বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৩

আজো দাঁড়িয়ে আছে হেমনগর জমিদার বাড়ি

আজো দাঁড়িয়ে আছে হেমনগর জমিদার বাড়ি

মো. কামাল হোসেন: খোঁজ নিলে দেখা যাবে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে কতোই না জমিদার ছিল। তাদের ক্ষমতা, দাপট কালের স্বাক্ষর হয়ে রয়েছে। কিন্তু আমরা জানি না কতজন জমিদার ছিল এই দেশে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খুঁজতে গেলে এখনও পাওয়া যাবে অনেক অমর কীর্তি, পুরনো আমলের জমিদার বাড়ি। এমনি একটি জমিদার বাড়ি রয়েছে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার হেমনগরে।

এই জমিদার বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে প্রজাদের হাতজোড় করে যেতে হতো। মাথা রাখতে হতো নিচু করে। এখানে আজ আর জমিদার নেই। জমিদারের হাজারো বেহারার পালকিসহ দাপটও নেই। কিন্তু  আজও ভেসে আছে জমিদারদের কতো কথিত অখ্যাত কাহিনী। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হেমনগরের জমিদার বাড়ি। গোপালপুর উপজেলা সদর হতে প্রায় ১৫ কিমি. পশ্চিমে হেমনগর। যেখানে অষ্টাদশ শতাব্দীর কারুকাজ করা হেমবাবুর জমিদার বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতল ভবনটি আজও সেই পুরনো ঐতিহ্য নিয়ে স্বগর্ব দম্ভ প্রকাশ করছে।

বাড়ির সামনে রয়েছে বিরাট মাঠ। মাঠ পেরিয়ে গেলেই দেখা যায় দ্বিতল বাড়ির ছাদে দুটি পরীর ভাস্কর্য। তাই লোকে একে পরীর দালানও বলে। একশ’ কক্ষবিশিষ্ট এ বাড়িটি প্রায় ৩০ একর জমির ওপর তৈরি। সামনে দরবার ঘর। দু’পাশে সারি-সারি ঘরগুলো নিয়ে গড়ে উঠেছে চতুর্ভুজাকার জমিদার প্রাসাদ। তিন ফুট প্রশস্ত দেয়ালে ঘেরা জমিদার বাড়ির মাঠের সামনে এবং বাড়ির পেছনে রয়েছে বড় দুটি পুকুর। শিক্ষা-সংস্কৃতি বিকাশে জমিদার পরিবারের ছিল ব্যাপক ভূমিকা। জমিদার প্রাসাদের পাশে ছিল চিড়িয়াখানা, নাটকের ঘর। তদানীন্তন পূর্ব বাংলার সংস্কৃতি (আদ্য) পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল এটি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, হেমনগরের জমিদার হেরেম্ব চন্দ্র চৌধুরীর পিতা কালিবাবু চৌধুরী ছিলেন ব্যবসায়ী। তিনি সূর্যাস্ত আইনের আওতায় শিমুলিয়া পরগণার জমিদারি কিনে নেন। কালিবাবু চৌধুরীর ছিল চার ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে হেরেশ্বর চন্দ্র চৌধুরী জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পান। তিনি তদানীন্তন ময়মনসিংহ জেলার মধুপুর  উপজেলার অন্তর্গত আমবাড়িয়া এস্টেটে জমিদার বাড়ি বানান এবং জমিদারি পরিচালনা করেন। কিন্তু আমাড়িয়া থেকে যমুনার পূর্বপাড় এবং সেখান থেকে মধুপুরগড় পর্যন্ত বিশাল এলাকার জমিদারি পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তাই তিনি গোপালপুর উপজেলার সুবর্ণখালী নামক গ্রামে দ্বিতীয় বাড়ি নির্মাণ করেন। নদীভাঙনে সুবর্ণখালী বিলীন হতে থাকলে তিনি শিমলাপাড়া গ্রামে ১৮৮০ সালের দিকে রাজপ্রাসাদ তৈরি করেন এবং নিজ নামে এলাকার নামকরণ করেন হেমনগর। হেরেম্ব বাবুর ছোট ভাই প্রফুল্ল চন্দ্র চৌধুরী হাদিরার সৈয়দপুর গ্রামে আরও একটি বাড়ি বানানোর চিন্তাভাবনা করে ছিলেন বলে সেখানেও একটি এলাকার নামকরণ করা হয় প্রফুল্লনগর। হেমবাবুর জমিদার প্রাসাদ এখন অনেকটাই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

