মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৪৪

উৎপাদন নিম্নমুখী হওয়ায় ইলিশের আকাল

উৎপাদন নিম্নমুখী হওয়ায় ইলিশের আকাল

শীর্ষবিন্দু নিউজ, ঢাকা / ১০৬
প্রকাশ কাল: বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২১

মৎস্যকুলরাজ ইলিশ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশার চিত্র উঠে এসেছে এক গবেষণায়। ইলিশ আহরণ করে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় তিন লাখ জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। রপ্তানির মাধ্যমে আসে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। এই ভরা মৌসুমেও ইলিশের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণাঞ্চলের নদনদীতে ইলিশের আকাল চলছে। যা পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোরও গড় আকৃতি বা ওজন কম।

গবেষকদের মতে, ইলিশ আহরণ পরিকল্পিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে না পারলে দেশে এ সম্পদ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই ইলিশসহ মৎস্য খাতে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়ে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ২০১৯ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে ‘স্টক অ্যাসেসমেন্ট অব কমার্শিয়ালি ইমপরটেন্ট ফিশেস ইন দ্য বে অব বেঙ্গল’ শীর্ষক গবেষণা। গবেষণা দলের প্রধান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ইয়ামিন হোসেন। তার সঙ্গে ২২ জন রিসার্চ ফেলো যুক্ত রয়েছেন। মাঠপর্যায়ে প্রতিদিন আটজন ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের তথ্য নিচ্ছেন। ড. ইয়ামিন বলেন, চলতি এবং আগামী বছর দক্ষিণাঞ্চলে ইলিশের উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর কারণ, ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো নষ্ট করা হচ্ছে। প্রজননের ‘পিকটাইম’ নির্ধারণে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে।

পাথরঘাটা সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া গত চার বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে গবেষক দলের অন্যতম সদস্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাথরঘাটায় ইলিশ এসেছে চার হাজার ৯০০ টন। পরের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭০০ টন কমে এসেছে চার হাজার ২০০ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসেছে দুই হাজার ৭০০ টন। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশ আমদানি নেমে এসেছে মাত্র দেড় হাজার টনে। বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, মাঠপর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে দেখা গেছে, ইলিশের গড় আকৃতি এখন ৫৫০ থেকে ৬৫০ গ্রাম। ব্যাপকভাবে ছোট ইলিশ ধরার কারণেই গড় ওজন কমছে। গত বছর ৮০ ভাগ ছোট ইলিশে ডিম পাওয়া গেছে। ছোট ইলিশের ডিমে ৫০ হাজার থেকে এক লাখের বেশি বাচ্চা থাকে না। অথচ বড় ইলিশে ডিম থাকে ১৬ থেকে ১৮ লাখ। গড় ওজন কমে যাওয়াও ইলিশ সংকটের একটি বড় কারণ।

তবে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট চাঁদপুর নদীকেন্দ্রের প্রধান ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেছেন, ইলিশের আকৃতি কমে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। বড় ইলিশ আছে এবং ধরাও পড়ছে প্রচুর। ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমানও বলেন, ইলিশের জন্য মোহনা এখন আর নিরাপদ নয়। নাব্য সংকট, নিষিদ্ধ জালের অধিক ব্যবহার এবং অতি আহরণ প্রবণতা ইলিশের ক্ষতি করছে।বিষয়টি স্বীকার করে ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমানও বলেন, ইলিশের জন্য মোহনা এখন আর নিরাপদ নয়। নাব্য সংকট, নিষিদ্ধ জালের অধিক ব্যবহার এবং অতি আহরণ প্রবণতা ইলিশের ক্ষতি করছে।

নিরাপদ করতে হবে মোহনা :গবেষক বিপ্লব কুমার সরকারের মতে, পানির তলদেশে যে স্থানটি উর্বর, সেটি প্রাণ-প্রকৃতির আধার। মোহনাগুলোতে খাবার থাকে বেশি, পানি থাকে মিশ্রিত। এরকম পরিবেশ ইলিশসহ সব ধরনের মাছের অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু মোহনা এখন আর মাছের জন্য নিরাপদ নয়। মোহনায় জালের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। এতে সব মাছের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হয়। ১০ হাত পরপর জেলেরা মোহনায় জাল পাতেন। লোভী জেলেরা প্রচুর নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেন। এ কারণে মাছ মোহনায় আসতে ভয় পায়। তিনি বলেন, শুধু ইলিশ নয়, লবণাক্ততার কারণে কোনো মাছই গভীর সমুদ্রে ডিম পাড়ে না। মোহনায় এসে ডিম পাড়ে। তাই মাছের জন্য মোহনা কীভাবে নিরাপদ করা যায়, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে।

