শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:২১

দেশে ডলার সংকট বাড়ছেই

দেশে ডলার সংকট বাড়ছেই

শীর্ষবিন্দু নিউজ, ঢাকা / ১১৩
প্রকাশ কাল: বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০২২

বর্তমানে ডলার সংকটে পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন অর্থাৎ ৭৬২ কোটি ডলার সাপোর্ট দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) দেশের খুচরাবাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১১৫-১১৬ টাকা দরে। ইউরো বিক্রি হচ্ছে ১১৪-১১৫ টাকা এবং পাউন্ড ১৩০-১৩৫ টাকা দরে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ১০৮ টাকার ওপরে নগদ ডলার বিক্রি হচ্ছে। যা বুধবার (১০ আগস্ট) খোলাবাজারে ১১৮ টাকার ওপরে উঠেছিল। এরপরই অভিযান পরিচালনা জোরদার করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ডলারের দাম দুই থেকে তিন টাকা কমেছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা এক হাজার ১৩৬ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ডলারের সংকটও আরও বাড়িয়ে তুলছে কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর যোগসাজশে পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলছেন তারা। কারসাজিতে জড়িত থাকার দায়ে ছয়টি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠিও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুযোগসন্ধানী ব্যাংকার ও দালালচক্রের কারণে ৯৫ টাকার ডলার ১১৮ টাকায় কিনতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।

ডলার, ইউরো ও পাউন্ড কেনাবেচায় শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে একাধিক চক্র। এ চক্রটি রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন, গুলশান এলাকায় এক্সচেঞ্জ হাউজের সামনে অবস্থান নিয়েই অবৈধভাবে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেলেই সটকে পড়ছেন তারা। কিছুক্ষণ পরই আবার ফিরে আসছেন একই স্থানে। এভাবে দিনভর চলছে রমরমা ব্যবসা, যাতে পকেট কাটা যাচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।

তবে এক্সচেঞ্জ হাউজের মালিকরা বলছেন, সরাসরি এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কিনলে ক্রেতারা ঠকবেন না। একইসঙ্গে দালালচক্র থেকেও সাবধান হতে বলছেন তারা।

এদিকে, ডলার নিয়ে কারসাজিতে গড়ে ওঠা চক্রকে ধরতে তৎপর রয়েছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। তবে দালালদের দৌরাত্ম্য থামছেই না। ক্রেতারা এক্সচেঞ্জ হাউজে যাওয়ার আগেই দালালচক্র তাদেরকে ফাঁদে ফেলছেন। বিভিন্ন প্রলোভনে তাদের কাছে ডলার বিক্রি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, দালালচক্রের সদস্যদের সঙ্গে এক্সচেঞ্জ হাউজের মালিক ও কর্মচারীদের যোগাযোগ রয়েছে।

মতিঝিল সানমুন টাওয়ারের পেছনে দিক, অগ্রণী ব্যাংকের পেছনের পাশে কয়েকটি স্থানে সুমন, শরিফসহ একাধিক ব্যক্তি ডলার বিক্রির চক্র গড়ে তুলেছেন। চক্রটি মূলত ক্রেতা দেখলেই ‘দাদা কী লাগবে’ সম্বোধন করেন। ক্রেতা যদি বলেন ডলার লাগবে। তাহলে তারা দরদাম শুরু করেন। দ্রুতই সেখানে তাদের অনুসারীরা ডলার, ইউরো বা পাউন্ড হাজির হন। সেখানে কোনো কাগজপত্র বা ডকুমেন্টের প্রয়োজন পড়ে না।

পল্টনে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটের উল্টো পাশে রয়েছে সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেট। বাজারে ডলার সংকট হলেও তাদের কাছে কোনো সংকট নেই। নগদ টাকা পেলেই হাজির করা হয় বৈদেশিক মুদ্রা। কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ডলারের ব্যবসা করে আসছেন তারা। এ চক্রের আবার কমিশন এজেন্ট রয়েছে। কোনো দালাল ক্রেতা যোগাড় করে দিলে তাদেরকে ৫০ পয়সা থেকে এক টাকা পর্যন্ত বকশিশ দেওয়া হয়।

