মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:১০

নানা অভিযোগ শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

নানা অভিযোগ শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

শীর্ষবিন্দু নিউজ, ঢাকা / ৯৫
প্রকাশ কাল: সোমবার, ১৬ আগস্ট, ২০২১

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ছে। শতাধিক পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা, অপহরণ, ছিনতাই, নির্যাতন, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া, যৌন হয়রানিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারে জমা পড়েছে। তবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার শুধু কনস্টেবল থেকে ওসি পর্যন্ত ব্যবস্থা নিতে পারে।

এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করতে পারে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ গেলে দ্রুতই পার পেয়ে যান পুলিশ কর্মকর্তারা। মন্ত্রণালয়ে একটি সিন্ডিকেট আছে, তদবির ও টাকার বিনিময়ে কিংবা যে কোনোভাবেই হোক অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা মন্ত্রণালয় থেকে পার পেয়ে যান। এ কারণে পুলিশের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগের কারণে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছিল পুলিশ হেডকোয়ার্টার। কিন্তু কারোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তারা।

অপরাধবিজ্ঞানীরাও যে কোনো পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পুলিশ সদর দপ্তরকে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এতে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। অপরাধ করতে ভয় পাবেন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশকে ঢেলে সাজাতে হলে কমপক্ষে অতিরিক্ত ডিআইজি (চতুর্থ গ্রেড) পর্যন্ত কর্মকর্তারা অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আইজিপির হাতে থাকতে হবে।

তবে মন্ত্রণালয় তার ওপরে আপিল করার সুযোগ পাবেন আইজিপির মাধ্যমে শাস্তিপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। এটি করার জন্য একটি প্রস্তাবও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু ছয় মাসেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। আইজিপিকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়নি। পাকিস্তান আমলের সেই প্রাদেশিক কাঠামোতেই চলছে পুলিশ বাহিনী। পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক আইজিপির যে সক্ষমতা ছিল, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আইজিপি সিনিয়র পদমর্যাদা পেলেও একই সক্ষমতা রয়েছে তার। কোনো পরিবর্তন হয়নি। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় কোনো কর্মকর্তা যোগদান করলে তাকে একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তা ফুল দিয়ে বরণ করতে যান। অথচ কর্মকর্তার পদমর্যাদা আইজিপির চেয়ে অনেক নিচের

সম্প্রতি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার (এসপি) মোক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এই পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে আগেই তিন নারী পুলিশ সদস্যের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়ে যান

সিলেটে বিদেশফেরত একজনকে তুলে নিয়ে গেলে তিনি পুলিশ হেফাজতে মারা যান। অভিযুক্ত এসআইকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন পুলিশের একজন ডিসি। সম্প্রতি একজন এসপিকে একটি অনুষ্ঠানে থাকার জন্য ডেকেছিলেন ডিআইজি। কিন্তু এসপি ব্যস্ত থাকার অজুহাত দেখিয়ে অনুষ্ঠানে যাননি। আর যাবেনই কেন, এসপি জানেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ডিআইজির নেই। মন্ত্রণালয়ে অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি হয়, তদন্ত হয়; কিন্তু অধিকাংশ তদন্ত প্রতিবেদনই থেকে যায় আড়ালে। তবে কনস্টেবল থেকে ওসি পর্যন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে পুলিশ হেডকোয়ার্টার। এক্ষেত্রে প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধের নানা অভিযোগ আসে

এর মধ্যে দুই থেকে আড়াই হাজার পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করে পুলিশ হেডকোয়ার্টার। আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়ে পুলিশের সাবেক বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, আইজিপিকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা শুধু নামমাত্র দেওয়া হয়েছে। একজন সিনিয়র সচিব ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে পারেন, কিন্তু আইজিপি দিতে পারেন মাত্র কোটি টাকা। পুলিশের সাবেক একজন আইজিপি বলেন, হাতেনাতে ঘুষসহ একজন এসপিকে ধরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি পেয়ে যান। মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এসব অফিসার কেন আইজিপিকে মানবেন?

সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, পুলিশে যে নিয়মকানুন আছে, তা সঠিকভাবে মেনে চলা হলে অপরাধ অনেক কমে যাবে। পুলিশে নিয়োগ যাতে যথাযথভাবে হয়, সেটাকে শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। অবাঞ্ছিত কেউ এলে বের করে দিতে হবে। তিনি বলেন, পুলিশে কিছু দুষ্ট লোক আছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে ওপরের অফিসাররা যদি সঠিকভাবে মনিটর করেন, তাহলে পুলিশের অপরাধও কমে যাবে। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পুলিশকে ঢেলে সাজানোর মাধ্যমে সংস্কার করার পরামর্শ দেন তিনি

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, পাকিস্তান আমলের প্রাদেশিক কাঠামোর মতোই এখনো চলছে আইজিপির সক্ষমতা। বর্তমানে আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর এবং শৃঙ্খলার স্বার্থে আইজিপির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে কথা বললে হবে না। এটি করতে হলে রাজনৈতিক সরকারের সমর্থন লাগবে। অন্তত চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত, অর্থাত্ অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যন্ত কর্মকর্তারা যদি কোনো অপরাধ করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আইজিপির থাকতে হবে। বিষয়টি নিয়ে তিনি একমত পোষণ করেন। তাহলে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করবেন যে, অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না। পুলিশকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন তিনি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছরের বেশি হয়েছে, কিন্তু আমরা এখনো কলোনি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই পুলিশকে অবশ্যই ঢেলে সাজাতে হবে। আইজিপির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না হলে পুলিশে শৃঙ্খলা থাকবে না

এখনো শুধু কনস্টেবল থেকে ওসি পর্যন্ত পুলিশ সদস্যরা অপরাধ করলে ব্যবস্থা নিতে পারেন আইজিপি। আর ওসিরা রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার পুলিশে সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করেছে। তবে সুযোগসুবিধা আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আইজিপির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হলে দুর্বল চার্জশিটের কথা কম শোনা যাবে




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2021