রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২, ০১:২৩

মানি লন্ডারিং অনিয়ম দুর্নীতির দায় নিয়ে ১৬ আগস্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সোনালী ব্যাংক ইউকে

মানি লন্ডারিং অনিয়ম দুর্নীতির দায় নিয়ে ১৬ আগস্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সোনালী ব্যাংক ইউকে

নিউজ ডেস্ক, লন্ডন / ৮৬০
প্রকাশ কাল: সোমবার, ২৩ মে, ২০২২

একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেড। বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের জোগান দেয়া মূলধনে গঠিত হয় সোনালী ব্যাংক ইউকে।

২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বপ্নের সেই ব্যাংকটি এখন ধ্বংসস্তূপ। অর্থ পাচার প্রতিরোধে ব্যর্থতা ও অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিধ্বস্ত ব্যাংকটিকে বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। আগামী ১৬ আগস্ট বন্ধ হয়ে যাবে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের স্বপ্নের এই ব্যাংকটি।

দফায় দেশ থেকে মূলধন জোগান দেয়ায় এখন সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডের মূলধনের পরিমাণ ৬ কোটি ৩৮ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ৬৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মালিকানা রয়েছে ৫১ শতাংশ। বাকি ৪৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক সোনালী ব্যাংক লিমিটেড।

অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৬ কোটি ডলার ঋণও দেয়া হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সব বিনিয়োগই মুখ থুবড়ে পড়েছে যুক্তরাজ্যের মাটিতে।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রুডেন্সিয়াল রেগুলেশন অথরিটি (পিআরএ) এবং ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটির (এফসিএ) সিদ্ধান্তে বন্ধ হচ্ছে সোনালী ব্যাংক ইউকে। গত ২৭ জানুয়ারি বিষয়টি সোনালী ব্যাংক ইউকেকে জানিয়েও দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ব্যাংকটিকে বাঁচাতে তৎপর হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

এজন্য সোনালী ব্যাংক ইউকের পরিবর্তে যুক্তরাজ্যে দুটি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। মোট চারটি প্রস্তাব দিয়ে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠাচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

প্রস্তাবে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য ‘সোনালী পে ইউকে লিমিটেড’ এবং বাংলাদেশী ব্যাংকগুলোর ঋণপত্রের নিশ্চয়তা দেয়ার জন্য ‘সোনালী বাংলাদেশ (ইউকে) লিমিটেড’ নামে কোম্পানি তৈরির পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সোনালী পে ইউকের লাইসেন্সের জন্য বাংলাদেশ থেকে আরো ১০ লাখ পাউন্ড মূলধন জোগান দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতকৃত অর্থ মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে বলা হয়, ২০১৬ সালে নন-কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সোনালী ব্যাংক ইউকের পাশাপাশি ব্যাংকটির তৎকালীন সিইও মো. আতাউর রহমান প্রধানকে (বর্তমানে তিনি সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন) তার দায়িত্বে অবহেলা, সুপারভাইজরি ঘাটতি ও অন্যান্য কারণে ৭৬ হাজার ৪০০ পাউন্ড জরিমানা করে।

২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর আতাউর রহমান প্রধানের বিরুদ্ধে আরোপিত শাস্তির সিদ্ধান্ত এফসিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ২০১৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকেই সোনালী ব্যাংক ইউকের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পর থেকে ব্যাংকটি কেবল ট্রেড ফাইন্যান্স ও রেমিট্যান্স হাউজ হিসেবে সচল রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অর্থ পাচার প্রতিরোধে ব্যর্থতা ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল কন্ডাক্ট অথরিটি (এফসিএ) সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেড বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি আতাউর রহমান প্রধানকে জরিমানা করা হলেও বাংলাদেশে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০১৬ সালে আতাউর রহমান প্রধানকে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ দেয় সরকার।

এরপর ২০১৯ সালে তাকে সোনালী ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে আতাউর রহমান প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ ব্যাংকটির এমডির দায়িত্বে রয়েছেন। যুক্তরাজ্যের সোনালী ব্যাংককে যারা এতটা খারাপ অবস্থায় নিয়ে গিয়েছেন সবার আগে তাদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।

তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংক ইউকে এতটাই দুরবস্থায় গেছে যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ হলো। আগেও একবার এটিকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যারা দায়ী, যারা অব্যবস্থাপনা করেছেন বা চুরি ঠেকাতে পারেননি কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রথমে তাদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

ফরাসউদ্দিন বলেন, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেশেই বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। সেক্ষেত্রে বিদেশে নতুন করে দুটি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। যুক্তরাজ্যের যেসব নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যাংকটিকে বন্ধ করে দিল সেসব প্রতিষ্ঠানই অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নিয়ন্ত্রণ করবে। সেজন্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিষয়গুলো ভাবতে হবে।

