বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৩

নির্বাচন কমিশনের অসহায় আত্মসমর্পণ

নির্বাচন কমিশনের অসহায় আত্মসমর্পণ

শীর্ষবিন্দু নিউজ: নির্বাচন কমিশন সরকারের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে। তারা একটি দলের রাজনৈতিক খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছে। এ আত্মসমর্পণের জন্য তাদের নাম গিনেস বুক অব রেকর্ডে উঠতে পারে। কারণ এতবড় প্রহসন ও তামাশার নির্বাচন আজ পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। গত ৪২ বছরের নির্বাচনী কারচুপি ও জালিয়াতির ইতিহাস মুখ থুবড়ে পড়েছে। সামরিক শাসনামলের কয়েকটি হ্যাঁ বা না ভোট এবং ভোট ডাকাতির কয়েকটি নির্বাচন ছিল এতকালের কলঙ্কিত ইতিহাস।

সেই ইতিহাস ভেঙেছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন রেকর্ড। কৌতূহলী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মাথায় হাত পড়েছে। তুলনা করার মতো তারা কিছুই পাচ্ছেন না। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র নিয়ে বহুকাল মানুষ হাসাহাসি করেছে। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে মাহী বি চৌধুরী এ নির্বাচনকে শতাব্দীর সেরা কৌতূক বলে বর্ণনা করেছেন। অনেকে বলেছেন, শতাব্দীতে কুলাবে না। এ রকম বা এর কাছাকাছি একটি মিল খুঁজে পেতে কত শতাব্দী পিছাতে হয় কে জানে। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের কোথাও এমন কিছুর হদিস মেলে কিনা সন্দেহ। প্রাচীন গ্রিসে ভোটাভুটি হতো হাত তুলে। সেই নির্বাচনও যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য ছিল।

কিন্তু এবারে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন নির্বাচন ও ভোটাভুটির ইতিহাস ও মর্যাদাকেই চুনকালি মাখালো। সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন ও তার সহযোগীরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। তারা নাকি বলাবলি করছেন বিচারপতি কে এম সাদেক-ও হাসি-তামাশার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু তার একটা সন্তুষ্টি ছিল। তিনি সংবিধানসম্মত একটি সংশোধনীর জন্ম নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু এবারে কি যে হবে তা কেউ জানে না।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন সম্পর্কে সর্বশেষ যা বলেছেন সেটা শুনে অনেকেরই আক্কেল গুড়ুম। নির্বাচন ও ভোট সম্পর্কে তার তত্ত্ব টিকে গেলে বাংলাদেশ থেকে ভোট ব্যবস্থাই উবে যেতে পারে। কিন্তু কমিশন নীরবে তা হজম করে ফেলেছে। টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করেনি। পাবলিক সার্ভেন্টরা সরব হয়ে থাকেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর পাবলিক সার্ভেন্ট-ও কখনও সাহসী ও অকপট হন। কিন্তু বর্তমান কমিশনের সদস্যরা প্রমাণ দিচ্ছেন তাদের মেরুদণ্ড যেন মাখন দিয়ে তৈরী।

২৫শে ডিসেম্বরে মনোনয়নপত্র দাখিল থেকে ভোট ও প্রার্থী ছাড়াই ১৫১ জনকে নির্বাচিত করার প্রক্রিয়ায় অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, অনেকের কাছে এটা একটু অস্বাভাবিক মনে হলেও এটা সর্বদলীয় সরকার গঠনের কারণে ঘটেছে। বিএনপি এলে তাদেরও এভাবে আসন বিলানো হতো।

প্রার্থীবিহীন এই পাতানো নির্বাচন নিয়ে এ তামাশা অবিলম্বে বন্ধ করা ইসি’র দায়িত্ব। তাদের হাতে আইন আছে। গতকাল ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির যোগ দেয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সিইসি বলছে, এখন এলে জটিলতা বাড়বে। তার মানে বিনা ভোটে ১৫৪ জনের বিজয়ে কোন জটিলতা দেখেন না তিনি। বিচারপতি এম এ আজিজ-ও এমন উক্তি করতে লজ্জায় পড়তেন।

