শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা নিয়ে ব্রেক্সিট চুক্তি বা সমঝোতা আটকে দেয়ার অধিকার আছে বৃটিশ এমপিদের। ভোটের মাধ্যমে ব্রেক্সিট নিয়ে চূড়ান্ত বোঝাপড়া প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন তারা।
যদি তাই হয় তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়া থমকে বা আটকে যেতে পারে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে প্রথমবারের মতো এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
এ খবর দিয়েছে বৃটেনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। এতে বলা হয়েছে, ডাউনিং স্ট্রিট একমত হয়েছে যে, এমপি ও তার সহযোগীরা সমঝোতা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর এর ওপর ভোট দেয়ার সুযোগ খুব বেশি। হাই কোর্টে এ ইস্যুটি তোলার পর এমন ইঙ্গিত মিলেছে।
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বার বারই ব্রেক্সিট নিয়ে পার্লামেন্টে ভোটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর পর ওই ইঙ্গিত মিলেছে। এতে ওই সময়ের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডাউনিং স্ট্রিটের এমন ইঙ্গিতের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থি কনজার্ভেটিভ দলের একজন সিনিয়র এমপি তাদের বিজয় ঘোষণা করেছেন।
বলেছেন, আমাদের পার্লামেন্টারিয়ান আসনের স্বার্থের বিষয়ে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বের অধিকারে বিশ্বাস করি যারা এ বিজয় তাদের সবার।
এ অবস্থায় ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফয়সালা যদি পার্লামেন্টে নির্ধারিত হয় তাহলে তার প্রভাব কি হবে তা নিয়েও বিতর্ক আছে। পার্লামেন্টের কাছে সিদ্ধান্ত জানানোর অধিকার দেয়ার পর পরই মুদ্রাবাজারে ডলারের বিপরীতে বৃটিশ পাউন্ডের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার পার্লামেন্টকে এমন অধিকার দেবে না এটা আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনীতিক তেরেসা মে’কে বুদ্ধি দিয়েছেন যে, লিসবন চুক্তি ৫০ সক্রিয় করার ক্ষেত্রে তাকে পার্লামেন্টে ভোটের প্রয়োজন হবে না।
তিনি নির্বাহী ক্ষমতায় তা নিজেই সক্রিয় করতে পারবেন। তবে সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ জানানোর তৃতীয় দিন শেষে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে ওই ইঙ্গিত মিলেছে। আইনি লড়াইয়ে হাইকোর্টকে জেমস ইয়াদি বলেছেন, ব্রাসেলসের সঙ্গে যেকোনো প্যাকেট নিয়ে কাজ করতে হলে তা পার্লামেন্টে অনুমোদিত হতে হবে।
এর ফলে প্রত্যাশা জাগ্রত হয়েছে যে, কম করে হলেও যদি এমপিরা ও তাদের সহযোগীরা যদি ব্রেক্সিট চুক্তির বাণিজ্য, অভিবাসন ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আপত্তি করেন তাহলে তারা ব্রেক্সিট চুক্তি সংশোধন করতে পারবেন। এর অর্থ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার কথা ২০১৯ সালের শুরুর দিকে। সম্ভবত কোনো চুক্তি ছাড়াই তা হতে পারে।
ওপেন বৃটেন নামের একটি প্রচারণা গ্রুপ আছে। এরা ইউরোপের সঙ্গে বৃটেরন অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়। এর একজন সমর্থক কারমাইকেল। তিনি বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দুই বছর যথেষ্ট সময় নয়। তবে সরকার ব্রেক্সিটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে পার্লামেন্ট কথা বলার যে সুযোগ দিতে সম্মত হয়েছে তা একটি উৎসাহব্যাঞ্জক বিষয়।
তবে সমঝোতা শেষ হয়ে যাওয়ার আগে পার্লামেন্টকে ভূমিকা রাখতে দেয়া উচিত অবশ্যই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল সূচনা হতে পারে অনুচ্ছেদ ৫০ সক্রিয় করার আগে আসন্ন সমঝোতা নিয়ে সরকারের নীতির বিষয়ে বিতর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন ও হাউজ অব কমন্সে এ বিষয়টি ভোটে দেয়া।
ওদিকে লিবারেল ডেমোক্রেট দলের পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র টম ব্রেক বলেছেন, ব্রেক্সিট নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া উচিত দ্বিতীয় আরেকটি গণভোটের মাধ্যমে।
আদালতে মামলার কারণে সরকার শেষ পর্যন্ত ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে পার্লামেন্টকে সুযোগ দিতে রাজি হয়েছে। তাই বৃটিশ জনগণ যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে লড়াই করে যাবে লিবারেল ডেমোক্রেট।
তবে সরকার বলছে, আগামী বছরের শুরুর দিকে অনুচ্ছেধ ৫০ সক্রিয় করার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার গতি থামিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না।
তবে শীর্ষ স্থানীয় বেশ কিছু আইনজীবী মনে মত দিয়েছেন যে, বৃটেন তার ঘোষণা প্রত্যাহার করতে পারবে না এমনই কোনো বাধার কথা বলা নাই অনুচ্ছেদ ৫০-এ। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড টাস্ক সম্প্রতি বলেছেন, ব্রেক্সিট সত্যিকার অর্থে তাদের স্বার্থে যাচ্ছে কিনা তা পরে নির্ধারণ করতে পারবে বৃটেন।
হাই কোর্টে সরকারের বিরুদ্ধে যে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে তাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন লন্ডনের ব্যবসায়ী নারী গিনা মিলার। তিনি এতে দাবি করেছেন, কখন অনুচ্ছেদ ৫০ সক্রিয় করা হবে সে বিষয়ে এমপিদের ভোট দেয়ার অধিকার দিতে হবে। কিন্তু সরকারি আইনজীবীরা এর বিরোধিতা করেছেন।
তারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সেটা না করে রয়েল প্রিরোগেটিভ ক্ষমতা ব্যবহার করে আগামী মার্চে আইনগতভাবেই এ অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এটর্নি জেনারেল জেরেমি রাইট আদালতে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের জন্য বৃটিশ জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে অকার্যকর করার জন্য আদালতে এই চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, হাইকোর্টে এ মামলার শুনানি করছেন সিনিয়র তিনজন বিচারক। তারা হলেন লর্ড প্রধান বিচারক লর্ড থমাস, দ্য মাস্টার অব দ্য রোলস স্যার তেরেন্স এথারটন ও লর্ড জাস্টিস সেলস। তবে এ আদালতেই সব শেষ হবে না। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন সুপ্রিম কোর্ট।
হাই কোর্টে শুনানিতে ইয়াডি বলেছেন, অনুচ্ছেদ ৫০ এর অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তি করতে হলে তাতে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এ মুহূর্তে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো এমন কোনো চুক্তি করার ক্ষেত্রে অনুমোদনের বিষয়টি ‘ভেরি লাইকলি।
এর আগে ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী ডেভিড ডেভিস বলেছিলেন, ব্রেক্সিট নিয়ে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, হাউজ অব লর্ডসের ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া নস্যাৎ করে দেয়ার চেষ্টা করা উচিত হবে না।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ছিলেন নীরব। ওদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের ক্ষেত্রে ছায়া স্টেট সেক্রেটারি কিয়ের স্টারমার কিউসি এমপি বলেছেন, ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কিছুতে হাউজ অব কমন্সের জড়িত থাকা প্রয়োজন।