বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৩:০১

করোনাভাইরাস নিয়ে চীনের তথ্য গোপনের চেষ্টা

করোনাভাইরাস নিয়ে চীনের তথ্য গোপনের চেষ্টা

শীর্ষবিন্দু আর্ন্তজাতিক নিউজ: করোনাভাইরাস নিয়ে তথ্য গোপনের চেষ্টা করেছে চীন। ভাইরাসটিস সনাক্ত হওয়ার পর থেকে নানা পর্যায়ে এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশ না করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়েছে সরকার।

তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে শিকার হয়েছেন নানা সমস্যার। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমনটা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত নতুন করোনাভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০৪ জন। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার মানুষ। প্রথম দিকে, চীনা কর্তৃপক্ষ জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও রাজনৈতিক লজ্জা এড়াতে ভাইরাসটির খবর গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভাইরাসটি ডিসেম্বরে সনাক্ত হলেও চীন সরকার এটি মোকাবিলায় পুরোদমে কাজ শুরু করে ২০শে জানুয়ারি।

মাঝের প্রায় সাত সপ্তাহ তা নীরবে ছড়িয়ে পড়ে অনেকদূর। নিউ ইয়র্ক টাইমস ভাইরাসটি ওই সাত সপ্তাহ পর্যন্ত চীন সরকার এটা কিভাবে সামলেছে তা অনুসন্ধান করেছে।

তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, ওই সপ্তাহগুলোতে দমিয়ে রাখা হয়েছে চিকিৎসকদের। ভাইরাসটির ভয়াবহতা ও ঝুঁকি জনগণের কাছে কমিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে উহানের ১ কোটির বেশি মানুষ নিজেদের সুরক্ষা রাখার প্রস্তুতি নিতে সচেতন ছিল না।

প্রাথমিকভাবে ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিবেচিত একটি বাজার বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে শহরে বন্যপ্রাণী বেচাকেনা পুরোপুরিভাবে বন্ধ করা হয়নি। যদিও ভাইরাসটি বন্যপ্রাণীদের মাধ্যমেই মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হয়।

আংশিকভাবে, স্থানীয় কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ইচ্ছাও তথ্য গোপনে ভূমিকা রেখেছে। তারা জানুয়ারিতে তাদের বার্ষিক কংগ্রেসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও তারা সেদিকে নজর দেননি।

বরং, জনগণকে বলেছেন, নতুন কেউ আক্রান্ত হয়নি। জনগণকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে এই অবহেলার কারণে চীন সরকার ভাইরাসটির মহামারি হওয়া থেকে ঠেকাতে বড় সুযোগ হারিয়েছে। এটি এখন বৈশ্বিক জরুরি অবস্থায় পরিণত হয়েছে।

ফলস্বরূপ, দেশে দেশে চীনে ভ্রমণ নিষিদ্ধ হচ্ছে, অর্থনৈতিক বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়েছে ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়েছে।

উহানে ডিসেম্বরে করোনাভাইরাস প্রথম ধরা পড়ার পর লি ওয়েনলিং নামের এক চিকিৎসক এ বিষয়ে তার সহপাঠীদের একটি অনলাইন চ্যাটগ্রুপের মাধ্যমে জানান। এতে ২০০২ সালের প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সার্স ফেরত আসছে কিনা এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা যায় তার সহপাঠীদের মধ্যে।

ওইদিন রাতেই উহানের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা ওয়েনলিংকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তিন দিন পর তাকে ‘অবৈধ আচরণ’ করার স্বীকারোক্তি দিয়ে একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করানো হয়।

৩১শে ডিসেম্বর সে তথ্য চ্যাটগ্রুপের বাইরেও পোস্ট হয়। কর্তৃপক্ষ তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। গুজব বলে উড়িয়ে দেয়। পুলিশ জানায়, এ গুজবের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তদন্ত করছে তারা। তা সত্ত্বেও উহানের স্বাস্থ্য কমিশন ঘোষণা করতে বাধ্য হয় যে, ২৭ জন ব্যক্তি অজানা কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। রোগটি নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষরের পর ফের কাজে যোগ দেন ওয়েনলিং। ১০শে জানুয়ারি গ্লুকোমা আক্রান্ত এক নারীর চিকিৎসা করেন তিনি। ওই নারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। তার মাধ্যমে ভাইরাসটি ওয়েনলিংয়ের দেহে ছড়ায়। ৩৪ বছর বয়সী এই চিকিৎসক এক সন্তানের জনক। তার স্ত্রী বর্তমানে গর্ভবতী। কয়েক মাস বাদেই নতুন শিশু জন্ম দেয়ার কথা রয়েছে তার। ওয়েনলিং বর্তমানে এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

ডিসেম্বরের শেষের দিকে হুনান সি-ফুড হোলসেল মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আঁচ করতে পারেন কিছু একটা ঘটেছে। বাজারের কর্মীদের মধ্যে জ্বর দেখা যাচ্ছিল অনেকের। কিন্তু কেউ কারণ জানতো না। কয়েকজন হাসপাতালেও ভর্তি ছিলেন।

একই বাজার থেকে একই রোগের এত রোগি দেখে অবাক হয়েছিলেন চিকিৎসকরাও। ১লা জানুয়ারি স্থানীয় পুলিশ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বাজারটি বন্ধ ঘোষণা করেন।