অন্যদিকে জামায়াতি নাশকতা এবং তা প্রতিরোধে জনপ্রশাসনের ব্যর্থতা ও অপারগতায় মানুষ অব্যাহতভাবে আতঙ্কগ্রস্ত। জনজীবন-যাপনের অচলায়তন অব্যাহত। অভাবনীয় এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। কোথাও কোন পোস্টার নেই। প্রচারণা নেই।
১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। এবার তাদের শপথ পড়ানো হবে। পরিহাস হলো যারা জয়ী হয়েছেন সেখানে অপেক্ষাকৃত পেশিশক্তিধারীরা নির্বাচিত হয়েছেন। নিরীহরা ৫ই জানুয়ারি যুদ্ধে যাবেন।

১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একদলীয় নির্বাচন করার পরিস্থিতি নিয়ে এত দিন আলোচনা ছিল। এখন সে আলোচনা বাসি। খালেদা জিয়ার বদনাম কমেছে। তিনি এখন থেকে গর্বের সঙ্গে তৃতীয় দফার প্রধানমন্ত্রী বলবেন। এত দিন বিএনপি এটা বলতে লজ্জা পেতো। সেই লজ্জার দিন শেষ। সেই নির্বাচনে প্রার্থীদের অভাব ঘটেনি। সামরিক শাসনামলের ভোটারবিহীন নির্বাচনগুলোতেও প্রার্থী সঙ্কট তীব্র হয়নি। সরকারি দল যে আশা নিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে ৩ বছরের বিধান বাতিল করে দলত্যাগের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, তা সুফল দেয়নি। এমনকি বহুল আলোচিত বিএনএফ কুচক্রীদের মুখে চুনকালি মেখেছে। বিএনএফ ডাব্বা মেরেছে।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাহেব যার বাড়িতে পেট্রল বোমার হামলা ঘটেছে, তিনি যদিও আশ্বস্ত করেছেন, শিগগিরই এ অবস্থা কেটে যাবে কিন্তু তার এ আশ্বাসের বাস্তব ভিত্তি দেখা যাচ্ছে না। ইসিকে মানতে হবে, নির্বাচনী প্রচারণার পরিবেশ নেই। চারদিকে সন্ত্রাস। পুলিশ অ্যাকশনে। দিন যাচ্ছে। মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। অথচ এর কোন বিচার-আচার নেই। কবে এসবের বিচার হবে তা কারও জানা নেই। জামায়াতের নির্বিচার নাশকতা ও ব্যাপক ভিত্তিক নিষ্ঠুরতার কথা বলা হয়েছে গতকাল অনেক সমাবেশে; কিন্তু কেউ বলেনি তা থামানোর দায় কার। যারটা যাচ্ছে তারই যাচ্ছে। নাশকতা ও নৈরাজ্য মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রায় অসহায় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যদিও সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে।

ভোট কেন্দ্রে আসতে প্রতিপক্ষ কিংবা সংখ্যালঘু ভোটারদের বাধাদান, নির্বাচনে সম্ভাব্য কারচুপি কিংবা ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তার কারণ ছিল। এবারে তা নেই। জনসাধারণ ভোট কেন্দ্রে পৌঁছাবে না, এ ধরনের আশঙ্কামূলক পরিস্থিতিতে এর আগে সেনা মোতায়েনের কথা ওঠেনি। অতীতে যেসব পরিস্থিতিতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, এবারের পরিস্থিতি তা থেকে ভিন্ন। তাই সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ না করে নির্বাচন করা না-করা সমান কথা। মন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, সাংবিধানিক বাধা আছে। ইসি’র পক্ষে আর তফসিল বদলানোর সুযোগ নেই।

সরকারের সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে জাপা। এরশাদ হিসাবে ঠিক অছেন। কারণ তিনি ডুবন্ত নৌকায় চড়বেন কেন? সংবিধানের ১২৩(৩খ) অনুচ্ছেদ মতে, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের দ্বিতীয় বিকল্প খোলা। এমনকি সংসদ রেখেও ১৫ দিন নির্বাচন পিছানোর সুযোগ আছে। ইসি কি প্রমাণ দেবে না যে, তারা সরকারি ভাঁড় নয়। সংসদ করতে তারা সঙ সাজেনি।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026