সোনালী ব্যাংক ইউকের দুর্দশার বিষয়ে জানতে চাইলে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, আমার বিরুদ্ধে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের যে পর্যবেক্ষণগুলো ছিল সেগুলো ২০১৬ সালের। এতদিন পর সেসব বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। সোনালী ব্যাংক ইউকের বিষয়ে বর্তমানে তিনি কিছুই জানেন না বলে মন্তব্য করেছেন।

সোনালী ব্যাংক ইউকের মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান স্টিভেন স্মিথকে এ ধরনের চাকরিতে নিষিদ্ধ ও ১৮ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়। সোনালী ব্যাংক ইউকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সচিব মো. আসাদুল ইসলাম। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে ব্যাংকটির বিষয়ে তিনটি প্রস্তাব পাঠান।

প্রস্তাবগুলোর একটি হচ্ছে পিআরএর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়ের করা। তবে এ বিষয়ে বলা হয়, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। এছাড়া আপিলে সোনালী ব্যাংক ইউকে মামলায় জয়ী হলেও রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকবে। তাই ভবিষ্যতে এর সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা মোটেও সহজ হবে না। ট্রাইব্যুনালে আপিল ব্যর্থ হলে সোনালী ব্যাংক ইউকে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের আর্থিক বাজারে কাজ করার জন্য কখনই অনুমতি পাবে না।

কন্টিনজেন্সি প্ল্যান বাস্তবায়ন নামে দ্বিতীয় বিকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়। এক্ষেত্রে বলা হয়, সোনালী ব্যাংক ইউকে পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত কন্টিনজেন্সি প্ল্যান অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে ট্রেড ফাইন্যান্স ও রেমিট্যান্স ব্যবসা পরিচালনার জন্য সোনালী (ইউকে) লিমিটেড নামে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্যারেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে পৃথক দুটি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে।

বর্তমান শেয়ারহোল্ডাররা অর্থাৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও সোনালী ব্যাংক ওই কোম্পানির শেয়ার ধারণ করবে। প্রস্তাবিত অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুটি প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে পরবর্তী দুই-তিন বছর যথাযথ ব্যবসা পরিচালনা ও যাবতীয় রেগুলেটরি ইস্যুর প্রতিকার করবে এবং একটি শক্তিশালী অপারেটিং মডেল স্থাপন করে পরবর্তী সময়ে সোনালী ইউকে লিমিটেড ব্যাংকিং লাইসেন্সের জন্য পুনরায় পিআরএ এবং এফসিএর কাছে আবেদন করবে।

এটি বাস্তবায়ন করতে হলে সোনালী ব্যাংক (ইউকে)-এর নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে সোনালী বাংলাদেশ ইউকে লিমিটেড নামীয় একটি নতুন অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করতে হবে, যা ট্রেডিংয়ের ওপর মনোযোগ দেবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় লোকবল, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া, প্লাটফর্ম সম্পদ-দায় ইত্যাদি বর্তমান কোম্পানির কাছ থেকে স্থানান্তর পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

ব্যবসার পরিসমাপ্তিকে তৃতীয় বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে উল্লেখ করেন আসাদুল ইসলাম। প্রস্তাবে তিনি বলেন, এজন্য সোনালী ব্যাংক ইউকে বন্ধ করে দিয়ে যুক্তরাজ্যে চলমান সব ব্যবসার পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে। তবে এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের বাজারে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের প্রবেশকে আরো কঠিন করে তুলবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো যুক্তরাজ্যে তাদের নিজস্ব একটি করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক হারাবে।

এসব সম্ভাব্য প্রস্তাবের পর গত ৮ মার্চ আইনি কারণে সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডের বর্তমান ব্যাংক সত্তা বিলুপ্ত করে ট্রেড ফাইন্যান্স ও রেমিট্যান্স সেবার জন্য পৃথক দুটি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গঠনের বিষয়ে অনুরোধ জানায় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান। এর আলোকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রস্তুতকৃত সারসংক্ষেপে চারটি বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ বলেন, এখনই এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর জন্য একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়েছে। তবে সেটি এখনো পাঠানো হয়নি।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২ জুন সোনালী ব্যাংক ইউকের ওল্ডহ্যাম শাখা থেকে সুইফট কোড জালিয়াতির মাধ্যমে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার হাতিয়ে নেয়া হয়। ওই শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক ইকবাল আহমেদ ব্যাংকের ভল্ট থেকে অর্থ চুরি, গ্রাহকের হিসাব থেকে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলন ও গ্রাহকের অর্থ হাতিয়ে নেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর শাখাটি বন্ধ করে দেয় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড।

২০১৭ সাল থেকে চালু আছে শুধু লন্ডন ও বার্মিংহাম শাখা। ২০১০ সালের ২০ আগস্ট থেকে ২০১৪ সালের ২১ জুলাই সময়ে অর্থ পাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডকে ৩২ লাখ পাউন্ড জরিমানা করে দেশটির আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফসিএ। বন্ধ করে দেয় নতুন হিসাব খোলা।

কৃতজ্ঞতা: বনিক বার্তা




Leave a Reply

Your email address will not be published.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
All rights reserved © shirshobindu.com 2022