সঠিক প্রজনন মৌসুম :মাৎস্যবিজ্ঞানী ড. ইয়ামিন হোসেন মনে করেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুম নির্ধারণে নতুন করে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, ইলিশ সারাবছরই ডিম পাড়ে। তবে বছরের দুই মৌসুম ডিম পাড়ার উৎসব। ফেব্রুয়ারি-মার্চ এবং অক্টোবরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পরবর্তী ২২ দিন। বছরে ডিম ছাড়ার দুটি ভরা মৌসুম হলেও নিষেধাজ্ঞা থাকে এক মৌসুমে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সে সময়টিও তিথি বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে। ফলে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞার আগেও ইলিশ ডিম ছাড়তে এসে ধরা পড়ছে। উদাহরণ টেনে ড. ইয়ামিন বলেন, গত বছর ইলিশের সর্বোচ্চ প্রজনন ঘটেছে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে। এতে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা তেমন কার্যকর হয়নি।

এই মৎস্য গবেষক আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি অক্টোবরের আগেই বৃষ্টি হয় বা সাগর উত্তাল থাকে, তাহলে ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে উঠে আসবে। তাই প্রজনন মৌসুম নির্ধারণে আবহাওয়াবিদদের সংশ্নিষ্ট করা একান্ত প্রয়োজন। যদি আগে-পরে ঝড়বৃষ্টি হয়, তা নিশ্চিত হয়েই প্রজনন মৌসুম নির্ধারণ করে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। উজানে নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়াতে হবে। ভাটিতে ২২ দিন হলেও চলবে।

একই মত পোষণ করেছেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট চাঁদপুর নদীকেন্দ্রের প্রধান ড. আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, প্রজননের জন্য দুটি সময়ে নিষেধাজ্ঞা দিলে ভালো হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রজননের ‘পিকসিজনের’ হেরফের হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তবে এখনই পরিবর্তন করতে হবে- এমন পরিস্থিতি আসেনি। নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি একটি কৌশল। জেলেদের ইলিশ ধরারও সুযোগ দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, নদনদীতে ইলিশ উৎপাদন কম হলেও সামগ্রিকভাবে কম হচ্ছে, তা বলা যাবে না।

ইলিশ স্থান পরিবর্তনকারী মাছ। গভীর সমুদ্রে থাকলেও ডিম ছাড়ার জন্য ইলিশকে নদীতে আসতেই হবে। নদীর পানি যখন ঘোলা থাকে, স্রোত ও খাবারের পরিমাণ বাড়ে, তখন ইলিশ বুঝতে পারে তার উজানে যাওয়ার সময় হয়েছে। প্রচুর বৃষ্টি হলে নদীতে এরকম পরিবেশ হয়। এ বছর বৃষ্টি থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। এ কারণেই ইলিশ ঝাঁক বেঁধে নদীতে ফিরছে না বলে জানিয়েছেন বিপ্লব সরকার।

গবেষক বিপ্লব সরকারের মতে, সাগর এবং নদীর মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বাঁধা জাল, খুঁটি জাল, বেহুন্দি জাল, কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মোহনায় এত বেশি মাছ ধরা হচ্ছে যে, ৫০০ টাকার চিংড়ি ধরতে জেলেরা হাজার হাজার টাকার রেণু পোনা ধ্বংস করছে। এক ঝুড়ি সামুদ্রিক বৈরাগী মাছ ধরতে শত শত কেজি ইলিশের বাচ্চা নষ্ট করছে জেলেরা।

প্রসঙ্গত, বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাইয়ে বিভাগের ছয় জেলায় ইলিশ আহরিত হয়েছে ১৮ হাজার ৬৫ টন। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে ছয় জেলায় ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ মাত্র ১১ হাজার ২২২ টন। এক বছরের ব্যবধানে এক মাসেই ইলিশ উৎপাদন কম হয়েছে ছয় হাজার ৮৪৩ টন।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2021