বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৩:০১

চীনা মুসলিমরা যেমন আছেন বন্দিশিবিরে

চীনা মুসলিমরা যেমন আছেন বন্দিশিবিরে

শীর্ষবিন্দু আর্ন্তজাতিক নিউজ: চীনে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তাসংবলিত বন্দিশিবিরগুলোয় লাখ লাখ মুসলিমকে পদ্ধতিগতভাবে মগজধোলাই করা হয়।

এসব শিবিরে আটকদের বেশির ভাগই সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম সমপ্রদায়ের সদস্য। তাদেরকে কোনো বিচার প্রক্রিয়ার সুযোগ না দিয়েই বন্দি করে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরকম বন্দি উইঘুরদের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।

সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট (আইসিআইজে)-এর এক প্রতিবেদনে চীনা সরকারের ফাঁস হওয়া মেমো উদ্ধৃত করে এমনটা বলা হয়েছে। বিবিসি প্যানোরামা, দ্য গার্ডিয়ান সহ মোট ১৭টি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে নথিপত্রগুলো নিয়ে কাজ করেছে আইসিআইজে।

নয় পৃষ্ঠার ওই মেমোটিতে শিনজিয়াং প্রদেশে অবস্থিত শিবিরগুলো পরিচালনার নানা নির্দেশ লিখিত রয়েছে। ২০১৭ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন উপমন্ত্রী ও শিনজিয়াংয়ের শীর্ষ নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তা ঝু হাইলুন সেখানকার শিবির পরিচালনাকারীদের ওই মেমো পাঠিয়েছিলেন।

নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, বন্দিদের পালানোর সুযোগ না দেয়া, সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা, আচরণ ঠিক করতে শাস্তি দেয়া, নিজেদের অতীত নিয়ে অনুতাপ করতে উৎসাহিত করা, মান্ডারিন শিক্ষাকে প্রধান অগ্রাধিকার করে তোলা ইত্যাদি।

আইসিআইজি ফাঁস হওয়া মেমোটির নাম দিয়েছে ‘দ্য চায়না কেবলস’। এই মেমোর মাধ্যমে শিবিরগুলোয় চীনের পদ্ধতিগত মগজধোলাই সমপর্কে প্রথমবারের মতো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। চীন সরকার বরাবর দাবি করে আসছে যে, ওই শিবিরগুলোয় ঐচ্ছিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

কিন্তু ফাঁস হওয়া নথিপত্র অনুসারে, সেখানে সংখ্যালঘুদের বন্দি করে রাখা হয়, বিশ্বাস পরিবর্তনের শিক্ষা দেয়া হয়, শাস্তি দেয়া হয়। যুক্তরাজ্যে নিয়োজিত চীনা রাষ্ট্রদূত নথিপত্রগুলোকে ভুয়া বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আইসিআইজের তদন্তে শিনজিয়াংয়ের বন্দিশিবিরগুলো নিয়ে চীনের দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিগত তিন বছর ধরে অঞ্চলটিতে এসব শিবির স্থাপন করা হয়েছে।

চীন সরকারের দাবি, চরমপন্থিতা মোকাবিলায় ঐচ্ছিক পুনঃশিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে এসব শিবির খোলা হয়েছে। কিন্তু নথিপত্র অনুসারে, শিবির পরিচালনাকারীদের ভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইলুন। শিবিরগুলো থেকে বন্দিদের পালানো বন্ধ নিশ্চিত করা, শিবিরে শৃঙ্খলা ও আচরণগত নিয়ম লঙ্ঘনে শাস্তি প্রদান, বন্দিদের নিজের বিশ্বাস নিয়ে অনুতাপ ও দোষ স্বীকারে উৎসাহিত করা, তাদের মান্ডারিন শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলাকে প্রধান অগ্রাধিকার দেয়া, সত্যিকারে বিশ্বাস পাল্টে রূপান্তরিত হতে উৎসাহিত করা, পুরো শিবির সমপূর্ণভাবে ভিডিও নজরদারিতে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন হেইলুন।

নথিপত্রগুলো উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে, শিবিরের প্রত্যেক বন্দির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নজরদারির আওতায় রাখা হয় শিনজিয়াংয়ের শিবিরগুলোয়। নথিপত্রের নির্দেশে বলা হয়েছে, শিবিরের শিক্ষার্থীদের ঘুমানোর জায়গা নির্দিষ্ট থাকতে হবে, সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকতে হবে। শ্রেণিকক্ষের আসনও নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। কোনোভাবেই ঠিক করে দেয়া অবস্থান পাল্টানো যাবে না।

নথিপত্রে শিবির পরিচালনাকারীদের উদ্দেশ্যে আরো বলা হয়, আচরণগত নিয়মের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। ঘুম থেকে ওঠা, রোল কল, পরিষ্কার হওয়া, টয়লেটে যাওয়া, ঘর সাজানো, কাজ করা, খাওয়া, ঘুমানো, দরজা বন্ধ করা থেকে সবকিছুই নয়ম মেনে চালাতে হবে।

চীনের শিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের আটকে রেখে নির্যাতনের খবর নিয়ে এর আগেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালে ফাঁস হওয়া এক নথিপত্র অনুসারে, ওই বছর মাত্র এক সপ্তাহে ১ হাজার ৫০০ মানুষকে আটক করে শিবিরে পাঠানো হয়েছিল।

পয়েন্ট সিস্টেম
আইসিআইজের ফাঁস করা নথিপত্র অনুসারে, নিজেদের আচরণ, বিশ্বাস ও ভাষা পুরোপুরিভাবে পাল্টে ফেলতে পারলে তবেই মুক্তি মিলে শিবিরের বন্দিদের। আদর্শগত পরিবর্তন, পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ এবং নিয়ম মেনে চলার ওপর নির্ভর করে বন্দিদের ‘পয়েন্ট’ দেয়া হয়। শাস্তি ও পয়েন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের অনুমোদন দেয়া হয় ও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এমনকি মুক্তি পাওয়ার জন্যও একই ব্যবস্থা মানা হয়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের পয়েন্ট দেখে পরিবর্তনের ব্যাপারে নিশ্চিত হলে তবেই মুক্তি মেলে বন্দিদের।

ফাঁস হওয়া মেমো অনুসারে, চীনা নাগরিকদের নজরদারিতে রেখে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে থাকে চীন সরকার। এক নথিপত্র অনুসারে, মোবাইল ফোনে জাপিয়া নামের একটি অ্যাপ থাকায় একবার ১৮ লাখ মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে ৪০ হাজার ৫৫৭ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হয়েছিল।

নথিপত্র অনুসারে, কারো বিরুদ্ধে তদন্তে সন্দেহ দূর না হলে তাদের শিবিরে প্রশিক্ষণ দিতে পাঠানো হয়ে থাকে। নথিপত্রে বিদেশি নাগরিকত্বসমপন্ন উইঘুরদের গ্রেপ্তার করতে বিশেষ নির্দেশ থাকার কথা বলা হয়েছে। এমন কী বিদেশে বসবাসকারী উইঘুরদের ‘ট্র্যাক’ করতেও সরকারি নির্দেশ রয়েছে। বিশ্বজুড়ে চীনা দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো এ কাজে জড়িত।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026