সিলেট বিএনপিতে বিরোধ দীর্ঘদিনের। এক সময় সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রায়ত এম. সাইফুর রহমান ও নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলীর মধ্যে বিরোধ ছিলে তুঙ্গে। তাদের একজনের প্রয়াণ ও আরেকজনের অন্তর্ধানেও থামেনি সে বিরোধ। তাদের অনুপস্থিতিতে বরং এখন বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে দলটি। রাজনীতির মাঠে সক্রিয় না থাকলেও বিভিন্ন নেতার অনুসারীরা মিলে গড়ে তুলেছেন অনেকগুলো গ্রুপ-উপ গ্রুপ। তবে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের অনুসারী ও তার বিরোধী অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান বলয়ের মধ্যেই এখন বিরোধ সবচেয়ে তুঙ্গে। অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান ও মুক্তাদির বিরোধী বলয়ের হিসেবে পরিচিত।
সম্প্রতি বিএনপির কয়েকটি অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের সিলেট জেলা ও মহানগর কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি নিয়ে বিএনপির বিরোধ আবার প্রকাশ্য রূপ নেয়। গত বছর ঘোষিত হয় সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি। এই কমিটিগুলোতে নিজেদের পছন্দের লোক ঠাঁই না পাওয়ায় পদত্যাগের ঘ্ষোণা দেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হকসহ সিলেটের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। পরে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে তারা এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জামানের পদত্যাগের পর সিলেটের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মি বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদ ত্যাগ করেছেন। সিলেট ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বিএনপি নেতাদের পদত্যাগের খবর এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বিএনপির হাইকমান্ড কি ব্যবস্থা নেন তা দেখার অপেক্ষায় আছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে এখন অ্যাডভোকেট জামানকে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাচ্ছেন।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ও সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর আব্দুর রকিব তুহিন বলেন, শামসুজ্জামান জামান বিএনপির তৃণমূলের প্রাণ। রাজপথের লড়াকু সৈনিক। ১৯৯১ সালে দল ক্ষমতায় আসলেও তাঁকে (জামান) জেলে যেতে হয়। মনে হয় যেন তিনি বিরোধীদলের রাজনীতি করতেন। তাঁর (জামান) পদত্যাগের ভাইরাল হওয়া ভিডিও নিয়ে তিনি বলেন, ৯৯ ভাগ মানুষ তাঁকে বাহবা দিচ্ছে। স্যালুট জানাচ্ছে। এ থেকে বুঝা যায় তাঁর মত নেতার বড়ই প্রয়োজন সিলেটে।
সিলেট জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ইশতিয়াক সিদ্দিকী বলেন, সিলেটে স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতির যাত্রা হয়েছিল শামসুজ্জামান জামানের হাত ধরে। তাকে অবজ্ঞা করে সিলেটের কমিটি দেয়া উচিত হয়নি। তার পদত্যাগ সিলেটে বিএনপির রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাজপথে এডভোকেট জামান নামলে তরুণ নেতাকর্মীরা অনেক সাহস পেত। পদত্যাগের জন্য দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী কান্নাকাটি করছে। তিনি আরো বলেন, জামান বিএনপির এক ইতিহাস। কর্মীবান্ধব নেতা। যিনি দলকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন, তিনি আজ দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। আমরা তাকে আবার ফিরে পেতে চাই।
সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের আহবায়ক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, শামসুজ্জামান জামান সিলেটের রাজপথে বিএনপির বড় শক্তি ছিল। জীবনবাজি রেখে সে দলের জন্য কাজ করেছে। সিলেটে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি দেয়ার নামে তাকে ও দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অপমান করা হয়েছে। কিছু চাটুকার মিলে দলকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এদের কারণে জামান যে পথ বেছে নিয়েছে বাধ্য হয়ে সে পথ হয়তো আমিসহ আরো অনেককে অনুসরণ করতে হবে।
সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের শামীম বলেন, অনেক সময় হয়তো ত্যাগীরা মূল্যায়িত হন না। কিন্তু দলের প্রতি কমিটমেন্ট থাকলে আজ হোক আর কাল হোক কাজের মূল্যায়ণ হবেই। আন্দোলন সংগ্রামে জামানের অনেক অবদান আছে, কিন্তু দলের বিরুদ্ধে সে যেভাবে বিতর্কিত কথা বলেছে সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। অভিমান করে তার দলত্যাগ উচিত হয়নি। এর আগে দেশের অনেক বড় বড় নেতা বিএনপি ছেড়ে গেছেন, কিন্তু দলের কোন ক্ষতি হয়নি। জামানের অনুপস্থিতি দলে নেতিবাচক কোন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি না।
তবে সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদার বলেন, জামানের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত। তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা। তার পদত্যাগে সিলেট বিএনপিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। তিনি আরও বলেন, পদত্যাগের আগে জামান কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে আলোচনা করতে পারেন। এভাবে পদত্যাগ করা তার উচিত হয়নি বলে আমি মনে করি।
সিলেট বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা শেখ মো. মকন মিয়া চেয়ারম্যান বলেন, জামানকে তাঁর ছাত্র রাজনীতি থেকে দেখে আসছি। তাকে দল ক্ষমতায় থাকার সময়ও জেলে যেতে হয়েছে। আসলে তিনি একজন স্টেট ফরোওয়ার্ড লোক। আমার জানা মতে, সে রাজনীতিতে টাকা-পয়সার জন্য আসেনি। সে দল ও দেশের জন্য যখন প্রয়োজনে জীবন বাজী রেখে কাজ করে গেছে। আমি আশা করি বিএনপির জামান বিএনপিতেই থাকবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, জামান তার ক্ষোভ থেকে পদত্যাগ করেছে। কতিপয় নেতা বারবার কেন্দ্রকে ভুল তথ্য দিয়ে দলের ক্ষতি করছেন। যখন ত্যাগী নেতাকর্মীরা দলে অবমূল্যায়িত হয় তখন খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক।
সিলেট মহানগর বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক রেজাউল করিম নাচন বলেন, আমার মতো হাজার হাজার নেতাকর্মী সৃষ্টির কারিগর জামান ভাই এর সিলেটে বুক ফুলিয়ে চলতে হলে দলের খুব একটা প্রয়োজন হয় না, জামান নামটাই যথেষ্ট। বরং দল চিপায় পড়লে জামান ভাই এর মতো নেতাদের প্রয়োজন হয়। তিনি আরও বলেন দলের স্বার্থেই, অ্যাডভোকেট জামানকে দল ফিরিয়ে আনবে এবং তাকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাবে সিলেট বিএনপি পরিবার।
Leave a Reply