কিছু লোক রাতারাতি দালানের ইট-কাঠ বিক্রি করে দিয়েছে। বহু গাছপালা সমূলে নির্মূল করা হয়েছে। এককালের সুরম্য প্রাসাদ আজ ধ্বংসের মুখে। কারুকাজ মণ্ডিত দেয়াল খসে পড়েছে, ভেঙে গেছে দরজা-জানালা।  জমিদার বাড়ি ঘেরা দালান ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবুও যা আছে তা অনেক। প্রবীণরা জানান, জমিদার বাবু বহুগুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি সুন্দর শাসক, ন্যায় বিচারক, শিক্ষানুরাগী ও সাংস্কৃতিমনা ছিলেন। তিনি তার বিধবা সৎমায়ের নামে ১৯০০ সালে  প্রায় বিশ একর জমির ওপর শশীমুখী সেকেন্ডারি ইংলিশ হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় এখান থেকে ইংরেজি শিক্ষা দেয়া হতো। ময়মনসিংহে আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠায় দশজন দাতা সদস্যের তালিকায় তার নাম চার নম্বরে লিপিবদ্ধ আছে। হেমচন্দ্র চৌধুরী চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডে অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি টাঙ্গাইল জেলা উকিলবার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। গোপালপুর সুতি ভি এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি জমি ও অর্থ দান করেন। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় তার সিংহভাগ অবদান রয়েছে। তখন কলকাতা থেকে শিল্পী এনে জেনারেটরে বাতি জ্বালিয়ে মঞ্চ নাটক, যাত্রা করা হতো হেমনগর গ্রামে। ভাষা সাহিত্যের চর্চাও হতো সেখানে। প্রতি রমজান মাসে রোজাদারদের ইফতার করানোর ব্যবস্থা থাকতো রাজপ্রাসাদে।

এজন্য স্থাপন করা হয়েছিল ডাকবাংলো। প্রজা সাধারণের সুবিধার্থে তিনি রাস্তার মোড়ে মোড়ে কূপ নির্মাণ এবং বহু সংখ্যক পুকুর খনন করেন। তিনি অত্যন্ত সৌখিন এবং সুন্দরের পূজারি ছিলেন। হেমনগরের প্রাকৃতিক নৈসর্গিক দৃশ্যের মধ্যে নির্মিত তার অপূর্ব কারুকাজময় বাসভবন আজও তার সাক্ষ্য বহন করে। এখনও লোকমুখে শোনা যায়, জমিদার প্রাসাদ থেকে প্রজাদের হাতজোড় করে মাথানত হয়ে বের হতে হতো। বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে জুতো পরে, ছাতা মাথায় দিয়ে দিয়ে চলাচল করলে তাদের শাস্তি দেয়া হতো। মাঝে মধ্যে কলকাতা থেকে নামি-দামি বাইজি আনতেন। এই অখ্যাত পল্লীর নিভৃত প্রাসাদের প্রকোষ্ঠে তারা নূপুরের নিক্কন তুলতেন। ফুর্তি চলতো সারা রাত। সেই ফুর্তির বন্যায় ভেসে যেতো হেমনগরের জমিদার বাড়ি। কিন্তু সাধারণ প্রজাবর্গের সেসব বাইজি দেখার সৌভাগ্য হতো না।

তবে জমিদার বাড়িতে যারা হুকুম তামিল করতেন তারাই শুধু এক নজর দেখতে পেতেন। দেশ বিভাগের আগ মুহূর্তে কৃষক নেতা হাতেম আলী খানের নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হয়। বারবার আপসের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ১৯৪৬ সালে হেমবাবু জমিদারি গুটিয়ে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ফেলে কলকাতায় চলে যান।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026