দীন ইসলাম: ভিসা ও অন্যান্য কারণে প্রয়োজনীয় হজযাত্রী নেই। এ কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাতিল প্রতিদিনের ঘটনা। হজ ফ্লাইটের এমন জটিলতায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় চিন্তিত।
তারা মনে করছেন, হজ ফ্লাইট জটিলতা দু-এক দিনের মধ্যে সমাধান না হলে সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করবে। তখন অনেক হজযাত্রী হজে যেতে পারবেন না। বিমান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪শে জুলাই থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হয়েছে। ২৬শে আগস্ট পর্যন্ত হজ ফ্লাইট চলবে।
অন্যদিকে ফিরতি হজ ফ্লাইট ৬ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ৫ই অক্টোবর শেষ হবে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১২টি এবং সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের তিনটি হজ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এ কারণে বিমানের ক্যাপাসিটি লস হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৮০ জন এবং সৌদি এরাবিয়ানের লস হয়েছে এক হাজার ২০০ জন।
এসব হজযাত্রী পরিবহন করতে বাড়তি স্লট নিতে হবে বিমান ও সৌদিয়া এয়ারলাইন্সকে। বিমান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হজযাত্রী পরিবহনের সংকট এড়াতে ধর্ম মন্ত্রণালয়, হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন বড় এজেন্সিকে তিনটি পরামর্শ দেয়া হয়েছে। হাবকে দ্রুত ভিসা করতে দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। ভিসা হয়ে যাওয়ার পর দ্রুত ফ্লাইট নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্লাইট না নিলে কি কি সমস্যা হতে পারে তাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে স্টেক হোল্ডার সবার কাছে শর্ট টেক্সট মেসেজ (এসএমএস) পাঠানো হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিমান তাদের পরিকল্পনায় সময় লস হতে এ চিন্তা মাথায় রেখে অতিরিক্ত ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে রেখেছে। তবে দুয়েক দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করবে। গতকাল হজ ফ্লাইটের চলমান জটিলতা নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বাড়তি স্লটসহ নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়।
সভা শেষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ভিসা ও অন্যান্য কারণে হজ ফ্লাইট জটিলতা দু-এক দিনের মধ্যে সমাধান না হলে আরো সমস্যা দাঁড়িয়ে যাবে। সমস্যা সমাধানে তিনটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে আশা করছি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সৌদি সিভিল অ্যাভিয়েশনের কাছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের জন্য স্লট চেয়ে দুয়েক দিনের মধ্যে আবেদন করবে বিমান। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হবে। প্রয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নেয়া হবে।
গতকাল বিমান মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃ মন্ত্রণালয় সভায় আলোচনায় বলা হয়, অতীতে প্রথম ১০ দিনে বিমানের কোনো সিট খালি যায়নি। এবারই প্রথম ১০ দিনেই অনেকে হজে যাননি। এবার ৪৬ হাজার ৭৯২ জনের ভিসা হলেও ইতিমধ্যে সৌদি আরব পৌঁছেছেন ২৯ হাজার ৮৩৯ জন। আরো ৪৭ হাজার ৭৬১ জনকে পরিবহন করতে হবে। ২৬শে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান এবং ২৮শে আগস্ট সৌদি এয়ারলাইন্স যাত্রী নিয়ে সৌদি আরব যাওয়ার স্লট রয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে স্লট বাড়াতে হবে।
সভায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সৌদি সরকার মোয়াল্লেম ফি বাড়িয়েছে। আগে ১২শ’ রিয়াল থাকলেও এবার ১৫শ’ রিয়াল করা হয়েছে। এ সমস্যা ৯১টি এজেন্সির। এ সমস্যা অনেকটা কেটে গেছে। এ ছাড়া হজ প্যাকেজ ঘোষণার পর এবার সৌদি সরকার ঘোষণা করেছে, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে যারা হজ করেছেন তাদের দুই হাজার রিয়াল অতিরিক্ত দিতে হবে। এ সমস্যার করণে দেখা গেছে সর্বোচ্চ সাত হাজার হাজির সমস্যা হবে। কিন্তু মোয়াল্লেম ফি বাড়ানোর কারণে ১৭ হাজার হাজির সমস্যা হবে।
সভা শেষে বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, আশা করছি এসব সমস্যা কেটে যাবে। সৌদি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সারা বিশ্বের জন্য কার্যকর করেছে। সৌদি সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বসবে। বৈঠকে বাড়তি ফি মওকুফ করার সিদ্ধান্ত হতে পারে। না হলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি বা এসএমএস দিয়ে হাজিদের জানানো হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সৌদি সরকারের কাছে ফি মওকুফ করার আবেদন করেছি।