পরিচয় গোপন করে ডলার ক্রেতা সেজে এ প্রতিবেদক মোজাম্মেল নামে এক খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মোজাম্মেল বলেন, ‘আপনার কী লাগবে?’ ১০০ ডলার ও ১০০ ইউরো কিনতে চাইলে তিনি বলেন, ডলার ১১৫ টাকা লাগবে। প্রতি ইউরোতে লাগবে ১১৪ টাকা।

অথচ বাজারে ডলার ৯৫ টাকা ও ইউরো ৯৭ টাকা ৮২ পয়সা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে মোজাম্মেলের দাবি, ‘মার্কেট বাড়ি খাইছে। না হলেও আপনার আরও দুই-তিন টাকা বেশি লাগতো। আগামীকাল আবার বাড়তে পারে..।’

পরিচয় লুকিয়ে চক্রের আরেক সদস্য কাউসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি পাউন্ডের দাম চান ১৩৫ টাকা। বলেন, একদিন আগে ১৪০ টাকা ঠেকেছিল পাউন্ড। আজকে নেন, কালকে আবার বাড়তে পারে। অথচ বৃহস্পতিবার (১১ আগস্ট) বাজারে ১১৬ টাকা ১৩ পয়সা দরে পাউন্ড বিক্রি হচ্ছে।

ডলার কিনতে এসেছেন মাসুম বিল্লাহ। তিনি ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউজ এড়িয়ে দালালচক্রের কাছ থেকে ডলার কেনার চেষ্টা করছেন। কেন ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে ডলার কিনছেন না- এমন প্রশ্নে মাসুম বলেন, দেশের বাইরে যাবো। ভিসাও চলে এসেছে। তবে এ মুহূর্তে আমার কাছে ভিসা নেই। অন্য কাগজপত্রও গ্রামে রেখে এসেছি। এদের (দালাল) থেকে ডলার কিনতে কোনো ডকুমেন্ট লাগবে না। তাই এখানে এসেছি।

দালালচক্র তো আপনাকে প্রতি ডলারে ৭-৮ টাকা ঠকাচ্ছে- এমন প্রশ্নে মাসুমের সঙ্গে থাকা আরেকজন বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ভাই, ব্যাংকে নানান জটিলতা আছে। অনেক সময় অপেক্ষা করেও ডলার পাওয়া যায় না। এখানে (দালালের কাছে) দাম বেশি হলেও কেনায় কোনো ঝামেলা নেই।

নিউট্রল মানি এক্সচেঞ্জ হাউজের একজন বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেকেই ডলার কিনে রাখছেন প্রয়োজন ছাড়া। তাদের কারণে ডলার সংকট তৈরি হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ভিসা আসার ঠিক নেই- এমন ব্যক্তিও ডলার কিনে রাখছেন।

হুসাইন নামে একজন ডলার ক্রেতা এখনো হাতে ভিসা পাননি তবুও ডলার কিনতে এসেছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভিসা হাতে পাইনি ঠিক। তবে ডলার কিনে রাখবো। ডলারের দাম তো বাড়ছে। পরে যদি আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ মানি এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. হেলার উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনেই আমরা ব্যবসা করছি। অনেকের কাছ থেকে শুনছি, ডলার বিক্রি হচ্ছে ১১৫, ১১৭, ১১৮ টাকা। বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। ১১২ টাকার বেশি দরে আমরা ডলার বিক্রি করবো না। এটা বাস্তবায়ন করছে সব এক্সচেঞ্জ হাউজ।

অন্যদিকে ডলার কারসাজিতে জড়িত ছয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার (৮ আগস্ট) পাঁচটি দেশি ও একটি বিদেশি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, যারা খোলাবাজারে ডলারের অবৈধ ব্যবসা করছেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এখন পর্যন্ত পাঁচটি মানি এক্সচেঞ্জের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪৫টিকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। আরও ৯টি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করে আসছিল। ৮ আগস্ট ২৫ পয়সা বাড়িয়ে আন্তঃব্যাংকে ডলারের নতুন দাম ৯৪ টাকা ৯৫ পয়সা বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেন সহজে রেমিট্যান্স আনতে পারে এজন্য শর্ত শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিলাসী পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এতকিছুর পরও কাটছে না সংকট।




Leave a Reply

Your email address will not be published.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

All rights reserved © shirshobindu.com 2022