স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, নিউমোনিয়া মহামারি সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য বাজারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগের দিন এই মহামারি সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানায় চীন সরকার। কর্মকর্তারা তাদের ঘোষণায় দাবি করেন, তারা ভাইরাসটিকে রুখে দিতে পেরেছে। এতে অসুস্থের সংখ্যা সীমিত ও মানুষ থেকে মানুষে এর কোনো সংক্রমণ হয়নি।

উহান স্বাস্থ্য কমিশন অনুসারে, বাজারটি বন্ধের নয়দিন পর সেখানকার এক নিয়মিত ক্রেতা করোনাভাইরাসে মারা যান। তিনিই এ ভাইরাসে প্রথম মৃত ব্যক্তি। তার মৃত্যুর দু’দিন পর এ বিষয় প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেনি সেসময়। ওই মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর মধ্যেও ভাইরাসটির উপসর্গ দেখা যাচ্ছিল। যদিও তিনি কখনোই ওই বাজারে যাননি।

এদিকে, প্রাথমিকভাবে আক্রান্তদের নমুনা নিয়ে গবেষণা চলছিল উহান ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজিতে। সেখানকার এক বিজ্ঞানী ঝেং লি শি ২০০২ সালের সার্স ভাইরাসের সঙ্গে নতুন ভাইরাসটির সাদৃশ্য খুঁজে পান। খুব সম্ভবত হুনান বাজার থেকেই এর বিস্তার ঘটে।

ওই সময়েই ড. ওয়েনলিং ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা নতুন ভাইরাসটি সম্পর্কে সতর্কতা ছড়াতে শুরু করেন। কর্তৃপক্ষ স্বীকার না করলেও ২৫শে ডিসেম্বরের মধ্যে উহানের ৫ নম্বর হাসপাতালে ভাইরাসটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। এ বিষয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বক্তব্য না দিলেও, ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্থানীয়দের সতর্ক করে দেন।

জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে উহান ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজির বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটির জেনেটিক ক্রম আলাদা করতে সক্ষম হন। ৭ই জানুয়ারিতে ভাইরাসটির নামকরণ করা হয় ২০১৯-এনকভ। এর চারদিন পর ভাইরাসটির জেনেটিক ক্রম বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

বিজ্ঞানী, চিকিৎসকরা ভাইরাসটিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে চেষ্টা চালালেও রাজনীতিবিদরা অনাগ্রহী ছিলেন। তখন ছিল রাজনীতির মৌসুম। দেশজুড়ে নেতাদের বার্ষিক সম্মেলন পিপল’স কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা কয়দিন বাদে। এ সময় মহামারি রাজনীতির জন্য দুঃসংবাদ। ভাইরাস অগ্রাহ্য করে উহানের তৎকালীন মেয়র ঝৌ শিয়ানওয়াং জানুয়ারির শুরুর দিকে শহরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত করার প্রচারণা চালাচ্ছিলেন।

৭ই জানুয়ারি পিপল’স কংগ্রেসে নিজের বার্ষিক প্রতিবেদনে তিনি জানান, শহরের সবচেয়ে উন্নত শ্রেণীর মেডিক্যাল স্কুলগুলোর অংশগ্রহণে একটি বিশ্ব স্বাস্থ্য প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। আরো জানান, মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আধুনিক শিল্প পার্ক নির্মাণ করা হবে। কিন্তু তিনি বা অন্যকোনো নেতা করোনাভাইরাসের মহামারি নিয়ে জনসম্মুখে মুখ খোলেননি।

পুরো সম্মেলনের সময় উহানের স্বাস্থ্য কমিশন প্রতিদিন জানায় যে, নতুন কেউ ভাইরাসে আক্রান্ত হননি, এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি ও কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হননি। পরবর্তীতে চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনে এক অভিযোগ দায়ের করেন উহানের এক চিকিৎসক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই চিকিৎসক লিখেন, আমরা জানতাম আদতে তেমনটা ঘটছে না। সরকারি কর্মকর্তারা চিকিৎসকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদের প্রতিবেদনে যেন ‘ভাইরাল নিউমোনিয়া’ শব্দটি না থাকে। পরে অবশ্য নির্দেশনাটি সরিয়ে নেয়া হয়।

কর্তৃপক্ষের তথ্য লুকানোর চেষ্টায় জনগণ ভাইরাসটি সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায়। ফলে নতুন আক্রান্তরা তাদের লক্ষণগুলোকে সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি হিসেবে এড়িয়ে যায় ও দ্রুত হারে বাড়ে সংক্রমণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ সময় চীনা কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা প্রদর্শন করায় তারা আরো জোর পায়। কিন্তু ১৩ই জানুয়ারি থাইল্যান্ডে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার খবর প্রকাশিত হয়।

এতে চীনের শীর্ষ নেতাদের টনক নড়ে। সার্স নিয়ে কাজ করা মহামারি বিশেষজ্ঞ ঝং নানশানকে উহানের পরিস্থিতি মূল্যায়নে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি শহরটিতে পৌঁছান ১৮ই জানুয়ারি। ২০শে জানুয়ারি প্রথমবারের মতো ভাইরাসটির ভয়াবহতা নিয়ে পুরো সত্য তুলে ধরা হয় জনগণের সামনে।

এরপরপরই মিয়ানমাররে সফর সেরে দেশে ফিরে মহামারিটি নিয়ে বিবৃতি দেন প্রেসিডেন্ট শি। তার নির্দেশ পাওয়ার পরই চীনা কর্মকর্তারা পুরোদমে ভাইরাসটি মোকাবিলায় নামেন। ততদিনে এতে প্রাণ হারান তিনজন। আর এর ১১ দিনের মাথায় সে সংখ্যা ২০০ পৌঁছায়।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026