এদিকে শিডিউল ফ্লাইটের যাত্রীদের বাদ দিয়ে হজযাত্রী বহন করতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বিমান ও সৌদিয়াকে নির্দেশনা দিয়েছে। এরই মধ্যে নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শঙ্কায় সিলেটের হজ যাত্রীরাও
ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে জানান, হজযাত্রীদের ফ্লাইট নিয়ে সিলেটেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। সিলেটবাসীর দাবি হচ্ছে সরাসরি ৫ ফ্লাইট। গতকাল পর্যন্ত বিমান কর্তৃপক্ষ ৪টি ফ্লাইট দেয়ার কথা জানিয়েছে। এই চারটির মধ্যে আবার একটির সিডিউল মিলছে না। আর যে ফ্লাইটগুলো দেয়া হচ্ছে সেগুলো নিয়ে সমস্যা কাটছে না। এ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারছে না বিমান কর্তৃপক্ষ।
এ অবস্থায় আগামী ৭ই আগস্ট সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৪১৯ জন হজযাত্রী নিয়ে সরাসরি ফ্লাইট সিলেট থেকে জেদ্দার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবে। হাব সূত্র জানিয়েছে সিলেটে এবার সব মিলিয়ে হজযাত্রীর সংখ্যা ৩৬০০। তাদের ভিসাপ্রাপ্তি কিংবা টিকিটপ্রাপ্তিতে কোনো সমস্যা হয়নি।
এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক যাত্রী সিলেট থেকে না গিয়ে ঢাকা হয়ে হজ পালনে সৌদি আরবে যাচ্ছেন। এতে করে চাপ অনেকটা কমে এসেছে। সিলেটে বর্তমানে রয়েছেন প্রায় ১৮০০ থেকে ২০০০ মতো হজযাত্রী। এরা সবাই সিলেট থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে জেদ্দা যাওয়ার জন্য আগ্রহী।
কারণ, এই যাত্রীদের মধ্যে মহিলা ও বৃদ্ধ রয়েছেন। অনেকেই আবার একাও যাচ্ছেন। এজন্য সিলেটের হাব নেতারা এবার বাংলাদেশ বিমানের কাছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ৫টি হজ ফ্লাইট দাবি করেন। এই ফ্লাইটগুলো পেলে হজযাত্রীরা ভোগান্তি ছাড়া জেদ্দা পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হবে না বলে বিমান কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন তারা। কিন্তু বিমান কর্তৃপক্ষ সিলেটের যাত্রীদের জন্য প্রথমে ৩টি ফ্লাইট দেয়।
এরপর তারা জানিয়ে দেয়, আর কোনো ফ্লাইট বিমান কর্তৃপক্ষ সিলেট থেকে সরাসরি দিতে পারবে না। বিমান সংকটসহ নানা জটিলতার কারণে বিমান কর্তৃপক্ষ এই অনীহা প্রকাশ করে। তবে- গতকাল বিমান কর্তৃপক্ষ সিলেটবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে আরো একটি ফ্লাইট বাড়িয়েছে।
সুতরাং এখন পর্যন্ত চারটি ফ্লাইট পাচ্ছেন সিলেটবাসী। এই ফ্লাইটগুলোর মধ্যে প্রথমটি আগামী ৭ই আগস্ট সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করবে। এরপর ২০, ২৩ ও ২৫ আগস্ট আরো তিনটি ফ্লাইট সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি সৌদি আরবে যাবে বলে বিমান সূত্র জানিয়েছে।
কিন্তু ওই ফ্লাইটগুলোতে আপত্তি জানিয়েছেন সিলেটের হাব নেতারা। তারা বলেন সিলেট থেকে ২০ আগস্ট যে ফ্লাইটটি দেয়া হয়েছে সেটির ফিরতি ফ্লাইট আগে হবে। এতে করে যারা হজে যাবেন তারা পবিত্র মদিনা শরীফে ৫ দিন অবস্থান করেই চলে আসতে হবে। মদিনাতে অবস্থানের কথা রয়েছে ৮ দিন। সেটিও একটি আনুষ্ঠানিকতা।
হজ এজেন্সি অব বাংলাদেশ হাব এর সিলেটের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল কবির চৌধুরী শিরু জানিয়েছেন, হাব চাচ্ছে ৫টি ফ্লাইট। দেয়া হচ্ছে ৪টি ফ্লাইট। একটি ফ্লাইট এখনো সংকট রয়েছে।
এছাড়া হাব নেতাদের দাবি হচ্ছে, পরবর্তী ফ্লাইটগুলো ২২, ২৩, ২৪, ২৫ আগস্ট দিতে। কিন্তু সেই তারিখগুলো নির্ধারিত করা হচ্ছে না। ২০ তারিখের ফ্লাইটে কোনো যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ সব হজযাত্রীরাই চাচ্ছেন মদিনা শরীফে ৮ দিন অবস্থান করতে। সুতরাং বিমান কর্তৃপক্ষ ১ অক্টোবরের ফিরতি ফ্লাইট আরও ৪ দিন পিছিয়ে নিলে এ সমস্যার সমাধান হবে।
সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল জানিয়েছেন, এবার হজ যাত্রীদের জন্য ভিসা ও টিকিটের কোনো সংকট নেই। বিমান কর্তৃপক্ষ সিলেটের প্রতি একটু সুনজর দিলে যে সংকট আছে সেটিও কাটিয়ে উঠা সম্ভব। এজন্য তিনি বিমানকে দ্রুত সিদ্বান্ত গ্রহণের দাবি জানান।
বিমান বাংলাদেশের সিলেটের সহকারী ব্যবস্থাপক আকবর আলী হাওলাদার জানিয়েছেন, বিমান চাচ্ছে সিলেটের সিডিউল যথাযথ রাখতে। ইতিমধ্যে চারটি ফ্লাইট দেয়া হয়েছে। এই ফ্লাইটগুলোর বাইরে যেসব হজযাত্রী সিলেটের থাকবেন তাদের ঢাকা হয়ে সৌদি আরবে পাঠানো হবে।
সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট অপারেট করতে হলে কিছু ঝামেলা রয়েছে। সিলেটের আবহাওয়াও একটি বড় ফ্যক্টর বলে জানান তিনি। এরপর বিমান কর্তৃপক্ষ সিলেটের মানুষকে সেবা দিতে চেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি।