রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৩৯

সাকা চৌধুরীর রায় ফাঁস: ট্রাইব্যুনালের স্বীকার

সাকা চৌধুরীর রায় ফাঁস: ট্রাইব্যুনালের স্বীকার

এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শীর্ষবিন্দু নিউজ: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার চূড়ান্ত রায়ের খসড়া কপির কিছু অংশ কোন না কোনভাবে ফাঁস হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার। এ বিষয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার একেএম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ গতকাল এ তথ্য জানান।

মঙ্গলবার রায় ঘোষণার দিনেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ও পরিবারের পক্ষ থেকে রায় ফাঁসের অভিযোগ করা হয়। এদিনে চলা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই গতকাল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ বলেন, চূড়ান্ত রায় প্রকাশের আগে সেটা ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে খসড়া আকারে প্রস্তুত করা হয়। চূড়ান্ত রায়ের সঙ্গে কথিত ফাঁস হওয়া রায়ের অনেক জায়গায় মিল নেই। মূল রায়ে অনুচ্ছেদ নম্বর থাকে। কিন্তু কথিত ফাঁস হওয়া রায়ে অনুচ্ছেদ নম্বর নেই। যাঁরা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান রেজিস্ট্রার।

ওদিকে, একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে রায় ফাঁসের ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে। আগের রাতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন পত্রিকায় রায় ছড়িয়ে পড়ে। রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়া থেকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এগুলো পড়ার দরকার নাই, এগুলো তো গত দুই দিন ধরে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। জিডিতে যা বলা হয়েছে: এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার একেএম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। এর নম্বর ৮৫।

এতে বলা হয়, ট্রাইব্যুনাল ১-এ বিচারাধীন আইসিটি মামলা নম্বর ০২/২০১১-চিফ প্রসিকিউটর বনাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় প্রচারের জন্য দিন ধার্য ছিল মঙ্গলবার। কিন্তু রায় ঘোষণার পরপরই আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সদস্যগণ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকালে জানান যে, উক্ত মামলার রায়ের কপি তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পূর্বেই প্রাপ্ত হয়েছেন। আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকালে আদালত হতে রায়ের কপি সরবরাহ করার পূর্বেই একটি ডকুমেন্ট ক্যামেরার সামনে প্রদর্শন করে বলেন, এই সেই ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত রায়ের কপি। যা তারা রায় ঘোষণার পূর্বেই প্রাপ্ত হয়েছেন এবং সেটি নিয়েই তারা আদালত কক্ষে প্রবেশ করেছেন।

তিনি আরও বলেন যে, আদালত হতে প্রচারিত রায় এবং ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত রায়ের মধ্যে মিল রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হতে প্রচারিত সব রায় ট্রাইব্যুনালেই প্রস্তুত করা হয়। রায় ঘোষণার পূর্বে রায়ের কোন অংশের কপি অন্য কোনভাবে প্রকাশের সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও কথিত খসড়া রায়ের অংশ কিভাবে ইন্টারনেটে প্রচারিত হলো বা কিভাবে ট্রাইব্যুনাল হতে খসড়া রায়ের অংশবিশেষ ফাঁস (লিকড) হলো, তা উদ্বেগের বিষয়। বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার প্রতি হুমকিস্বরূপ।

উল্লেখ্য, িি.িঃৎরনঁহধষষবধশং.নব ওয়েবসাইটে কথিত খসড়া রায়ের অংশ আপলোডেড দেখা যায়। এমতাবস্থায় বিষয়টি তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হলো। রায় প্রকাশের পেছনে বড় বিনিয়োগ: ট্রাইব্যুনাল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় ঘোষণার আগে তা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে এ কাজে বড় বিনিয়োগ হয়েছে বলেও মনে করছে ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে বিতর্কিত করতেই এ কাজ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনের করা মন্তব্যের বিষয়ে গতকাল ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু। জবাবে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান (বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর) প্রায় ৩২ বছর ধরে বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। আমি না হয় সামান্য ছোট একজন জাজ।

কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানসহ অপর সদস্য বিচারপতি তো এত ছোট নন। আমাদের দেয়া বিগত রায়গুলো পড়ে দেখুন। সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে রায় দেয়া হয়েছে, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রায় দেয়া হয়েছে তা পড়ে দেখুন। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় থেকে রায় প্রকাশ হওয়ার যে ঘটনা বলা হয়েছে এর পেছনে বড় ধরনের ইনভেস্টমেন্ট রয়েছে। এটা এক ধরনের ষড়যন্ত্র। এসময় প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, রায় ঘোষণার পর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী, ছেলে ও আইনজীবীরা কতগুলো জাজমেন্টের বান্ডিল হাতে নিয়ে মিডিয়ার সামনে প্রচারণা চালিয়েছেন যে, রায় আগেই প্রকাশ হয়ে গেছে। এ ধরনের প্রচারণা চালানোর জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আপনারা লিখিত আবেদন করুন। আমরা বিষয়টি দেখবো। সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত দাবি: এদিকে, রায় ঘোষণার আগেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলায় রায় ফাঁসের ঘটনা সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। গতকাল সমিতির দক্ষিণ হলে এক জরুরি সাধারণ সভা থেকে এ আহ্বান জানানো হয়।

আইনজীবী সমিতির সভাপতি সিনিয়র এডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেন সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। এতে বলা হয়, গতকাল একটি রায় ঘোষণার আগেই ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় দেশে-বিদেশে দেশের উচ্চ আদালতসহ বিচার ব্যবস্থার প্রতি ধূম্রজাল সৃষ্টি এবং জনমনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি অশ্রদ্ধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

খন্দকার মাহবুব মতামত ব্যক্ত করায় তার বিরুদ্ধে কয়েকজন প্রসিকিউটর এবং এটর্নি জেনারেল কার্যালয় কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ করায় সমিতি তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এটর্নি জেনারেল কার্যালয় এবং যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কতিপয় প্রসিকিউশন কর্মকর্তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত যে কোন উদ্যোগ নেয়া থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সভায় সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, যারা খন্দকার মাহবুবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, আদালত অবমাননার অভিযোগ আনছেন, তাদের বলি, বার ও বেঞ্চের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করবেন না। এই যে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা কারও জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, খন্দকার মাহবুব হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এটর্নি জেনারেল প্রধান বিচারপতির এজলাসে মৌখিক আবেদন করেছিলেন। খন্দকার মাহবুব হোসেন একজন বিজ্ঞজন। তিনি ৭২ সালে দালাল আইনের ট্রাইব্যুনালে প্রধান প্রসিকিউটর ছিলেন। উনি প্রহসনের বিচার সংশ্লিষ্টদের সম্পর্কে বলেছেন। ট্রাইব্যুনালের সম্পর্কে তো বলেন নাই।

 

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের খসড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকে ফাঁস হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এমনটাই অনুমান করছেন ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার ও মুখপাত্র এ কে এম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। ঘটনা উদ্ঘাটনে তদন্তের জন্য শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-১ মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাকা চৌধুরীকে ফাঁসির দণ্ড দেন। এরপর সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা একটি নথি সাংবাদিকদের দেখিয়ে দাবি করেন, আগের রাত থেকেই বিভিন্ন ওয়েবসাইটে রায়ের অনুলিপি পাওয়া যাচ্ছে। সেটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া গেছে বলে ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, সার্বিক বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে এটি অনুমান করা হচ্ছে, কথিত খসড়া রায় ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে কম্পোজ করার পর কোনো না কোনোভাবে লিকড হয়েছে। বিষয়টি উদ্ঘাটনের জন্য ইতিমধ্যেই ট্রাইব্যুনালের নির্দেশক্রমে রেজিস্ট্রার থানায় জিডি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, সত্য বেরিয়ে আসবে এবং এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করা যাবে। ট্রাইব্যুনালে কর্মরত কেউ যদি এই অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে সকালে বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এর কার্যক্রম শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ কথিত রায় ফাঁসের বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের নজরে আনে। এ সময় ট্রাইব্যুনাল একে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ উল্লেখ করে বলেন, ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করতে বিশাল অঙ্কের অর্থ ছড়ানো হয়েছে।

পরে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে করা সংবাদ ব্রিফিংয়ে রেজিস্ট্রার বলেন, ট্রাইব্যুনালের আইন ও বিধি অনুসারে, রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তার সত্যায়িত অনুলিপি সব পক্ষকে দিতে হয়, যা অন্য আইনে নেই। এ জন্য পূর্ণাঙ্গ রায় চূড়ান্ত না করে ট্রাইব্যুনাল রায় দেন না। পূর্ণাঙ্গ রায় মূলত ঘোষণার দু-এক দিন আগে চূড়ান্ত করা হয়। শুধু সাজাসংশ্লিষ্ট অংশটি রায়ের দিন বিচারকগণ একমত হয়ে চূড়ান্ত করেন।

নাসিরউদ্দিন মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতের কর্মকর্তা। মঙ্গলবার রায় ঘোষণার জন্য বিচারকেরা আসন গ্রহণের পর আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দায়িত্ব ছিল, কথিত রায় ওয়েবসাইটে আগের দিন রাতে পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নজরে আনা। কিন্তু আইনজীবীরা তা না করে আনুষ্ঠানিকভাবে রায় ঘোষণার পর কথিত রায়ের অনুলিপি গণমাধ্যমকে দেখিয়ে দাবি করেন, রায় আগেই ফাঁস হয়েছে এবং আইন মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার থেকে তা হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীর এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক আচরণ অসদাচরণের পর্যায়ে পড়ে। নিঃসন্দেহে রায় ঘোষণার পর এমন দাবি করা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চক্রান্তের অংশ।

