএনপি। গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার অন্দোলনে আবারো সবাইকে প্রস্তত থাকার আহবান জানান বিএনপি‘র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
পূর্ব লন্ডনের রয়্যাল রিজেন্সী অডিটরিয়ামে অয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক। সভা পরিচালনা করেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমেদ। সভায় আরো বক্তৃতা করেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান, যুক্তরাজ্য বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুসসহ অনেকে।