সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ০৭:৫১

প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য ও তোষামোদকারীদের আস্ফালন

প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য ও তোষামোদকারীদের আস্ফালন

কে এম আবু তাহের চৌধুরী: বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড: এ কে মোমেন সম্প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে যে সব কটুক্তি ও অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য রেখেছেন তার প্রতিবাদ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও শ্রমজীবি মানুষ। ইতালী ফেরত বাংলাদেশীদের প্রথমে ‘নবাবজাদা‘ বলে সম্বোধন করেন।

পরে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন যে- ‘লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশে এলে চুরি চামারী বেড়ে যাবে। দেশে আইন শৃঙ্খলার অবনতি হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্র যাত্রা ব্যাহত হবে।’ তিনি আরো বলেন- ‘এত প্রবাসী দেশে আসবেনা। তারা স্মার্ট,তারা ম্যানেজ করে ফেলবে’। অর্থাৎ তিনি প্রবাসীদের দেশে যেতে নিরুৎসাহিত করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সব অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য রাখার পর প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বিভিন্ন সামাজিক মিডিয়ায় তারা এর প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। প্রবাসীদের এ প্রতিবাদের মুখে খোদ পররাষ্ট্র মন্ত্রী এক ভিডিও বার্তায় তিনি এটাকে দুষ্ট লোকের কাজ বলে উল্লেখ করেন এবং প্রবাসীদের চোর বলেননি জানান। কিন্তু তিনি তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রবাসীদের সন্তুষ্ট করতে পারেন নি।

ইতিমধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এসব লাগামহীন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ থেকে লাইভ ভিডিও করেছেন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ব্যরিষ্টার সুমন। মন্ত্রীর এক কালের সহপাঠি ও বন্ধু ড: তাজ হাশমী পররাষ্ট্র মন্ত্রী বরাবরে খোলা চিঠি লিখেছেন। যা বাংলাদেশের জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক মানব জমিনে প্রকাশিত হয়েছে। ট্রাইবুনাল জাজ ব্যারিষ্টার নজরুল খসরু একটি তথ্যবহুল নিবন্ধ লিখেছেন।

বর্তমানে লকডাউন পরিস্থিতির কারনে বৃটেনের কিছু সংখ্যক কমিউনিটি ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ ভার্চুয়াল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিবাদ সভা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তব্যের গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনেক সৈনিককে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড: এ কে মোমেনের সমালোচনা ও পরামর্শ দিতে দেখেছি।

কিন্তু অত্যন্ত দু:খ ও পরিতাপের বিষয় যে- বৃটেনে কমিউনিটি ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদ জানানোর পর এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী ও সুযোগ সন্ধানী দালাল চরিত্রের লোক তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। তারা সুশীল সমাজের এ প্রতিবাদকে স্বাধীনতা বিরোধী, দেশ বিরোধী, উন্নয়ন বিরোধী ও বিএনপি জামাত চক্রের কাজ বলে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সরকারী রাজনৈনতিক দলের এক নেতা বিভিন্ন কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও কাউন্সিলারদের। মিথ্যা কথা বলে আসল অপরাধ লুকিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পক্ষে বক্তব্য এনে মিডিয়ায় প্রচার করছে। মন্ত্রীর এক ঘনিষ্ট আত্মীয় তার অন লাইন পোর্টালে প্রতিবাদকারী কমিউনিটি নেতাদের বিরুদ্ধে ঢাহা মিথ্যা তথ্য দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পক্ষে সাফাই গেয়ে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আমরা একটি গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করি। প্রত্যেক মানুষেরই কথা বলার অধিকার রয়েছে। যে কোন অন্যায় ও অশালীন কটুক্তির প্রতিবাদ করার এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু এটা আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় যে- একজন মন্ত্রীর প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্বার্থ বিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ করা কিভাবে রাষ্ট্র বিরোধী বক্তব্য হয়?

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে যে কোন লোক সরকার ও মন্ত্রীদের কার্যকলাপের সমালোচনা করতে পারে। সরকার এ আলোচনা ও সমালোচনা থেকে সতর্ক হবে ,শিক্ষা গ্রহণ করবে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার স্বাক্ষর রাখবে।

সারা বিশ্বে এক কোটি ত্রিশ লাখ প্রবাসী রয়েছেন। তাদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের সব সময় সোচ্চার থাকা উচিত। এবারের এই করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়ে অনেক প্রবাসী নাজেহাল হয়েছেন। জরিমানা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রবাসীদের বাড়িতে লাল পতাকা টানানো হয়েছে। বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। রেস্টুরেন্টে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে। বিনা চিকিৎসায় অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন।অনেক প্রবাসী এখনো বাংলাদেশে আটকা পড়ে আছেন। কিন্তু প্রবাসীদের এ দুর্যোগে আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রী বা প্রবাস বিষয়ক মন্ত্রীরে কোন বক্তব্য রাখতে দেখিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও প্রবাসী মন্ত্রী উভয়েই সিলেটের কৃতি সন্তান। তাদের সকল ভাল কাজের প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে। কোন প্রবাসীই দেশের উন্নয়ন ও স্বাধীনতা বিরোধী নয়। দেশের মাটি ও মানুষের জন্য প্রবাসীদের মন বেশী কাঁদে। দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি দুর্যোগময় মুহুর্তে প্রবাসী বাংলাদেশীদের অবদান ইতিহাসের অন্তর্গত। এবারের প্যানডেমিকে প্রবাসীরা কোটি কোটি টাকার সাহায্য সামগ্রী বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

প্রবাসীরা মন্ত্রীদের যে কোন কাজের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষন ও সমালোচনা করার অধিকার রাখেন। ড: এ কে মোমেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি থাকাকালে তিনি বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানের ব্যাপারে উল্টা পাল্টা বক্তব্য রেখেছিলেন। আমরা তার প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দাবীর প্রতি পূর্ন সমর্থন জানিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সরকারের সকল উন্নয়নমূলক ও ভাল কাজের প্রতি প্রবাসীদের সমর্থন ও সহযোগিতা রয়েছে। আমরা কেউই দেশ বিরোধী নই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের আমরা অতন্দ্র প্রহরী। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রবাসীদের খুশী করে সুন্দর একটা বক্তব্য দিলেই সব ভুল বুঝাবুঝি দূর হয়ে যায়। আগামীতে লাগামহীন কোন কথা না বলে প্রবাসীদের স্বার্থে কথা বলবেন বলে আমরা আশা করি। সবাইকে এটা মনে রাখতে হবে যে- কারো ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতার বাহাদুরী একদিন শেষ হয়ে যাবে। যারা প্রবাসী নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে মন্ত্রীর দালালী করে স্বার্থ হাসিলের ধান্ধায় আছেন তারা একদিন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। আর যারা প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্বার্থে কথা বলছেন তারা ১ কোটি ৩০ লাখ প্রবাসীর ভালবাসা নিয়ে ইতিহাসে অম্লান হয়ে বেঁচে থাকবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, বিশিষ্ট কমিউনিটি সংগঠক, বিলেতে পরিচিত মুখ।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026