ট্রাইব্যুনালের মুখপাত্র সাংবাদিকদের আরও বলেন, কথিত ফাঁস হওয়া রায়ের সঙ্গে মূল রায়ের মাত্র কয়েকটি স্থানে মিল আছে। কিন্তু তা আদৌ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার জন্য প্রস্তুত করা হয়নি। ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ে অনুচ্ছেদ নম্বর উল্লেখ করা থাকলেও কথিত ফাঁস হওয়া রায়ে কোনো অনুচ্ছেদ নম্বর নেই। স্পষ্টতই এটি একটি খসড়া, যা রায় ঘোষণার বেশ কয়েক দিন আগে কোনোভাবে ফাঁস করেছে দুষ্টচক্র। তারা আনুষ্ঠানিক রায় ঘোষণার ঠিক আগের রাতে খসড়াটি ওয়েবসাইটে দিয়েছে। এ থেকে এটি স্পষ্ট, একটি সংঘবদ্ধ চক্র যারা ট্রাইব্যুনাল ও এর বিচারিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান এবং যারা এই অপকর্মের সুবিধাভোগী, তারাই এ কাজ করেছে।

জিডি: ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের করা শাহবাগ থানার ৮৫ নম্বর সাধারণ ডায়েরিতে বলা হয়েছে, ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাকা চৌধুরীর মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু রায় ঘোষণার পরপরই আসামি সাকা চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়ায় জানান, ওই মামলার রায়ের অনুলিপি তাঁরা আগেই ইন্টারনেটে পেয়েছেন। আদালত থেকে রায়ের অনুলিপি সরবরাহ করার আগেই আসামির স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে একটি নথি দেখিয়ে বলেন, এই সেই ইন্টারনেট থেকে পাওয়া রায়ের কপি, যা তাঁরা রায় ঘোষণার আগেই পেয়েছেন এবং তা নিয়েই তাঁরা আদালতকক্ষে ঢুকেছেন। ফরহাত কাদের চৌধুরী আরও বলেন, আদালতের ঘোষিত রায় ও ইন্টারনেট থেকে পাওয়া রায়ের মধ্যে মিল রয়েছে।

জিডিতে বলা হয়, ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত সব রায় ট্রাইব্যুনালেই প্রস্তুত করা হয়। রায় ঘোষণার আগে এর কোনো অংশের অনুলিপি অন্য কোনোভাবে প্রকাশের সুযোগ নেই। কিন্তু তার পরও কথিত খসড়া রায়ের অংশ কীভাবে ইন্টারনেটে প্রকাশিত হলো বা কীভাবে ট্রাইব্যুনাল থেকে খসড়া রায়ের অংশবিশেষ ফাঁস হলো, তা উদ্বেগের বিষয়। www.tribunalleaks.be ওয়েবসাইটে কথিত খসড়া রায়ের অংশ দেখা যায়। বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার জন্য হুমকি। এই অবস্থায় বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

তদন্ত শুরু: আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালের করা জিডির ভিত্তিতে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ পাবে এবং তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইন মন্ত্রণালয় থেকে ট্রাইব্যুনালের রায় ফাঁসের সুযোগ নেই। যদি ফাঁস হয়েই থাকে, তবে তা ট্রাইব্যুনাল থেকে হয়েছে। তদন্তেই বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।

তদন্ত দাবি আইনজীবী সমিতির: এ ঘটনায় সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। গতকাল দুপুরে সমিতির দক্ষিণ হলে এক সভা থেকে এ দাবি জানানো হয়।

সভার সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেন সমিতির সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন। এতে বলা হয়, রায় ফাঁসের ঘটনায় দেশে-বিদেশে উচ্চ আদালতসহ বিচারব্যবস্থার প্রতি জনমনে অশ্রদ্ধা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যেকোনো উদ্যোগ নেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন রায়ের বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করায় তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকজন প্রসিকিউটর এবং অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ করায় সমিতি তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

প্রসঙ্গত, সাকা চৌধুরীর রায়ের পর খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছিলেন, এই বিচারের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, বাংলার মাটিতে তাঁদের সবার বিচার করা হবে।

জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, খসড়া রায় ফাঁসের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের পেছনে যে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট, নাকি বাইরের লোক খসড়া ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তা তদন্তে বের হয়ে আসবে।

কারা খসড়া রায় ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে—এ প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমার মনে হয়, যাদের হাতে এ রায় প্রথমে দেখা গেছে, তারাই এর সঙ্গে জড়িত। না হলে, আর কেউ জানল না, আমরা পেলাম না, অথচ তাদের হাতে অনুলিপি চলে গেল কীভাবে?’

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক ও বেলজিয়ামপ্রবাসী আইন বিশেষজ্ঞ আহমেদ জিয়াউদ্দিনের মধ্যে স্কাইপ কথোপকথন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফাঁস হয়। ধারণা করা হয়, কম্পিউটারে কোনো রেকর্ডিং যন্ত্র বসিয়ে বা কম্পিউটার হ্যাক করে ওই তথ্য চুরি করা হয়েছিল। এর দুই দিন পর বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করেন।

স্কাইপ কেলেঙ্কারির পর সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে এ বিষয়ে তদন্তের দাবি উঠেছিল। সরকারের পক্ষ থেকেও তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে আর এই তদন্তের কোনো অগ্রগতি সরকার থেকে জানানো হয়নি।

ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই সময় স্কাইপ কেলেঙ্কারির তদন্ত করে দোষীদের ধরা গেলে এখন আবার রায়ের খসড়া ফাঁস হওয়ার মতো ঘটনা ঘটত না।

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © 2021 shirshobindu.com